শহরে লুকোনো স্বর্গোদ্যানে আজো খেলে পাখির দল

দূষণে ভরা কলকাতায় একটুকরো মুক্তাঞ্চল পাখিদের

শহরটা রোজ মরে আসছে। সবুজ কমছে। জলাভূমি কমছে। শুধু গিজগিজে মানুষের ভিড় আর বাড়ি। ‘সারি সারি সব বাড়ি, যেন সার বাঁধা সব সৈন্য’। ধোঁয়া, দূষণ আর কংক্রিট। এই শহরে অনন্যরা যে কোথায় থাকে! আর পাখিরা? এত আলো, আওয়াজ বাঁচতে পারে ওরা? ডানা ভারী হয়ে আসে না ধোঁয়ার ভারে?

নীলগলা বসন্তবৌরি (Blue throated barbet)

আমরা যারা শখের পাখিপ্রেমিক, তারা ইতি-উতি ঘুরে বেরাই ক্যামেরা নিয়ে। যদি পাখির দেখা মেলে। তাদের জাত-ঠিকুজি-কুষ্ঠি সব গিলে হজম করে ফেলি। দেখলেই গড়গড়িয়ে বলে দেব সব। মায় ল্যাটিন নামটাও। কিন্তু, পাখিদের বেঁচে থাকার পৃথিবীটা যে রোজ ক্ষীণ হয়ে আসছে, সে নিয়ে আমাদের কতখানি যায় আসে, নিজেও ভালো বুঝি না।

কলকাতায় পাখি কমেছে সে বহুদিন হল। স্বাভাবিক ব্যাপার। মেট্রোপলিসে প্রচুর গাছ-পাখি-জীবিবৈচিত্র থাকবে, সে যেন তার অহংকারের সঙ্গে মেলে না। থাকলে থাকবে চিড়িয়াখানায়। চারপাশে প্রকৃতি গিজগিজ করলে আর কীসের মেট্রোপলিস, তাই না? তার গৌরব জমকালো চেহারায়, ঝাঁ চকচকে কলেবরে। কলকাতাও সেই পথের পথিক। অতএব, পাখি তো কমবেই।

বর্ণালী/ নওরঙা (Indian Pitta)

অথচ, আজো কলকাতায় লুকিয়ে রয়েছে দু-একটুকরো স্বর্গোদ্যান। যেখানে পাখিরা ভিড় করে, এ ডাল থেকে সে ডালে উড়ে বেড়ায়। কাঠবেড়ালি উঁকি মারে গাছের কোণ থেকে। জলের ওপর লুটিয়ে পড়ে ফুল। তেমনই একটি স্বররগের নাম রবীন্দ্র সরোবর। আমরা অবশ্য ডাকি ঢাকুরিয়া লেক নামেও। 

কালো মাথা বেনেবউ (Black headed Oriole)

রবীন্দ্র সরোবরে প্রথম গেছিলাম আমার কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে। তখন ২০১৩ সাল। তারপরও অবশ্য বেশ কয়েকবার গেছি বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বা প্রেমিকার সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু, কোনোদিনই সেইভাবে চোখ মেলে দেখা হয়নি সরোবর-কে।

রক্তচোষা গিরগিটি(Oriental garden lizard/ eastern garden lizard)

ইদানীং এক সুন্দরীর সাথে দেখা করতে যাতায়াত বেড়েছে সরোবরে। প্রথম দেখাতেই মজেছি তার প্রেমে। তাই, এই কদিনও তার থেকে চোখ সরিয়ে আলাদা দেখা হয়নি সরোবর-কে। না না, এই সুন্দরী কোনো মানবী নয়। এর ডানা আছে। ওই যে বলছিলাম শখের পাখিপ্রেমিক। পাখির খোঁজেই তাই যাওয়া। শুনেছিলাম, লেকের ধারে নাকি দেখা মেলে কয়েকজন সুন্দরীর। তাই শুনেই যাওয়া।

কাঠবেড়ালি দুষ্টু ভারি

একজাতের সুন্দরীর নাম বর্ণালী বা নরঙা (Indian Pitta)। তার দেখা মিলল। লেকের ধারের গাছ-গাছালির ভিড়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে আরো কয়েকটি জাতের পাখি। বাতাবি কাঠঠোকরা (Fulvous woodpecker), নীলগলা বসন্তবৌরি (Blue throated barbet), সাদা বুক মাছরাঙা (White breasted kingfisher), কালো মাথা বেনেবউ (Black headed Oriole) এবং কমলা ফুলি বা কমলা ধামা (Orange headed Thrush)। শহরে আর খুব বেশি জায়গায় একত্রে এদের দেখা মেলে না বোধহয়। কিন্তু, এই সরোবরের পাশে আজো এরা ভালোই আছে।

বাতাবি কাঠঠোকরা (Fulvous woodpecker)

সঙ্গে দেখা মিলতে পারে রক্তচোষা গিরগিটিরও। কাঠবেড়ালি তো অসংখ্য। 

যদিও, এই লেকও ইদানীং খবরের শিরোনামে আসছে দূষণের জন্য। কদিন আগেও লেকের ধারে মরে পড়েছিল একাধিক পাখি। শব্দদূষণের অত্যাচার সইতে পারেনি। জানি না, এই একচিলতে ফুসফুসটাও কদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবে কলকাতা।

বাইপাশের ধারে জলাভূমি সরু হচ্ছে ক্রমশ। মরে আসছে গাছপালা, সবুজ। সারা পৃথিবী জুড়েই বন-জঙ্গল-নদী এমনকি পাহাড়ও উবে যাচ্ছে উন্নয়নের সামনে। পুরুলিয়ার অযোধ্যায় কয়েক লক্ষ গাছ কেটে পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পের পরিকল্পনা চলছে। এইসব দেখলে-শুনলে মনখারাপ হয়ে আসে। কোথায় যাবে এইসব পাখি, গিরগিটি, কাঠবেড়ালিগুলো? কোনোমতে বেঁচে থাকা শিয়ালগুলো? এরা কি বুঝতে পারে কত দ্রুত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হতে চলেছে ওদের?

কমলা ফুলি/ কমলা ধামা (Orange headed Thrush)

সেদিন দেখছিলাম, ছটফটে কমলা ফুলিটা বেজায় ব্যস্ত। দেখতে দেখতেই কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল সবটা। মনে হচ্ছিল, এরা বেঁচে থাক। দরকারে শহরে কয়েকটা শপিং মল কমুক, একটা-দুটো ব্রিজ কমুক, হ্যাং-আউটের জায়গার একটু কমতি হোক আমাদের। তারপরেও তো আমরা বেঁচে থাকব। কিন্তু, ওরা যে ফুরিয়ে যেতে বসেছে আমাদের উন্নতির চাপে।

যেটুকু ফুসফুস বেঁচে আছে, থাকুক। থাকুক… 

একচিলতে স্বর্গোদ্যান

Post Tags
Developed by DXDasia