Sex Education বা যৌনশিক্ষা : গুরুত্ব, পরিসংখ্যান, মিথ, সমস্যা

ভারতে সেক্স এডুকেশন এখনও অধরাই

নামী বেসরকারি স্কুলের বাথরুমে হস্তমৈথুন করতে গিয়ে ধরা পড়ল ছেলে। লুকিয়ে ভিডিও করে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দিল তারই সহপাঠীরা। লজ্জায়, ভয়ে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল পরিবার। প্ল্যাটফর্মে বাবার অগোচরেই সে আত্মহত্যা করতে গেল। শেষ মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন স্বয়ং মহাদেব। এরপরের গল্প অনেকেই জানেন। গতবছর মুক্তি পাওয়া অক্ষয় কুমার ও পঙ্কজ ত্রিপাঠী অভিনীত ছবি ‘ও মাই গড-২’, যা আমাদের ভারতবর্ষের মতো দেশে বানানো আজও সাহসী কাজ বলেই মনে হয়।

ওএমজি-২ দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম এই কারণেই যে সমসাময়িক বলিউড বা ভারতের অন্যান্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সেক্স এডুকেশন (Sex Education) নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব একটা চোখে পড়েনি। বলিউডে শুভ মঙ্গল সাবধান, জানহিত মে জারি, খানদানি শাফাখানা, ভিকি ডোনার, প্যাডম্যান, মেড ইন চায়নার মতো হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে কিছু নির্যাস পাওয়া গেলেও টিনেজ বলে আমরা যে বয়সটাকে বুঝি তাঁদের রোজনামচায় সেক্স কিংবা যৌনতার বাস্তব চিত্রটি কেমন, সেই গল্প নেই ভারতীয় ছবিগুলিতে। আর কেউ চেষ্টা করলেও তাতে কাঁচি চালায় মহান সেন্সর বোর্ড। ওএমজি-২ এর প্রসঙ্গটাই ধরুন। এক কিশোরের যৌনতা নিয়ে জানাবোঝার অভাব এবং সেখানে স্কুলের ভূমিকা নিয়ে গল্পটি সবচেয়ে বেশি দেখার প্রয়োজন ছিল এই বয়সী কিশোরদের। কিন্তু মহান সেন্সর বোর্ড কেটে দিয়েছে ছবির অনেক দৃশ্য। এমনকি ছবিটিকে ‘এ’ অর্থাৎ অ্যাডাল্ট সার্টিফিকেট দিয়ে তাদের সিনেমাহলে প্রবেশের রাস্তাটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকেই বলবেন এখন ওটিটি, পাইরেসির জমানায় ছবি দেখা আটকানো বেশ কঠিন। ঠিক। কিন্তু বোঝাতে চাইছি আমাদের সরকার, প্রশাসন, সিনেমা, এমনকি পরিবারগুলি এখনও সেক্স এডুকেশনের পরিকাঠামো নির্মাণ থেকেই অনেকটা দূরে অবস্থান করছে।

সেক্স নিয়ে কথা বললেই জিভ বের করে যে হালকা আপত্তিটা আসে তার অগ্রভাগে থাকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতির’ দোহাই। যেন অতীতে সেক্স না করেই সবাই আকাশ থেকে টপকাতো! অথচ এই ভারতীয় সংস্কৃতির অজুহাত যে আসলে ধোপে টেকে না তার অজস্র প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। ভারতের নানা প্রান্তে একাধিক মন্দির, স্থাপত্য, লোকগাথায় যৌনতার অজস্র শৈল্পিক নিদর্শন এবং গল্প ছড়িয়ে রয়েছে (যেমন- খাজুরাহো)। অথচ সেই দেশেই কবে এবং কীভাবে যৌনতা ট্যাবু এবং লজ্জার বিষয় হয়ে উঠল তা বলা মুশকিল। ইতিহাস ঘাঁটলে এর অনেকগুলি উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে, আপাতত আমাদের এই আলোচনাটি বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

ভারতের বিপুল জনসংখ্যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই কিশোর-কিশোরীরা। মূলত ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরদের জন্য স্কুল স্তরেই প্রয়োজন সেক্স এডুকেশন বা যৌনশিক্ষা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি তার একেবারেই বিপরীত। সঠিক বিজ্ঞানসম্মত যৌনশিক্ষা না পাওয়ার দরুণ কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, যৌন ও লিঙ্গগত সহিংসতা, হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা, যৌন সংক্রমণ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। জানাবোঝার আভাবেই বাড়ে অপরাধ প্রবণতা। এর সুযোগ নেয় কিছু ওষুধের কোম্পানি। ভুয়ো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টাকা রোজগারের চক্র আজও অব্যাহত। “লিঙ্গ ছোটো, সরু, বাঁকা- অমুক তেল মাখুন” – এমন নানান প্রচার আমাদের চারিপাশে ছড়িয়ে। এর শিকার তরুণ প্রজন্ম। ভারত সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের দেওয়া একটি তথ্যে দেখা গেছে ১৩টি রাজ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশের বেশি শিশু ও কিশোর কোনো না কোনো ভাবে যৌন হেনস্থার শিকার। এইচআইভি-তে এখনও উপরের সারিতেই অবস্থান ভারতের। তাই কিশোরদের নিজেদের শরীর এবং মন সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত বোঝাপড়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তৈরির জন্য এবং সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে স্কুলস্তর থেকেই যৌনশিক্ষা চালু করা প্রয়োজন।

মূলত ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরদের জন্য স্কুল স্তরেই প্রয়োজন সেক্স এডুকেশন বা যৌনশিক্ষা। সঠিক বিজ্ঞানসম্মত যৌনশিক্ষা না পাওয়ার দরুণ কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, যৌন ও লিঙ্গগত সহিংসতা, হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা, যৌন সংক্রমণ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, যে দেশে ‘সেক্স’ শব্দটা নিয়েই চারিদিকে এত আপত্তি, লজ্জা, মিথ, ভুল ধারণা, ট্যাবু… সেখানে স্কুলস্তর থেকে সেক্স এডুকেশন চালু করা আদৌ সম্ভব? এর প্রয়াস কি আগে হয়েছে? আজ্ঞে, সম্ভব। চেষ্টাও হয়েছে। ভারত সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলির জন্য ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক’-এর আওতায় অ্যাডোলেসেন্স এডুকেশন প্রোগ্রাম (সংক্ষেপে এইপি) চালু করে ২০০৫ সালে। এইপি-কে সহজে বোঝানোর জন্য এর নাম দেওয়া হয় ‘লাইফস্কিল’, বাংলায় জীবনশৈলী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-এর সুপারিশে ১০-১৯ বছর বয়সী ছেলেমেয়ে যারা কিশোর থেকে যুব অবস্থায় যাচ্ছে তাদের জন্য এই জীবনশৈলী চালু করা হয়। এইচাইভি/এইডস সম্পর্কে ধারণা, সমস্ত ধরনের যৌন ও লিঙ্গগত স্টিরিওটাইপ ভাঙা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ এবং তার কাজ সম্পর্কে বোধ, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই বয়সেই যে প্রশ্নগুলি আসে তা খোলামেলা আলোচনা করা এমন নানা ধরনের পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে এই জীবনশৈলীর ক্লাস-গুলি নানা কারণে অবহেলার শিকার। পরবর্তীতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মাঝেমধ্যে সেমিনার বা সেশন আয়োজন করা হলেও তার ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গিয়েছে। স্কুলস্তরে সেমিনার, সেশনের সংখ্যা আরোই কম। বেসরকারি কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, যেখানে লাখ টাকা ফি, সেখানকার পরিকাঠামোয় সামান্য হলেও এই শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বাদবাকি সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলিতে এর ছিটেফোটাও নেই। পাশাপাশি সঠিক সিলেবাস তৈরি না করা, অদক্ষ শিক্ষকদের দিয়ে সেই ক্লাস করানো, শিক্ষায় বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া এমন নানান কারণে আজ এইপি প্রজেক্ট ব্যর্থ। রাষ্ট্রীয় কিশোর স্বাস্থ্য কার্যক্রম নামে আরও একটি প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইন্টারনেটের জমানায় আজ যেখানে বিনামূল্যে সমস্ত তথ্য উপলব্ধ, সেখানেই মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বেড়েছে ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি, বিকৃতি, যৌন এবং লিঙ্গগত শোষণ, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। আর এই সমস্ত সমস্যা আজ বেশি দেখা যাচ্ছে কিশোর এবং যুবদের মধ্যে। মূলে সেই সেক্স এডুকেশনের অভাব।

এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, যে দেশে ‘সেক্স’ শব্দটা নিয়েই চারিদিকে এত আপত্তি, লজ্জা, মিথ, ভুল ধারণা, ট্যাবু… সেখানে স্কুলস্তর থেকে সেক্স এডুকেশন চালু করা আদৌ সম্ভব? এর প্রয়াস কি আগে হয়েছে? আজ্ঞে, সম্ভব। চেষ্টাও হয়েছে।

শুধু সরকার, স্কুল, প্রশাসনকে দোষ দিলেই হবে? কিশোরদের জীবনের একটা বড়ো অংশ জুড়ে আছে তাদের পরিবার। ভারতের পরিবার ব্যবস্থায় আজকে যাঁরা বাবা-মা, তাঁরাই একসময় ছাত্র ছিলেন। যদিও ভারতে বেশিরভাগ বাবা-মা-রাই আর্থিক ও সামাজিক ভাবে অনেকটাই পিছিয়ে থাকায় ছেলেমেয়েদের পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে অন্যকিছু দেওয়ার কল্পনা করতে পারেন না। তাও আলোচনার সুবিধার্থে যদি ধরে নিই একটা অংশের বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন যাঁরা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ২৪ ঘণ্টাই চিন্তিত, যাঁরা বিকেলে খেলতে না পাঠিয়ে টিউশনের বোঝা চাপিয়ে দেন, তাঁরাও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে বাড়িতে বা অন্যত্র কতটা খোলামেলা আলোচনা করেন? জিভ কেটে ‘এগুলো বলতে নেই’, ‘বড়ো হলে বুঝবে’, ‘নোংরা কথা বোলো না’ জাতীয় কথা বলে ছেলেমেয়েদের আরও সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছেন না তো? যদিও অভিভাবকদের সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া চলে না। কারণ তাঁদের কাছে এই বিষয়ে কথা বলার মতো সঠিক ভাষা, পরিসর (পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অর্থে) ইত্যাদি নেই।

অভিভাবক এবং স্কুল শিক্ষকদের এটা মেনে নিতেই সমস্যা রয়েছে যে কিশোররা এক একটি যৌন সত্ত্বা (সেক্সচুয়াল বিং)। বন্ধুত্ব, প্রেমের সম্পর্ক এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার ধারণা সামগ্রিকভাবেই অনুপস্থিত। পরিবারের মধ্যে আলোচনার পরিসর গড়ে তুলতে অনেকেই উদ্যোগী হন না। এমনকি স্কুলের পরিবেশে, সিলেবাসে আরও খোলামেলা আলোচনার পরিসর গড়ে তোলার দাবিও করেন না।

ভারতের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি যে আপাদমস্তক পিতৃতান্ত্রিক, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তারা এই দাবি তুলবে এমনটা আশাও করা যায় না। এমনকি তাদের ছাত্র সংগঠনগুলিও মাদারপার্টির পদলেহন করা ছাড়া কোনও কাজের নয়। ২০০৭ সালে মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের তরফে প্রচেষ্টা নেওয়া হলেও ভারতের উপর পশ্চিমী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার অজুহাতে তৎকালীন গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিসগড় রাজ্য সরকার সেক্স এডুকেশন নিষিদ্ধ করে দেয়। এমনকি মধ্যপ্রদেশে যে সব শিক্ষক সেক্স এডুকেশন কারিকুলাম অনুসরণ করবেন তাঁদের দুবছরের জন্যে জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি দেয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ।

একই ভাবে ২০০৯ সালে ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশে শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনগুলির প্রতিবাদের জেরে কারিকুলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়৷ বিজেপি নেতা মুরলি মনোহর যোশী বলেছিলেন, মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিগুলির কন্ডোম বিক্রি কৌশল। ২০২০ সালে ফের স্কুলস্তরে সেক্স এডুকেশন চালু করার প্রয়াস নেওয়ার হয়। মজার কথা হল ‘সেক্স’ বা ‘সেক্সুয়্যালিটি’ শব্দগুলি বাদ যায়! তাতেও ভারতীয় সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সেই প্রয়াস বিশবাঁও জলে।

হু-এর তরফে Effects of Sex Education on Young People’s Sexual Behaviour শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, সেক্স এডুকেশন কখনোই কিশোর-কিশোরীদের অল্প বয়সে এবং ঘনঘন যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে উৎসাহিত করে না। বরং সঙ্গমের প্রক্রিয়াটি আরও বিলম্বিত করে এবং যারা ইতিমধ্যেই সক্রিয়, তাদের আরও নিরাপদ সঙ্গমের দিকে নিয়ে যায়, অনেক ভুল ধারণা দূর করে।

ইউনিসেফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতে ২৪০ মিলিয়ন কিশোরীদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। গড় বিয়ের বয়স ২০.৬ বছর। বিবাহের আগে সেক্স করা নিয়ে ট্যাবু থাকলেও ১৮ বছরের নিচের মেয়েদের বিয়ে দেওয়াতে থাকে না। বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী অবস্থায় প্রসূতি হওয়ার ফলে পরবর্তীকালে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যে অবনতি হয় তা নিয়ে মুখে কুলুপ আঁটেন এই ভারতীয় সংস্কৃতির দোহাই দেওয়া জনতা। তথ্য বলছে, ১১.৫% মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয় ১৫-১৯ বছরের মধ্যে। ২৪ বছরের মধ্যেই ৪৫% মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। ভারতে কিশোর-কিশোরী ও যুবদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান দিয়ে তথ্যভারে জর্জরিত করতে চাই না।

সরকারের তরফে যেখানে আরও এগিয়ে থাকা একটি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যাত্রা করার কথা ছিল, বর্তমানে আমরা তার উল্টো ছবিটাই দেখতে পাচ্ছি। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে গালভরা সব নাম দিয়ে প্রকল্প করার কথা বলা হলেও সেখানে স্কুলস্তরে যৌনশিক্ষা এখনও অধরাই। সেক্স নিয়ে অল্প বয়সেই ‘বেশি বুঝে’ গেলে কিশোর-কিশোরীরা অবাধ যৌনতায় লিপ্ত হবে না? সেক্ষেত্রে তো ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। পর্তুগিজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মধ্যে এ ব্যাপারে গবেষণা করা হয়েছিল। যেখানে দেখা গেছে যারা স্কুলস্তরে সেক্স এডুকেশন পেয়েছে তাঁদের মধ্যে যৌনসঙ্গম জনিত রোগ, আনওয়ান্টেড প্রেগনেন্সি এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে কম। যৌনশিক্ষা কিশোরদের জ্ঞান বাড়ায়, প্রেরণা জোগায়, দক্ষতা (স্কিল) বিকাশে সহায়ক হয়ে ওঠে। ব্যক্তি জীবন এবং পারিপার্শ্বিক জীবনের মধ্যে সুস্থ আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

হু-এর তরফে Effects of Sex Education on Young People’s Sexual Behaviour শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, সেক্স এডুকেশন কখনোই কিশোর-কিশোরীদের অল্প বয়সে এবং ঘনঘন যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে উৎসাহিত করে না। বরং সঙ্গমের প্রক্রিয়াটি আরও বিলম্বিত করে এবং যারা ইতিমধ্যেই সক্রিয়, তাদের আরও নিরাপদ সঙ্গমের দিকে নিয়ে যায়, অনেক ভুল ধারণা দূর করে। নৈতিকতা ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কিশোরদের জীবন গঠনের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়া বোকামি। অবশ্যই নিজ নিজ দেশের বিবিধতাকে বজায় রেখেই এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। কিন্তু যৌনতার বিষয়বস্তু বা কন্টেন্টে কোনওরকম আপস করা চলবে না।

একটি জনপ্রিয় ওটিটি মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় সিরিজ ‘সেক্স এডুকেশন’। পাশাপাশি ইউটিউব, পডকাস্ট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে নানা ধরনের ভিডিও, সেমিনার-সেশনের মাধ্যমে সচেতনতার কাজ চলছে। বেশকিছু ডাক্তার, থেরাপিস্টরাও এগিয়ে আসছেন। গুজরাটের একটি স্কুলে পড়ুয়াদের জন্যে চিঠি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে পড়ুয়ারা নিজেদের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে সমস্তরকম প্রশ্ন রাখতে পারে। প্রশিক্ষিত কাউন্সিলররা তার উত্তর দেবেন। বেশকিছু এনজিও, সামাজিক সংগঠন, ডাক্তার সংগঠনের তরফে ছোটো ছোটো উদ্যোগ দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে স্কুলস্তরে সেক্স এডুকেশনের অনুপস্থিতি দূর করতে প্রয়োজন বিকল্প চিন্তাভাবনার। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানেই আবার ফিরব। সেক্স শব্দটি ট্যাবু নয়। সাধারণ জীবনধারণের একটি প্রক্রিয়ার অংশ। সেক্স এডুকেশনও তাই জীবনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে ওএমজি-২ এর ছেলেটির মতো আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে না। আর হ্যাঁ, সিনেমায় মহাদেব এসে বাঁচিয়েছিলেন। পথ দেখিয়েছিলেন। বাস্তবে কিন্তু মহাদেব বাঁচাবেন না। আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। লিঙ্গগত এবং সবরকমের ভেদাভেদ সরিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়াই আসলে ভারতীয় সংস্কৃতি।

_____ 
*মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia