
এক ছাদের নিচে মিলবে সবকিছু! তখন কল্পনাও করতে পারত না শহরবাসী
হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন দুই ভাই গিয়ে দাঁড়ালেন কলকাতার ‘হল অ্যান্ড অ্যান্ডারসন’ নামে দোকানটার সামনে৷ উপরে বড় বড় করে দোকানের নাম লেখা৷
হর্ষবর্ধন বললেন, “পড়ে দ্যাখ তো, কি লিখেছে বড় বড় ইংরেজীতে?”
গোবর্ধন বানান করে পড়ে মনে মনে! তারপর বলে, “বুঝেছ দাদা, এরা হচ্ছে সব হল্যান্ডের৷ হল্যান্ড বলে একটা দেশ আছে জানো তো? ইংল্যাণ্ড, হল্যান্ড, ইসকটল্যান্ড…”
“যা যাঃ! তোকে আর ভূগোল ফলাতে হবে না৷ ভারি তো বিদ্যে! তার আবার ইসকটল্যান্ড!” হর্ষবর্ধন ধমকে দেন, “কি পড়লি তাই বল৷”
“ঐ কথাই, হল্যান্ড আর তার ছেলেপুলে৷” গোবর্ধন ব্যাখ্যা করতে চায়, “ঐ তো স্পষ্টই লিখে দিয়েছে৷ পড়েই দ্যাখো না! হল্যান্ড- অ্যান্ড- অ্যান্ড মানে তো এবং? অ্যান্ড হার- হার মানে তো তার? হিজ- হার- মনে নেই তোমার? অ্যান্ড হার সন, এবং তার ছেলেপুলে৷”
হর্ষবর্ধনের চোখ এবার স্বভাবতই কপালে ওঠে৷ অ্যাঁ! এত বড় কথা লিখে দিয়েছে৷ কলকাতায় এসে কারবার করছে কি না স্বয়ং হল্যান্ড? সঙ্গে আবার তার ছেলেপুলে নিয়ে? অবাক কান্ড!
পেটে খিল ধরানো এরকম অজস্র 'অবাক কান্ড' বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের উপহার দিয়ে গিয়েছেন শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর লেখা ‘দোকানে গেলেন হর্ষবর্ধন’-এ তিনি এভাবেই বর্ণনা দিয়েছিলেন কলকাতার প্রথম ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘হল অ্যান্ড অ্যান্ডারসন'-এর।
সেই সময়ের কথা, যখন কলকাতার সভ্যতায় কোনও বহুজাতিক বিপণনী সংস্থা বা ‘শপিং মল’ ছিল না। এক ছাদের নিচে সবকিছু পাওয়া যেতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারত না শহরবাসী। সেই সময়ই কলকাতায় ‘অল-ইন-ওয়ান’ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা বিভাগীয় বিপণী নির্মানের স্বপ্ন দেখেন দুই ব্রিটিশ বন্ধু, উইলিয়াম অ্যান্ডারসন এবং পি এন হল। তাঁদের সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়ে তাঁরা বানিয়ে ফেলেন কলকাতার প্রথম ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘হল অ্যান্ড অ্যান্ডারসন'। খুব অল্প সময়েই তাঁরা সাফল্য পান এবং অচিরেই শহরের অভিজাত শ্রেণীর জন্য একটি অন্যতম গন্তব্য স্থলে পরিণত হয় এটি।
খাবার থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, সবই বিক্রি করতে শুরু করেন দুই বন্ধু। কলকাতার বৃহত্তম বস্ত্র বিপণী ফ্রান্সিস, হ্যারিসন, হ্যাথওয়ে অ্যান্ড কোং-এর বিক্রয় বিভাগে কাজ করতেন অ্যান্ডারসন। সেই প্রতিষ্ঠানেরই অ্যাকাউন্ট বিভাগে কাজ করতেন হল। একই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবাদে দু'জনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং একটি অসাধারণ স্বপ্ন ভাগ করে নেন তাঁরা। অনেক ভালোবাসা দিয়ে সেই স্বপ্নকে লালন করলেও, স্বপ্নের উড়ানকে বাস্তবায়িত করার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তাঁরা। অতঃপর ১৮৯৪ সালে স্বপ্নের পথ চলা শুরু করেন দুই বন্ধু। চৌরঙ্গির গভর্নর হাউসের কাছে একটি সুন্দর দোকান স্থাপন করেন হল ও অ্যান্ডারসন। প্রাথমিকভাবে আমদানিকৃত মানানসই সামগ্রী বিক্রি করতে শুরু করে সেখানে।
পাহারাদার রাখার মতো সামর্থ না থাকায় প্রতি রাতে অ্যান্ডারসন এবং হল তাঁদের বিপণীতেই ঘুমাতেন। এই পরিশ্রমই তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করেছিল। খুব তাড়াতাড়ি ব্যবসায় উন্নতির মুখ দেখেন তাঁরা এবং বিপণীটি হোয়াইটওয়ে ল্যাডলাও অ্যান্ড কোং (যা মেট্রোপলিটন বিল্ডিং নামে পরিচিত)-এ স্থানান্তরিত করেন। ব্যবসা সমৃদ্ধ হলে চৌরঙ্গি এবং পার্কস্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় সম্পত্তিও কেনেন দু’জনে। ১৯২৫ সালে পুরো কমপ্লেক্সটি ভেঙে ফেলে তার জায়গায় একটি বিশাল বিল্ডিং স্থাপন করেন তাঁরা, যা অচিরেই ভারতের সেরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হিসেবে জায়গা করে নেয়।
হল ও অ্যান্ডারসন প্রাথমিকভাবে আমদানিকৃত পণ্য নিয়েই বিপণী শুরু করেছিল এবং বিশেষত শীতের সময় সেরা সামগ্রীগুলো আসত ইউরোপ থেকে। আসবাব বানানোর জন্য তাঁরা বার্মিজ কাঠ এবং উচ্চ মানের ভারতীয় মেহগনি ব্যবহার করতেন। ইলোরা, মির্জাপুর, কাশ্মীর এবং বেনারস থেকে আমদানিকৃত একচেটিয়া কার্পেট কিনতে গ্রাহকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন। লাল কিতাবের (৬০০-পৃষ্ঠার একটি জনপ্রিয় ক্যাটালগ) প্রায় ১০,০০০ অনুলিপি প্রকাশ করেন তাঁরা, যাতে তাঁদের ব্যবসায় আরও উন্নতি হয়। হল ও অ্যান্ডারসন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং বাঙালি তরুণদের সেলসম্যান হিসাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ঠিকই তবে, বিক্রি-কার্যকলাপের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ তরুণদেরই বেশি পছন্দ করতেন তাঁরা।
আরও পড়ুন: ৫৬ রকমের পাখি আজও দেখা যায় কলকাতায়
ডাচ, ব্রিটিশ এবং ইহুদিরা ভারত ছাড়তে শুরু করার পরেই ঐতিহাসিক এই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটি বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার এক বছর আগে, সাহান লাই জাজোদিয়ার কাছে ব্যবসাটি হস্তান্তরিত হয় এবং এভাবেই ব্রিটিশ উত্তরাধিকারের অবসান ঘটে।
