
রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষাট
রবীন্দ্রনাথ এখনও বাঙালির সেরা নস্টালজিয়া। এখনও উত্তর কলকাতার রক, সন্ধেবেলা মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘর থেকে ভেসে আসা হারমনিয়ামের স্বর, দুর্গাপুজোর মণ্ডপ, এই সব বাঙালিয়ানার মতোই রবিঠাকুর। তাঁকে ঘিরে কৌতূহল সব সময় একই রকম। আমাদের কথকতার কেন্দ্রেও রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। আজকের এই আসরে একটু টাইম মেশিন নামানো যাক। আর রবিঠাকুর তো নিজেই বলে দিয়েছেন, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে।’ ঠিক এই কাব্যিক যুক্তির সিঁড়ি ধরে আমরা চলে যেতেই পারি ‘আজি হতে শতবর্ষ’ আগে। ঠিক কতটা ব্যস্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ? কেমন সব কাজের জালে জড়িয়ে ছিলেন? একশো বছরের প্রাচীন সময়ের অলিগলি পেরিয়ে মনে মনে চলুন পৌঁছে যাই ১৯২১ সালে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষাট।
এই বছর অনেক টুকরো টুকরো ঘটনার কোলাজে সাজানো। জানুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিউইয়র্কে। সেখানে হেলেন কেলারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এক অন্ধ, মূক ও বধির অথচ প্রতিভাময়ী নারী জীবনের অন্য তাৎপর্য নিয়ে এসে দাঁড়ালেন রবীন্দ্রনাথের সামনে। ব্যক্তিগত জীবনের শোক, আঘাত তুচ্ছ মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের। ইউনিয়ন ক্লাবে অধ্যাপক উডসের সঙ্গে দেখা, টার্ভান ক্লাবে শান্তিনিকেতনের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ ব্যাখ্যা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ একই সময়। জানুয়ারি, ১৯২১-এ ম্যাকমিলান কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা হয়। পরে শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগার ভরে উঠবে ম্যাকমিলানের বই পত্তরে।বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্যসভাতে ঘুরছেন রবীন্দ্রনাথ। যদি বিশ্বভারতীর জন্য কোনো অনুদান পাওয়া যায়!কিন্তু নিউইয়র্কে কোনো অর্থ সাহায্য পাওয়া গেল না। তবে এইবসময় শিল্পমহলে যোগাযোগ বাড়ছে রবীন্দ্রনাথের। পিয়ার্সন তখন রবীন্দ্রনাথের কাছের বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ পাড়ি দিয়েছেন টেক্সাসে। শান্তিনিকেতনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব সুদূর বিদেশে থাকা রবীন্দ্রনাথকে চিন্তিত করে তুলছে। জগদানন্দ রায়কে লিখছেন, ‘Nationalism হচ্ছে একটা ভৌগোলিক অপদেবতা। পৃথিবী সেই ভূতের উপদ্রবে কম্পান্বিত— সেই ভূত ছাড়াবার দিন এসেছে।’ এই বছর মার্চ মাসে প্রকাশিত হয়েছিল প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের লেখা ‘কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই’ বইটি। ওদিকে বিদেশে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হল পল্লী প্রেমিক এলমহার্স্টের। শ্রীনিকেতনের ভবিষ্যৎ উন্নতির প্রারম্ভিক সূচনামুহূর্ত বলা যেতে পারে। গান্ধিজির আদর্শের সঙ্গে সামান্য মতবিরোধের ইঙ্গিত তখন দেখা যাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য বা পত্রালাপে। এই সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর শুভানুধ্যায়ী রোটেনস্টাইনেরও মতবিরোধ হয়। রোটেনস্টাইনকে লেখা চিঠিগুলি থেকে অনুমান করা যায়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ প্যারিস রওনা হয়েছিলেন। এপ্রিলের উনিশ তারিখ রমা রলাঁর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হয় কঁতে দ্য নোয়াই নামের এক প্রভাবশালী মহিলার। পরে রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনীর সময় এই মহিলার সাহায্য পাবেন রবীন্দ্রনাথ। রমা রলাঁ হঠাৎ এগিয়ে আসেন বিশ্বভারতীর জন্য সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এই বছরটায় রবীন্দ্রনাথ যেন পর্যটক। প্যারিসের পর তিনি স্পেন যেতে চান। তাঁর লেখার স্প্যানিশ অনুবাদ করেছিলেন হিমেনেথ দম্পতি। তাঁদের আমন্ত্রণে স্পেন যাত্রা ঠিক হয়েও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়। এরপর কবি রওনা হলেন সুইজারল্যান্ডের পথে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজকীয় সম্মান পেতে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। বক্তৃতা, আলোচনা, ভ্রমণ এবং বিশ্বভারতীর জন্য অর্থসংগ্রহ—এই ছিল রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য। ২৬ মে সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে নোবেল বক্তৃতাও দিয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের চেহারায় যিশু খ্রিস্টের আদল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিদেশীরা। এক ব্রিটিশ রাজদূত বলেছিলেন, ‘more impressive in appearance than most of the conceptions of Christ.’ বার্লিন থিয়েটারে ডাকঘরের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জুন মাসের দশ তারিখে জার্মানিতে কবির সম্মানে tagore's week পালন করা হয়। জার্মানে উইন্টারনিৎজের সঙ্গে আলাপ হয় রবীন্দ্রনাথের। এই সময় রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী আঁদ্রে কাপেলের কাছে যে শিল্পকলার পাঠ নিয়েছিলেন তা পরে কলাভবনের কাজে লেগেছিল।
এরপর জুলাই মাসে দেশে ফেরেন রবীন্দ্রনাথ। ফেরার পথে এন্ড্রুজকে তেরোটি পত্র লেখেন । সেই চিঠিতে বিদেশের বিপুল সমাদরের উল্লেখ আছে। গান্ধীজীর অনুগামীদের সঙ্গে অনেক বিষয়েই তিনি একমত হতে পারেন না। শান্তিনিকেতনের কাজে মন দিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ লেখা শুরু হল। এর মধ্যে ১৮ আগস্ট আলফ্রেড হলে শিক্ষা বিষয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই ভাষণের শেষ দিকে অসহযোগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে উত্তেজিত শব্দ নিক্ষেপ করেন রবীন্দ্রনাথ। এর প্রতিবাদে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধাচরণ করে পত্র লেখেন। ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় তা প্রকাশিতও হয়। পরে অবশ্য শরৎচন্দ্র নিজের এই আকস্মিক রবীন্দ্রবিরোধিতায় অনুতপ্ত হয়েছিলেন। এই বছরই শান্তিনিকেতনে বন্ধুসভা গড়া হয়। উদ্যোক্তা ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। এইসময় গান্ধিভক্তরা রবীন্দ্রনাথের অসহযোগ আন্দোলনের বিরোধিতাকে গান্ধি বিরোধিতা হিসেবে ধরে নেয়। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার সময় ‘গান্ধি মহারাজ কী জয়’ বলে বক্তৃতা বন্ধের চেষ্টা হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজের যুক্তি থেকে কোনোভাবেই সরে আসেন না। তারপর ৬ সেপ্টেম্বর গান্ধীজী জোড়াসাঁকোয় আসেন এবং চার ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনাও চলে। তাঁদের আলোচনা শান্তিপূর্ণ হলেও বাইরে অসহযোগীরা বিলিতি কাপড় দগ্ধ করে। কিন্তু দিন গড়িয়ে যায় নিজের নিয়মে। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কেন্দ্রে তখন বিশ্বভারতী। বিদেশিরা আসছেন ধীরে ধীরে। এই বছরই সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে সুকুমার রায় এসেছিলেন বিশ্বভারতীতে। সিলভাঁ লেভি আসেন শান্তিনিকেতনে। এলেন প্রবোধকুমার বাগচি, এলমহার্স্ট। ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপ হয়। পৌষ উৎসবের মধ্য দিয়ে বিশ্বভারতীকে বিশ্বের হাতে তুলে দেবে— এই ছিল রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে। প্রায় একশো বছর আগের ২৩ ডিসেম্বর ঘটেছিল এক স্মরণীয় ঘটনা— বিশ্বভারতীর পরিষদ সভার প্রতিষ্ঠা উৎসব। এর আগে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯২১ এই ভিত দৃঢ় হয়। একশো বছরের এক আশ্রমের উৎসব থেকে জেগে ওঠেন এক কবি, ঘোষণা করেন— ‘এই বিশ্বভারতী ভারতবর্ষের জিনিস হলেও একে সমস্ত মানবের তপস্যার ক্ষেত্র করতে হবে।’
ওই বছর ওইদিনে রবীন্দ্রনাথ নিজের কথায় কথায় যেন ভবিষ্যতের এক বড়ো সম্ভাবনার ভিত তৈরি করেছিলেন। আজ ঠিক একশো বছর পরে লিখতে বসে মনে হচ্ছে রবীন্দ্রজীবনের এই বিপুল কর্মবহুল ১৯২১ সাল, অনেক মানুষের সমগ্র জীবনেও এই পরিমাণ কাজ করে যাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এক দৃঢ় আবেগ বলেই শতবর্ষের ওপার থেকে এখনও শিখিয়ে চলেছেন। আমরা নিমিত্ত মাত্র। স্মৃতিচারণা ওই বৃহতের কাছে নত হওয়ার অছিলা।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রজীবনপ্রবাহ, কালানুক্রমিক বর্ষপঞ্জি, গৌরচন্দ্র সাহা
রবীন্দ্রজীবনী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
