তুমুল বা ঝিরঝিরে, বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ির এবং খিচুড়ির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আজও অটুট
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই মা দুর্গা নন্দিকে তলব করেছেন, ‘যাও ডাব পেড়ে নিয়ে এসো।’
নন্দির তখনও গতরাতের গাঁজার ঘোর কাটেনি। কোনওরকমে জড়ানো স্বরে বলল, ‘এত্তো সকালে মা?’
‘হ্যাঁ, বাবুর হুকুম হয়েছে। ডাবের জল দিয়ে রান্না করা মুগের ডালের খিচুড়ি খাবেন।’
নন্দি লাফিয়ে উঠে ডাব পাড়তে ছুটল।
‘আস্তে যা, হড়কে যাবি। নন্দি-ভৃঙ্গি সবাই পাবি।’
মনসামঙ্গল কাব্যে স্বয়ং শিব যে খাবারটি খাবার আবদার পার্বতীর কাছে জানিয়েছিলেন, তা হল “বৈসাদৃশ্যময় উপকরণে তৈরি মিশ্র খাদ্য” অর্থাৎ খিচুড়ি। খাদ্যরসিক বাঙালির বর্ষাকাল মানেই খিচুড়ির কাল। বৃষ্টি পড়লেই বাঙালি-বাড়িতে যখন-তখন বদলে যেতে পারে মেন্যু। কাশ্মীর থেকে কণ্যাকুমারী, আসমুদ্র হিমাচলে বোধহয় এমন কেউ নেই এর স্বাদ যে চাখেনি। তুমুল বা ঝিরঝিরে, বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ির এবং খিচুড়ির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আজও অটুট।
বাঙালির তিন ‘আইডল’ বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে দেখা করার আগে প্রথম জনের ‘পেটুক সঙ্ঘ’ বা ‘গ্রিডি ক্লাব’-এর গবেষণার একটি বিষয় ছিল, ‘খিচুড়ি রাঁধবার নতুন পথ।’ রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরও তিনি এসব ছাড়েননি। বেলুড়মঠে দুর্গাপুজো আরম্ভ হবার পর যে ভোগ রান্না চালু হয় তা শতভাগ বিবেকানন্দের ইচ্ছা, উদ্যোগ ও পরিকল্পনায়। তাঁর সেই আঠারো শতকের শেষ ভাগের রেসিপি এখনও চলছে। বিখ্যাত সাহিত্যিক শঙ্করের ভাষায়, ‘ওয়ার্ল্ডের সেরা খিচুড়ি তৈরি হয় বেলুড়মঠে।’
বিদেশেও উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে (১৮৩৭-১৯০১) খিচুড়ি ইংল্যান্ডের হেঁসেলে ঢুকে পড়েছিল। মোটামুটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি মিশরীয়দের মধ্যে “কুশারি” নামে একটি পদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি তৈরি হতো চাল, ডাল, চানা, ভিনিগার, টমেটো সস, পেঁয়াজ, আদা, রসুন প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে। রন্ধনপ্রণালী হিসেবে এই কুশারীকেই খিচুড়ির ভিন্নরূপ বলা যেতে পারে।
বিবেকানন্দের পরিকল্পিত খিচুড়িতে সমান মাপের চাল, মুগের ডাল ও সব্জি দেওয়া হয়। সব্জি বলতে শুধু প্রথাগত আলু, ফুলকপি, মটরশুঁটি নয়, সব ধরনের সব্জি তা পটল থেকে কচু অবধি হতে পারে। আর বেলুড়মঠের সেই খিচুড়ির সহযোগী হিসাবে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘টমেটো আমড়া কুমড়ো দিয়ে চাটনি’…আহা! এ স্বাদ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরাই জানেন। বিশ্ববিখ্যাত কারণ, বিবেকানন্দ যখন বিদেশ যেতেন তখনও তিনি এই চাটনি নিজে রাঁধতেন। জিনিস সেখান থেকে সংগ্রহ করতেন ঠিকই তবে তাঁর গেরুয়া পোশাকের পকেটে সবুজ লঙ্কা, পাঁচফোড়ন থেকে অন্যান্য মশলা থাকত। আর সঙ্গে নিয়ে যেতেন মুগের ডাল। যা শেষ হয়ে গেলে তিনি পার্শেল করে মুগডাল পাঠানোর জন্যে চিঠি লিখতেন। খিচুড়ির সঙ্গে ভাজা ইত্যাদির কুটনো কাটার তদারক বিবেকানন্দ নিজে করতেন। আর ওই মহাভোজের জন্যে অত্যন্ত পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দনভাবে আলুর খোসা নিজে ছাড়াতেন। মা সারদা নরেনের এমন নৈপুণ্য দু’চোখ মেলে দেখতেন এবং তারিফ করতেন।
চৈতন্যদেবের খিচুড়ি খুবই প্রিয় ছিল, এ কথা আর নতুন করে বলে দিতে হয় না। আর এখন তো তাঁর মহাভোগ বলতে খিচুড়িই বোঝায়। পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের যে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়, তা লোকমুখে সংক্ষেপে “জগা- খিচুড়ি” নামে পরিচিত। যা কথ্যভাষায় আবার তালগোল পাকানোর প্রতিশব্দ। কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা যক্ষদেবতা কুবেরকে খিচুড়ি ভোগ উৎসর্গ করেন, যার নাম “খেতসিমাভাস”। তামিলনাড়ুতে খিচুড়িকে “পোঙ্গল” বলে। রাজস্থানে যে হাল্কা খিচুড়ি রান্না হয় , তাকে “তেহরি” বলে , যা পুষ্টিকর। মহারাষ্ট্রে খিচুড়ির সাথে মেশানো হয় সরষে দানা। মহামুনি চরক বলেছেন খিচুড়ি, পোলাও এর থেকে কিছু কম গুণাগুণ যুক্ত নয়। নবাব-বাদশাদের প্রসঙ্গে বিস্তৃতে যাচ্ছি না, শুধু একটা কথা বলি, আকবর হুমায়ুন থেকে সিরাজউদ্দৌলা—সবারই প্রিয় ছিল মুগের ডালের খিচুড়ি। পলাশির যুদ্ধে হেরে নবাব যখন নৌকো করে পালাচ্ছিলেন সেই নৌকোতেও খিচুড়ি চাপানো হয়েছিল।
খিচুড়ির উৎস সন্ধানে
খিচুড়ির ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে দেখা যাবে, এ নিয়ে বাঙালির যত আবেগ থাকুক না কেন, এ খাবারের উৎস বাংলা নয়। এর প্রবেশ বাংলায় খানিকটা পরে। গ্রিকদূত সেলুকাস উল্লেখ করেছেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশে চালের সঙ্গে ডাল মেশানো খাবার খুবই জনপ্রিয় ছিল। আল বেরুনিও তাঁর ভারততত্ত্বে খিচুড়ির প্রসঙ্গ বাদ দেননি। মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা খিচুড়ি প্রস্তুতি চাল, ডাল নয় নির্দিষ্ট করে মুগডালের কথাও বলেছেন। চাণক্যের লেখা মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সময়কালে এর উল্লেখ মেলে। সপ্তদশ শতকে ভারত ভ্রমণকালে ফরাসী পরিব্রাজক তাভের নিয়ের লিখেছেন, সে সময় ভারতে প্রায় সব বাড়িতেই খিচুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।
মোঘল আমলের ইতিহাস বলে আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরী তে নানা ধরনের খিচুড়ি তৈরির কথা বলেছেন। খিচুড়ির প্রতি ভালোবাসা ছিল জাহাঙ্গীরেরও। তাতে মিশত পেস্তা ও কিসমিস, ভালোবেসে নাম রেখেছিলেন “লাজিজাঁ”। বিদেশেও উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে (১৮৩৭-১৯০১) খিচুড়ি ইংল্যান্ডের হেঁসেলে ঢুকে পড়েছিল। মোটামুটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি মিশরীয়দের মধ্যে “কুশারি” নামে একটি পদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি তৈরি হতো চাল, ডাল, চানা, ভিনিগার, টমেটো সস, পেঁয়াজ, আদা, রসুন প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে। রন্ধনপ্রণালী হিসেবে এই কুশারীকেই খিচুড়ির ভিন্নরূপ বলা যেতে পারে।
আরও পড়ুন: বর্ষায় ঘুরে আসুন বাংলার ইলিশ-ঘাঁটিতে
বাংলায় প্রবেশ তবে কবে? ১২০০-১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় খিচুড়ির আবির্ভাব। ডাল গরিবের আমিষ বলা হলেও প্রথমদিকে ডাল ছিল উচ্চশ্রেণীর খাদ্য। “খিচুড়ির চার ইয়ার – ঘি পাঁপড় দহি আচার” কথাটি চালু থাকলেও বাঙালি মানেই খিচুড়ি পাঁপড়। তবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রন্ধনপটীয়সীরা বলেছেন “দই দিয়ে খিচুড়ি খাইতে মন্দ লাগে না।” তাঁদের বক্তব্য ছিল— ‘ডালে আর চালে খিচুড়ি বানায়/খিচুড়ির স্বাদ পোলায়ে না পায়/ খিচুড়ি বৈষ্ণব ও পোলাও শাক্ত/ নিরামিষ হিন্দু খিচুড়ির ভক্ত।’
তাই আজও খিচুড়ির একটা আলাদাভাবে “নান- ক্যান- বিট” ব্যাপার আছে বইকি! আর সেকারণেই জিহ্বের জলের দুর্বলতার জন্য অনায়াসে দায়ী করাই যায় এই 'লাস্যময়ী' পদটিকে।
_________________
তথ্যসূত্রঃ
স্বামীজি, বিশ্বকবি ও নেতাজির খিচুড়ি-বিলাস : বিকাশ মুখোপাধ্যায়
খিচুড়ির উৎপত্তি ও ইতিহাস