
২০২৩ সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক হামিরুদ্দিন মিদ্যা
“লেখালিখির জন্য একদিন বিরাট বড়ো কোনো সম্মাননা কিংবা পুরস্কার পাবো, এমন আশা নিয়ে আমি লিখতে শুরু করিনি। এত সম্মানজনক একটি পুরস্কার লাভের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে; আশা করি আমার পাঠকেরা যতখানি প্রত্যাশা রেখেছেন, আমি তার মান রাখতে পারবো।” ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে জানান হামিরউদ্দিন মিদ্যা (Hamiruddin Middya), যাঁর মুকুটে সদ্য যোগ হয়েছে সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার ২০২৩-এর পালক। মাত্র ২৬ বছর বয়সে, তাঁর লেখা দ্বিতীয় গদ্য সংকলন ‘মাঠরাখা’র জন্য এই সম্মান লাভ করেছেন হামিরুদ্দিন। ১৮টি গল্প রয়েছে এই বইটিতে, প্রথম প্রকাশিত হয় সোপান প্রকাশনীর তত্ত্বাবধানে, ২০২২-এর কলকাতা বইমেলায়।
এর জন্য তিনি অতীতে লাভ করেন কৃত্তিবাস প্রদত্ত ‘সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্মাননা ২০২২’। হামিরউদ্দিনের লেখা প্রথম গল্প সংকলনের নাম ‘আজরাইলের ডাক’, যা তাঁকে এনে দেয় ‘দৃষ্টি সাহিত্য সম্মান’। বইটির কিছু গল্প পরবর্তীকালে হিন্দি ও ইংরাজিতে অনূদিত হয়। এছাড়াও, লেখালিখির জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের তরফ থেকে তিনি লাভ করেন ‘ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০২২’।
সাহিত্যের প্রতি এই অদম্য টান অনুভব কবে থেকে? বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় হামিরউদ্দিন জানান, “ক্লাস সেভেন কিংবা এইটে পড়তে হাতে পাই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’। পাতা উল্টাতে উল্টাতেই কখন যে বুঁদ হয়ে ডুবে গিয়েছিলাম বইটার মধ্যে, নিজেও বুঝতে পারিনি। সেই আমার মুগ্ধ হওয়ার শুরু। চটজলদি লাইব্রেরি কার্ডের জন্য আবেদন জানাই, আর তা অনুমোদন হতেই গোগ্রাসে পড়তে থাকি ‘পথের পাঁচালি’ অথবা ‘আরণ্যক’-এর মতো বাংলার কালজয়ী সাহিত্যকীর্তিগুলি। ক্লাসে যখন শিক্ষকেরা মহাশ্বেতা দেবীর ‘ভাত’, ‘হারুন সালেমের মাসি’, বা বনফুলের গল্পগুলো পড়াতেন, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনে যেতাম। নতুন ক্লাসে উঠবার পর, বাংলা পাঠ্যবই হাতে পাওয়া মাত্র এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতাম সমস্ত গল্পগুলো, সিলেবাস কমপ্লিট হওয়ার অনেক আগেই।”

বিখ্যাত সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে পড়তেই নিজে গল্প লেখার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। ২০১৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষের পর যখন বেশ ক’দিনের লম্বা ছুটি চলছিল, সে সময়েই তাঁর গল্প লেখায় হাতেখড়ি হয়। হামিরউদ্দিনের লেখা প্রথম গল্পটি তাঁর বাসস্থান, বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে প্রকাশিত ‘লগ্নঊষা’ নামের ম্যাগাজিনে স্থান করে নিয়েছিল। তার পর থেকেই একের পর এক গল্প লিখে যান তিনি। তাঁর লেখায় জায়গা পায় স্থানীয় মানুষদের জীবন, দুঃখ-যন্ত্রণা, আশা-আকাঙ্খার কাহিনি। বাবা বংশানুক্রমে, পেশাগত ভাবে চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে হামিরুদ্দিনও প্রায়শই কৃষিকাজে বাবাকে সাহায্য করেন। জীবনে এমনও সময় গেছে, যখন আর্থিক অনটনের কারণে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।
তিনি মনে করেন, এই পুরস্কার তাঁর দায়িত্বকে অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এখনও অবধি সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের যে দিকগুলো সাহিত্যের আলোচনায় উঠে আসেনি, তাই তিনি তুলে ধরতে চান আগামীতে।
তবে এ সব কোনোকিছুই লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি হামিরউদ্দিনকে। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি নয়, বরং তাঁর কলমের জোরই মানুষের কাছে তাঁকে পরিচিত করে তুলবে। এত কাজের মধ্যে লেখার সময় পান কীকরে? হামিরউদ্দিন সহাস্যে জানান, “আচমকা কোনো লেখা মাথায় এলে, তার উপর আর আমার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমনও হয়েছে যে আমি কাজ করতে করতে, মাঠেই লিখতে শুরু করেছি। প্রকৃতির কাছ থেকে সব চাইতে বেশি লেখার অনুপ্রেরণা পাই আমি। তবে মানুষ ছাড়া তো আর গল্প হয় না, তাই মানুষ, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঘটনা নানা ভাবে ফিরে আসে আমার লেখা গল্পগুলোয়। কত সময় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা মাঠে কাজ করতে করতে কানে ভেসে আসে মানুষের কথোপকথন। অবাক হয়ে ভাবি, এমনটা তো আগে ভেবে দেখিনি! তাছাড়া, জীবনে চলার পথে যা কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তার জন্য আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ। জীবনে দেখা সেই সব ঘটনাগুলোই তো বিভিন্ন ভাবে উঠে এসেছে আমার লেখায়।”
হামিরউদ্দিন গর্ব করে বলেন, অবদমন নয়; বরং এগিয়ে চলবার সাহসই যুগিয়েছেন তাঁর সমকালীন ও অগ্রজ লেখক-সাহিত্যিকেরা। সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, অল্প সময়েই বৃদ্ধি পেয়েছে তাঁর অনুরাগী-সংখ্যা। নিজের জেলার মানুষের কাছে তিনি রাতারাতি হয়ে উঠেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রায়শই অচেনা মানুষেরাও বাড়ি এসে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কী লিখছেন বা লেখার মাধ্যমে সমাজের কাছে কোন বার্তা তুলে ধরতে চাইছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পোষণ করেন হামিরউদ্দিন। তিনি মনে করেন, এই পুরস্কার তাঁর দায়িত্বকে অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এখনও অবধি সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের যে দিকগুলো সাহিত্যের আলোচনায় উঠে আসেনি, তাই তিনি তুলে ধরতে চান আগামীতে।
হামিরউদ্দিন বলেন, “বর্তমানে দেখা যায় বাবা-মায়েরা সহজেই সন্তানদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। ইন্টারনেট অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে। তবে এর বদলে যদি শিশুদেরকে বইয়ের সঙ্গে বেশি করে পরিচিত করে তোলা যায়, তাহলে একাধারে যেমন তাদের জ্ঞানের খিদে মিটবে, অন্যদিকে আমারই মতো কারো কারো মধ্যে হয়তো কলম ধরবার ইচ্ছে জন্ম নেবে।”
