
ফুলের পাশাপাশি এ দোকানে রয়েছে পানীয় জল এবং কোল্ড ড্রিঙ্কস-এর পসরা
খড়দহের (Khardaha) পাটুলিয়া, স্কুল পাড়া, জিসি রোডে অজস্র দোকানের মধ্যে, ছোটো এক চিলতে দোকান। তার মাথায় রঙিন সাইনবোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ফুল’। এ দোকানের সামনে রয়েছে নানা রঙের মৌসুমী ফুলের (Flower) স্তূপ আর তার ঠিক পাশেই একটি হুক থেকে ঝুলছে একাধিক ফুলের মালা। রং-বেরঙের ফুল-মালায় সেজে অসাধারণ রূপ পেয়েছে দোকানটি। সামনে এগিয়ে গেলে নজরে পড়বে প্রচুর পরিমাণে টাটকা জবা এবং গাঁদা ফুলের সম্ভার। নিত্য পুজো থেকে শুরু করে উৎসব অনুষ্ঠান, সবেতেই ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ফুল’-এর। বাহারি ফুলের পাশাপাশি এই দোকানে সাজানো রয়েছে প্যাকেটজাত পানীয় জলের বোতল এবং নানা ধরনের কোল্ড ড্রিংকস। গরমের সময় ফুলের পাশাপাশি পানীয়-এর কাউন্টারেও বিক্রিবাট্টা নেহাৎ মন্দ হয় না। দোকানে বসে যে ভদ্রলোক প্রয়োজন মতো গ্রাহকদের হাতে জিনিস তুলে দিচ্ছেন, টাকা-পয়সা সংক্রান্ত লেনদেনের হিসেবও রাখছেন তিনিই। নাম দিলীপ সাঁতরা, দীপালি সাঁতরার স্বামী। স্ত্রী দীপালিকে তিনি মনে করেন তাঁর বাড়ির ‘লক্ষ্মী’ (দানশীলতার দেবী)। আক্ষরিক অর্থেই দীপালি যেন তাই। তিনিই তাঁর পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে টেনে তুলে জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন সম্মান এবং আর্থিক নিরাপত্তা। আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Bannerjee) পরিকল্পনা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’কে।
‘কন্যাশ্রী’র মতোই, মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmi Bhandar)। এরকম একটি প্রকল্পের ভাবনা বিশ্বব্যাপী ভূয়সী প্রশংসার অংশীদার। গ্রামীণ মানুষের জীবনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকৃত অর্থেই ‘গেম চেঞ্জার’। সমগ্র বিশ্বে করোনা মহামারীর জেরে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট তো বটেই পাশাপাশি জনজীবন ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গ ভারতীয় অর্থনীতির দুর্বলতাগুলিকে আরও প্রকট করে তোলে। প্রায় কয়েক মিলিয়ন মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। সমাজের একটা বড়ো একটা অংশ ডুবে যান দারিদ্র এবং বেকারত্বের মধ্যে। যদিও আগের থেকে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে পরিস্থিতি, তবুও অর্থনৈতিক চাপ এখনও পুরোটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বর্তমান সময়।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (WestBengal Government) ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পটি দরিদ্রদের জন্য শক্তির স্তম্ভ হয়ে উঠেছিল। এই প্রকল্পটি রাজ্যের ১.৬ কোটি পরিবারের মহিলাদের মাসিক মৌলিক আয় সহায়তা নিশ্চিত করে। এই প্রকল্পের অধীনে, সাধারণ শ্রেণির পরিবারগুলিকে মাসিক ৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি পরিবারের মহিলাদের জন্য মাসিক ১০০০ টাকা করে প্রদান করে রাজ্য সরকার।

সাঁতরা পরিবার খড়দহের পাটুইলা স্কুল পাড়ার বাসিন্দা। স্বামী-স্ত্রী এবং দুই ছেলে নিয়ে তাঁদের সংসার। এক ছেলে চেন্নাইয়ের একটি হোটেলে কাজ করে। করোনার আগে, দিলীপবাবু রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং রাজ্যের বাইরেও ভারী যানবাহন চালিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। তাঁর উপার্জিত অর্থেই দিব্যি চলে যেত পরিবার। করোনার সময় চাকরি হারান দিলীপবাবু। আকস্মিক আর্থিক সংকট পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যহত করে এবং সবকিছু হঠাৎ করে থমকে যায়। দিলীপবাবুর স্ত্রী দীপালি সাঁতরা (Dipali Santra) ছিলেন একজন সাধারণ গৃহকর্মী (House Wife)। প্রাথমিক ভাবে যা কিছু সঞ্চয় ছিল তা দিয়ে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে টান পড়ে সেই সঞ্চয়ে। একসময়ে এভাবে চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিবারের এই পরিস্থিতি দেখে অসহায় বোধ করেন দীপালি।

ঠিক এরকম সময়ে রাজ্য সরকারের তরফে চালু করা হয় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প। এবং প্রকল্পের এই মাসিক অর্থ যেন দুস্থ পরিবারগুলির পাশে ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করেন দীপালি। আবেদনের কিছুদিনের মধ্যেই ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মাসিক অনুদান পেতেও শুরু করেন। এরপর থেকেই তিনি এই অর্থের একটি পরিমাণ সঞ্চয় করতে থাকেন, এবং খানিকটা টাকা জমিয়ে নেওয়ার পর আজ থেকে তিন মাস আগে শুরু করেন ফুলের ব্যবসা। তাঁর ছেলে সুরজিৎ পাইকারি বাজারে গিয়ে প্রতিদিন তাজা ফুল নিয়ে আসে এবং দীপালি সেই ফুল দিয়ে তৈরি করেন মালা এবং সাহায্য করেন ফুলের প্যাকেজিং-এও। আর দিলীপবাবু দোকানের আর্থিক লেনদেনের দিকটি সামলান।
দীপালি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি, তাই কৃতজ্ঞতার ইঙ্গিত স্বরূপ দোকানটির নামও রাখেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ফুল’। দোকানটি শুরু করার পর থেকেই ব্যবসা জমে ওঠে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ দোকানের হাত ধরে দীপালীর পরিবার এখন আর্থিকভাবে স্থিতিশীল। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াইয়ের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন তিনি। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের কাছে এমনকি পঞ্চায়েত সহ স্থানীয় নাগরিক সংস্থাগুলির কাছেও ভুয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন দিপালীদেবী। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের সাফল্যের গল্পে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
ব্যারাকপুরের ২ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সকল বাসিন্দাই দীপালি সাঁতরার সাফল্যের গল্পে উচ্ছ্বসিত। পাশাপাশি সরকারী প্রকল্পের অর্থকে কাজে লাগিয়ে দীপালীর এই লড়াই যে আরও অনেক মহিলাদের জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অনুপ্রেরণা যোগাবে, এ ব্যাপারেও নিশ্চিত এই অঞ্চলের সকলেই। সমাজের প্রান্তিক মহিলাদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পটি সত্যিই আশীর্বাদস্বরূপ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলারা যে শুধু আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে তাই নয়, পাশাপাশি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাসিক অর্থ তাঁদের মনোবল বাড়িয়েছে এবং স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে রাজ্যের মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল অভিনব ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পটি। সরকারের তরফে জানানো হয়েছিল যে, যেসব মহিলাদের সরকারি অথবা বেসরকারি সংস্থায় কোনোও স্থায়ী চাকরি নেই তারা সকলেই এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হতে পারবেন। নারী-কেন্দ্রিক এমন একটি পরিকল্পনা প্রথম থেকেই ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দেয়। সরকারি তথ্য থেকে জানা জায়, স্কিমটি চালু হওয়ার প্রথম দিনেই, বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ২,১৩,৭৫০টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। সরকারি অন্যান্য সমস্ত প্রকল্পে আবেদনের রেকর্ড ভেঙে দেয় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যোজনা।
খুবই সহজ পদ্ধতিতে প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পে। প্রতিটি পরিবারের মহিলা সদস্য যাঁরা স্কিমের নির্দিষ্ট মানদণ্ডের আওতায় পড়েন, তাঁরা রাজ্য জুড়ে আয়োজিত সরকারের স্থানীয় শিবিরগুলি থেকে অফলাইনে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ যোজনার ফর্ম সংগ্রহ করতে পারবেন। আবেদনপত্রে প্রার্থীর বিশদ বিবরণ সহ আধার কার্ডের আসল এবং ফটোকপি, ব্যাঙ্কের পাসবুকের জেরক্স এবং অন্যান্য সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা করতে হবে। এছাড়াও, অনলাইনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লক্ষ্মী ভাণ্ডার স্কিমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকেও আবেদনকারীরা আবেদন করতে পারেন।
অনলাইনে আবেদন করতে এখানে ক্লিক করুন।
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।
