
অথচ ট্রেন্ডিং বলছে #boycottzomato
সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে রাজনীতি ভারতবর্ষে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক যে ঘটনা একটি বেসরকারি অ্যাপ নির্ভর খাবার সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে ঘটল, তা নজিরবিহীন। নেটদুনিয়ায় যা ট্রেন্ডিং-এ পৌঁছে গেছে সবার আগে। এই সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে ভিন সম্প্রদায়ের মানুষের হাত ধরে আসা খাবারও বাতিল করা হচ্ছে। সমাজের এক অংশের মানুষ বলছেন, সত্যিই উদ্বেগের বিষয়; আরেক অংশ বলছেন এ আর নতুন কী! এ তো কবে থেকেই চলছে। ঘটনাটি ঘটে মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে। অ্যাপ নির্ভর খাবার সরবরাহকারী সংস্থা জোম্যাটো সূত্রে খবর, অমিত শুক্লা নামে এক ব্যক্তি জোম্যাটো–তে খাবার অর্ডার করেন। কিছুক্ষণ পর টুইট করে জানান, তিনি খাবারের অর্ডারটি বাতিল করছেন। কারণ তিনি জানতে পেরেছেন খাবারটি একজন মুসলিম যুবক নিয়ে আসছেন। একজন ‘সাচ্চা’ হিন্দু হয়ে কীভাবে মুসলিমের হাত থেকে খাবার গ্রহণ করবেন! পাল্টা জোম্যাটোর পক্ষ থেকেও একটি রি-টুইট করে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁরা খাবার নিয়ে যাওয়া রাইডার পরিবর্তন করতে পারবেন না। অর্ডার বাতিল করার জন্য টাকাও ফেরত দিতে পারবেন না। তখন অমিতবাবু পাল্টা টুইট করে জানান, তাঁকে খাবার নিতে জোর করতে পারে না সংস্থাটি। টাকা ফেরত দিতে হবে না। শুধু অর্ডারটি বাতিল করলেই হবে।
এই টুইটের পর অমিত শুক্লাকে যোগ্য জবাব দেয় জোম্যাটো। সেখানে তাঁরা লেখেন, “খাবারের কোনও ধর্ম হয় না। কারণ খাবার নিজেই একটা ধর্ম।” এরপর অমিতবাবুকে আর কিছু বলতে শোনা যায়নি। তাহলে কি কোনো যোগ্য উত্তর নেই তাঁর? সেইজন্যেই মুখে কুলুপ এঁটেছেন?

প্রথমেই জোম্যাটো কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ এমন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য। কিন্তু কথা অন্য জায়গায়। সোশ্যাল অ্যাপ টুইটারে দেখা যাচ্ছে ভারতে গত দুইদিন ধরে ট্রেন্ডিং-এ রয়েছে #boycottzomato এবং #ZomatoUninstalled! তার মানে এই দাঁড়ায় যে, দুইদিন ধরে ভারতের অসংখ্য মানুষ পরোক্ষে সমর্থন করছেন অমিত শুক্লাকে। যার ফলে জোম্যাটোকে সেইসব মানুষ বয়কট বা আনইন্সটল করতে চাইছেন। এখানেই একটা বড়োসড়ো প্রশ্ন উঠছে ভারতবর্ষের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। কী ভাবছেন একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের প্রগতিশীল প্রবীণরা? নবীনরাই বা এই ঘটনাকে কীভাবে দেখতে চাইছেন? এই ব্যাপারে আমরা কথা বলেছিলাম কলকাতার কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে।
সাংবাদিকতার ছাত্রী শ্রীময়ী গাঙ্গুলি বললেন, “গত তিন-চার বছর ধরেই এটা চলছে। তাছাড়া শুধুমাত্র মুসলিম নয়, সমাজের কিছু দলিত শ্রেণির মানুষও এর শিকার। এখন আর এই ধরনের ঘটনা আমাকে অবাক করে না। যিনি খাবার ক্যান্সেল করে টুইট করেছিলেন, তিনি ভালো করেই জানতেন এই দেশের অনেক মানুষকেই পাশে পাবেন। কারণ এটাই এখন দেশের ট্রেন্ড। সেটা মানুষ হোক বা খাবার।”
আরও পড়ুন
হিন্দি কি কেউ সাধে বলে নাকি?
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র অনিমেষ রায় জানান, “ভারতে প্রতিদিন যেভাবে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জোম্যাটো একটি নজিরবিহীন জবাব দিয়েছেন। তাঁদের এই জবাবকে সম্মান জানাই। আশাকরি মৌলবাদীরা জোম্যাটোর এই পদক্ষেপ দেখে শিক্ষা পাবেন।”
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়ার ডাক্তার সুনন্দ সেনগুপ্তের মতে, “পশ্চিমবঙ্গেও এমন ঘটনা যে কোনোদিন ঘটতে পারে। একজন হিন্দু, মুসলিমের হাত থেকে খাবার গ্রহণ করবেন না কিংবা একজন মুসলিম, হিন্দুর হাত থেকে খাবার নেবেন না- দুইরকমভাবেই ঘটনাটি নিন্দনীয়।”
ব্যাংকে কর্মরত সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, “এরা হিন্দু ধর্মের কিছুই বোঝে না আসলে। এদের চোখে হিন্দুত্ব মানেই মুসলিম বিরোধিতা অথচ এরাই আবার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী মহম্মদ রফি সাহেবের গাওয়া ‘রামজি কি নিকলী সওয়ারি’ গানে কোমর দুলিয়ে রামনবমী করে। এদের জন্য লজ্জা হয়, করুণা হয়, ঘৃণা জন্মায়।”
প্রসঙ্গত, জোম্যাটো সংস্থার এই টুইটে প্রায় ৯০০ রি-টুইট হয়েছে। লাইক ছাড়িয়েছে দেড় হাজার।
