আজ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২২তম জন্মবার্ষিকী
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বৈচিত্র্যময় লেখক বাংলা সাহিত্যে বিরল। ইতিহাস, গোয়েন্দা, অতিপ্রাকৃত, নর-নারীর প্রেম – নানা বিষয়ে লিখে গিয়েছেন সাবলীলভাবে। মুগ্ধ করে সেগুলির আশ্চর্য স্বকীয়তা।
ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের কথাই ধরা যাক। বিদেশি গোয়েন্দা কাহিনির নকল করে দায় সারেননি শরদিন্দু। ব্যোমকেশ, অজিত কিংবা সত্যবতী একশো শতাংশ বাঙালি। বলা যেতে পারে, বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনিকে তিনি সাবালক করেছেন। নেহাতই বিনোদন নয়, ব্যোমকেশ সিরিজের প্রত্যেকটি গল্প-উপন্যাসে লুকিয়ে গভীর জীবনবোধ। তাই ব্যোমকেশকে ‘গোয়েন্দা’ বা ‘ডিটেকটিভ’ বলতে শরদিন্দুর বেজায় আপত্তি। সত্য উপলব্ধি ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। গৌতম বুদ্ধ সংসার ছেড়েছিলেন সত্যের সন্ধানে। বৈদিক ঋষি থেকে আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধির জীবনচর্যায় মেলের সত্যের প্রতি ব্যাকুলতা। ব্যোমকেশও সেই চেতনায় অনুপ্রাণিত। চোর-খুনি ধরে টাকা রোজগার ব্যোমকেশের জীবনের চরম লক্ষ্য নয়। সত্যান্বেষী দার্শনিক সে। ভারতীয় দর্শনের নানা প্রসঙ্গ তার কথায় উঠে আসে। যেমন, ‘পথের কাঁটা’ উপন্যাসে প্রত্যক্ষ এবং অনুমান প্রমাণ নিয়ে অজিতের সঙ্গে তর্ক করতে দেখা যায় তাকে।
ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শরদিন্দুর প্রবল অনুরাগ ছিল। সেই ভারতাত্মাকেই তিনি খুঁজে চলেছেন ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসে। এক্ষেত্রে তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্রের উত্তরসূরী বলা যেতেই পারে, কিন্তু শরদিন্দু যে এক ভিন্ন ধারায় ইতিহাস মন্থন করেছেন, তা নজর এড়ায় না। বঙ্কিমের সাহিত্য যেন বিশাল পাথরের স্থাপত্য। আর শরদিন্দুর সৃষ্টি যেন মন্দিরগাত্রের প্রাচীন অলংকরণ। বঙ্কিম যদি মেঘের গর্জন হন, শরদিন্দু তাহলে বীণার ঝংকার।
শরদিন্দুর ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাস পড়লে সেই ধূসর অতীত যুগে হারিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে মনে জেগে ওঠে। এমনই মায়াময় বর্ণনা – তখনকার ব্যস্ত নগরী, আনন্দ উৎসবে মত্ত তরুণ-তরুণী, যুদ্ধরত রাজা, প্রগলভা রাজকন্যা – এরা সবাই হয়ে ওঠে একান্ত আপন। ‘মৃৎপ্রদীপ’ কিংবা ‘বিষকন্যা’ পড়লে অনুভব করা যায় প্রেমের কালজয়ী উত্তাপ। ‘অমিতাভ’ গল্পে শাক্যমুনি বুদ্ধ এক রক্তমাংসের মানুষ হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ান। প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধধর্ম যে কেমন প্রাণবন্ত ছিল, তা কত সহজে ফুটিয়ে তুলেছেন শরদিন্দু।
ঐতিহাসিক কাহিনিগুলোয় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা যেমন রয়েছে, তেমনি এসেছে রাষ্ট্রনীতির টানাপোড়েন, সমাজ-অর্থনীতির নানা সংকট। মধ্যযুগ নিয়ে শরদিন্দু খুব বেশি লেখেননি, তবে অল্পের মধ্যেই ছড়িয়ে দিয়েছেন মণিমুক্তো। ‘চুয়াচন্দন’ গল্পে নিমাই পণ্ডিতের কার্যকলাপ কে-ই বা ভুলতে পারবে? সদাশিবের গল্পগুলো কিশোর সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। আর ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’, ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’-র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি তো ধ্রুপদী পর্যায়ভুক্ত। কেবল প্রাণের আবেগই নয়, ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়ন করতেন শরদিন্দু। সেই পাণ্ডিত্যের ছাপ গল্প-উপন্যাসগুলিকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।
