ইতালি, ইউরোপ ঘুরে যেভাবে কলকাতায় পৌঁছেছিল ‘ডুয়েলিং’
“এই ডুয়েল নিয়ে এককালে কিছু পড়াশুনা করেছিলুম নিজের শখে”, বললেন তারিণীখুড়ো। তারপরেই দুধ চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক আর এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়িতে টান দিয়ে শোনালেন উনবিংশ শতাব্দীর শেষে, নবাবী আমলের লখনৌ শহরে এক আশ্চর্য ডুয়েলিং-এর কাহিনি যার দুই প্রতিদ্বন্দী – ক্যাপ্টেন ব্রুস আর জন ইলিংওয়ার্থ।
তারিণীখুড়োর মুখে সেদিন যে ডুয়েলিং–এর কথা শোনা গেল তার জন্ম সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে ইতালিতে, যা ক্রমে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ চার শতাব্দী পেরিয়ে ইতালিতে, ১৯২০ সালে, মুসোলিনি-বাহিনির সাঙ্গপাঙ্গকেও হালকা তরোয়াল (Sabre) বাগিয়ে ডুয়েল লড়তে দেখা গেছে। আসলে ডুয়েলের মূল উদ্দেশ্য হল আত্মসম্মান রক্ষা বা হৃতসম্মান ফিরে পাওয়ার তাগিদ। অপমান, অবহেলা, অবমাননার কাদায় ডুবতে বসা নিজের সুনাম আর খ্যাতিকে সেখান থেকে টেনে তুলে, নিজেকে সমাজের চোখে নির্দোষ প্রমাণ করবার জন্যই কখনও তরোয়াল বা পিস্তল হাতে তুলে নেওয়া।

অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে খোদ কলকাতার বুকেই এরকম অসংখ্য ডুয়েল লড়েছিল দুই পক্ষের মারকুটে লোকজন – একদিকে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস আর অন্যদিকে ফোর্ট উইলিয়ামের সেনাপতি জেনারেল ক্লেভারিং।
জোর যার মুলক যখন তারই, তবে আর তর্ক, ঝগড়া করে বা উপদেশ শুনে সময় নষ্ট করা কেন? এস হে, সম্মুখ সমরে তবে করি আহ্বান, খানিক যেন সেই “হাত থাকতে মুখে কেন” ব্যাপার! নিজ সম্মান রক্ষাই যদি ডুয়েলের একমাত্র কারণ হয় তবে তার মধ্য থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কোন মতেই ছাড় দেওয়া যায় না। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে খোদ কলকাতার বুকেই এরকম অসংখ্য ডুয়েল লড়েছিল দুই পক্ষের মারকুটে লোকজন – একদিকে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস আর অন্যদিকে ফোর্ট উইলিয়ামের সেনাপতি জেনারেল ক্লেভারিং। কাউন্সিলে দুই দলের বিবাদ চরমে। অভিযোগ উঠেছে হেস্টিংস নাকি অসুদপায়ে কাউন্সিলে দল ভারি করে ফেলেছেন। বিবাদ আরও বেড়ে যেতে সারা শহরময় রীতিমত সাড়া পড়ে গেল। প্রত্যেক মুহূর্তে সবাই শঙ্কিত একটা সশস্ত্র সামরিক বিদ্রোহ না হয়। দুশ্চিন্তা হওয়ারই কথা – বিরোধটা যাঁদের মধ্যে তাঁরা দু’পক্ষই ওজনদার – একজন গভর্নর জেনারেল অপরজন সেনাধ্যক্ষ। অবশেষে নিরপেক্ষদের রায়ে ব্যাপার গেল সুপ্রিম কোর্টের কাছে; রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শেষ হবে এবার বিচারকের এজলাসে। হলে, হবে কি? বিচার চলাকালীন সময়ে দুইদলের মধ্যে প্রবল ঝগড়া বিবাদ চলতে থাকে। হেস্টিংস ক্লেভারিং বিবাদ উপলক্ষে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় যে কত ডুয়েল লড়া হয় সেই সময় তার কোন হিসেব নেই।
ব্রিটেন এবং অন্যান্য ব্রিটিশ কলোনিতে ডুয়েলিং অবিশ্যি উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বন্ধ হয়ে যায়। তবে তার আগে ১৭৮০ সালে, ১৭ অগাস্টের সকালে, কলকাতার দক্ষিণ পশ্চিমে আলিপুরে গাছ গাছালি ঘেরা সবুজের মাঝে, পিস্তলের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় একবার। দুই রাজপুরুষ এবার ডুয়েলের প্রতিদ্বন্দ্বী। একজন খোদ লর্ড হেস্টিংস এবং অপরজন, গভর্নর কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ফিলিপ ফ্রানসিস। হেস্টিংসের নামে অপবাদ প্রচুর হলেও মানুষটা চাইতেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে। কিন্তু সেই সময় সেটা সম্ভব ছিল না। কারণ ইংল্যান্ডের কোর্ট অফ ডিরেক্টরেটের নির্দেশ মেনে তৈরি হয়েছিল চারজনের একটি বিশেষ কাউন্সিল। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হেস্টিংসকে কাউন্সিলের সঙ্গে বসতে হত। আর এখানেই সমস্যা। ওই কাউন্সিলেরই এক সদস্য ছিলেন স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস। ১৭৭৪ সালে ফ্রান্সিস যখন প্রথম কলকাতায় আসেন, তখন নিয়ম অনুযায়ী ২১ বার তোপ দাগার কথা। কিন্তু করা হয় ১৭ বার। এখান থেকেই শুরু শত্রুতার। তারপর থেকে নানা ঘটনায় হেস্টিংস আর ফ্রান্সিস পরস্পরের বিরুদ্ধে কথা বলতেই থাকেন। পারদ চড়তে থাকে ক্রমশ। ফ্রান্সিসও কম যান না! একটা সময় কলকাতার বেশ আলোচ্য ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। জর্জ ফ্রান্সিস গ্র্যান্ড নামে এক উচ্চ পদস্থ ইংরেজ কর্মচারীর সুন্দরী ফরাসি স্ত্রীকে কেন্দ্র করে একটি পরকীয়ার ঘটনায় ধরা পড়ে শেষে জরিমানা দিতে হয় তাঁকে। কিন্তু ততদিনে তাদের কেচ্ছা নিয়ে আড্ডাখানায়, ট্যাভারনে, ব্রেকফাস্ট আর ডিনার টেবিলে, পাল্কিতে, ফিটনে আলোচনার শেষ নেই। এমনকী রসিক কবিরা কাব্যি লিখে ফেলেছে –
“A GRAND and a mighty affair to be sure,
Just to give a light PHILIP (fillip) to nature,
How can you, ye prudes, blame a luscious young wench” …
লোকে বলে, মিসেস গ্র্যান্ডের প্রতি হেস্টিংসেরও বেশ খানিক দুর্বলতা ছিল। তাঁর বাসস্থান বেল্ভেডিয়ারের এক পার্টিতেই নাকি ফ্রান্সিসের আলাপ এই মহিলার সঙ্গে। যাই হোক, একই গোষ্ঠীতে যদি দুই প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি থাকেন, তাহলে তো ঠোকাঠুকি লাগবেই। হেস্টিংসের পিস্তল থেকে ছুটে আসা গুলিতে ফিলিপ আহত হন। হেস্টিংসের গুলি লেগেছে ফ্রান্সিসের পায়ে। চিৎকার করে বলছেন, “আই অ্যাম আ ডেড ম্যান!” হেস্টিংস একটু হেসে জবাব দিলেন, “আই হোপ নট!” তখনই জানা গেল, এর আগে কখনও পিস্তল চালাননিই স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস!

হেস্টিংস – ফ্রান্সিসের এই ডুয়েল ঘিরে আবার তৈরি হয়েছে এক ভুতুড়ে গপ্পো। সেদিন নাকি গুলি লেগেছিল ফ্রান্সিসের ঘাড়ে। রক্তাক্ত তাঁর দেহ কোনওমতে পাল্কিতে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয় শহরের দিকে প্রেসিডেন্সি হাসপাতালে। কিন্তু আদি গঙ্গায় তখন বাণ ডেকেছে। জল পেরিয়ে পৌঁছনো গেল না। অতএব যা হওয়ার তাই হল। পরে বেলভেডিয়ার যখন ন্যাশানাল লাইব্রেরি হল তখন নৈশপ্রহরী বীরবাহাদুর এক সন্ধ্যার অন্ধকারে একটা পাল্কি চলে যেতে দেখল। চাঁদের আলো পড়েছিল পাল্কির ভিতরে। নজরে এল এক সাহেব পড়ে আছে পাল্কির মেঝেতে – রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর শরীর। শীতের অন্ধকারে এই দৃশ্য দেখে বীরবাহাদুরের দাঁতে দাঁত লেগে যায়!
বেলভেডিয়ার হাউসের পিছনে ঐ একই জায়গায় ১৭৮৩ সালের ৯ জুলাই আরেকটি ডুয়েল হয়েছিল ব্রিটিশ আইনজীবী উইলিয়াম হিকি এবং জনৈক বেটম্যানের মধ্যে। লোক মুখে শোনা পরনিন্দা পরচর্চাকে কেন্দ্র করেই বিরোধ। দুজনের গুলিই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বহু দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল। বিবাদ ভুলে, হ্যানডশেক করে, দুই সাহেব বাড়ির পথ ধরলেন।
ফরাসি মুলুকে ১৮৭০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে যে নবযুগ (Belle Époque Era) এসেছিল সেখানেও দেখা গেল দেশের তাবড় রাজনীতিক এবং সাংবাদিকরা নেমে পড়ল অস্ত্র হাতে; মতের অমিল হলেই প্যারিস শহরের লাগোয়া ময়দানে গিয়ে এক হাত ডুয়েল লড়ে যাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার! পোল্যান্ড, আর্জেন্টিনা জুড়ে ডুয়েল লড়া হলেও তা মোটামুটি ১৯৩০ সালের পরে বন্ধ হয়ে যায়। জার্মানিতে কিন্তু সামরিক বাহিনীর মধ্যে ডুয়েলিং চালু ছিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় অবধি এবং সে মোটেই হালকা ব্যাপার নয়, রীতিমত প্রাণঘাতী।
আর আমেরিকায় তো ১৮০৪ সালের মধ্যে ডুয়েলিং একটা খেলায় পরিণত হয়েছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপ থেকে আমদানি হয়ে পরের ত্রিশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বৃদ্ধি পেয়েছিল তার জনপ্রিয়তা। তবে হলিউডের “wild west” ছবিতে সামনা সামনি পিস্তল, বন্দুক নিয়ে যে সাঙ্ঘাতিক মারপিট দেখা যেত সে নেহাতই সিনেমার চমক, বাস্তবের ডুয়েলিং-এর সঙ্গে তার খুব একটা মিল নেই। ডুয়েলের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের মধ্যে আসলে লুকিয়ে থাকে বিনয় এবং ভদ্রতার মোড়কে একধরনের হুমকি। ইতালিয় রেনেসাঁ যুগেই এই “নোটিস অফ অনার”-এর সৃষ্টি।
“After the gross and unjustifiable insults you have offered me both as a Soldier and a Gentleman, I conclude you must be prepared to give me that Satisfaction I am entitled to. I have therefore to request that you will name a place and hour of meeting” – বলাই বাহুল্য এই ‘মিটিং’ একেবারেই সুখকর নয়। বরং ফুটবলের “sudden death” এর মতই – হারজিতের একেবারে হাড়হিম করা পরিণতির দিকে পা বাড়ানো।
হেস্টিংস – ফ্রান্সিসের এই ডুয়েল ঘিরে আবার তৈরি হয়েছে এক ভুতুড়ে গপ্পো। সেদিন নাকি গুলি লেগেছিল ফ্রান্সিসের ঘাড়ে। রক্তাক্ত তাঁর দেহ কোনওমতে পাল্কিতে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয় শহরের দিকে প্রেসিডেন্সি হাসপাতালে। কিন্তু আদি গঙ্গায় তখন বাণ ডেকেছে।

মানুষের মধ্যে নিজেকে “Primus inter pares” বা “First among the equals” প্রমাণ করবার বাসনা কোথায় যেন লুকিয়ে ছিল ডুয়েলিং-এর সুত্রপাতে। সঙ্গে যোগ হয়েছিল নিজের আঘাত প্রাপ্ত সম্মান, খ্যাতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার তাগিদ। দুইয়ে মিলে জন্ম নিয়েছিল মানব সভ্যতার এক কলঙ্কময় অধ্যায় যার মূলে ছিল পেশী এবং অস্ত্র বল।
শেষের আগে আসুন আবার একবার লখনৌ ঘুরে আসা যাক। মুন্সি প্রেমচন্দের দুই শৎরঞ্জ কি খিলাড়ি জাইগিরদার মীর সাজ্জাদ আলী আর মীর রোশন আলীকে মনে পড়ে? উনিশ শতকের প্রমোদ মত্ত লখনৌ থেকে খানিক দূরে, এক ভাঙা মসজিদের বাইরে দু’জনে খোলা তলোয়ার নিয়ে সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন একে অন্যের উপরে। সেও ছিল এক ডুয়েল যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শতরঞ্জের দুই নকল রাজার সম্মান আর নবাবী রক্তের গরিমা আর ঔদ্ধত্যের আস্ফালন।
_____________
তথ্যঋণ: লখনৌর ডুয়েল–সত্যজিৎ রায় | সুতানুটি সমাচার–বিনয় ঘোষ | আদিম কলকাতার ভূতুড়ে বাড়ি–বারিদবরণ ঘোষ