কুর্নিশঃ জোম্যাটোকর্মীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করল ‘ক্যালকাটা ৬৪’

ডেলিভারি বয়দের অক্লান্ত পরিশ্রমকে সম্মান জানাতে এই আয়োজন

তাঁদের নিজেদের তেমন কোনো চাহিদা নেই। অন্যের চাহিদা মেটাতেই রোদ-ঝড়-জলে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন খাবার। কাস্টমারদের হাতে খাবার ধরিয়েই মুখে লেগে থাকে এক চিলতে হাসির রেখা, “রেটিংটা একটু দিয়ে দেবেন প্লিজ!” ‘রেটিং’ এই একটামাত্র ইংরেজি শব্দ, যে শব্দের ভালো-খারাপের উপর নির্ভর করে তাঁদের জীবিকার ভবিষ্যৎ। অবশ্য মাঝেমধ্যে কটূ কথাও মুখ বুজে শুনতে হয় তাঁদের। তাঁরা লাল জামা পরা বিভিন্ন ছেলে-মেয়ে। ডেলিভারি বয়/গার্লের কাজ করেন জোম্যাটোতে। জোম্যাটোর কর্মচারীদের জন্যই এবার সল্টলেকের ‘ক্যালকাটা ৬৪’ এবং ‘অওয়াধি বিরিয়ানি’ আয়োজন করল এক মধ্যাহ্নভোজের।

‘ক্যালকাটা ৬৪’-এর অন্যতম কর্ণধার দেবজিত পাল রেস্তোরাঁর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক জোম্যাটো কর্মীদের জন্যই এমন আয়োজন করেছিলেন সম্প্রতি। ‘ক্যালকাটা ৬৪’-এর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। শুরু থেকেই জোম্যাটো তাঁদের পার্টনার। রাতদিন যেভাবে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য কর্মীরা এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ান, কিন্তু তাঁদের খোঁজ ক’জনই বা রাখেন! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে ২০১৭ সালের একটি ঘটনার কথা। দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরের প্রবীণ দম্পতি তরুণ মাইতি এবং শিখা মাইতি। জোম্যাটোতে খাবার অর্ডার দিয়েছেন গ্রীষ্মের এক মধ্য দুপুরে। শিখাদেবী অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ বোধ করছেন। কার্যত দিশেহারা পরিস্থিতি তরুণবাবুরও। কলিং বেল বেজে উঠল। জোম্যাটো থেকে খাবার চলে এসেছে। তরুণবাবু ছেলেটিকে বললেন, “খাবার পৌঁছে দেবার জন্য ধন্যবাদ। দেখুন না, আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ। কী করব বুঝতে পারছি না।” ডেলিভারি বয় তখন নিজের ‘রেটিং’ ভুলে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। দম্পতির ছেলে থাকেন বিদেশে। তাঁদেরও বেশিরভাগ সময় কাটে ছেলের কাছেই। এখন এই ডেলিভারি বয়-ই সন্তানের কাজটি করলেন। শিখাদেবী পরবর্তীতে আত্মীয়স্বজনদের জানিয়েছিলেন, একদিন সেই ডেলিভারি বয়কে বাড়িতে ডেকে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, “কী হে ছোকরা, রান্না ভালো হয়েছে তো? কত রেটিং দেবে আমায়?” হাসিতে ভরে গিয়েছিল দম্পতির বাড়ি।

কিছুদিন আগেই আমরা কড়া লকডাউন পার করে এসেছি। লকডাউনের কিছু মাস পর থেকেই জোম্যাটো বা সুইগি কাস্টমারদের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের কোনো ছুটি সে অর্থে ছিল না। মানবিক দৃষ্টি দিয়ে এসব দিক পর্যালোচনা করা উচিত। যা অধিকাংশ সময়ই আমরা ভুলে যাই। ‘ক্যালকাটা ৬৪’-এর কর্ণধার দেবজিত পালকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, “আমাদের অনলাইন ব্যবসার পুরোটাই নির্ভর করে জোম্যাটো কর্মীদের ওপর। প্যান্ডেমিকের সময় সবকিছু উপেক্ষা করে অসাধ্যসাধন করেছেন কর্মীরা। তাই আমাদের পক্ষ থেকে একটা ধন্যবাদজ্ঞাপন এবং তাঁদের স্বীকৃতি জানানো। আমাদের রান্না তাঁদের খাওয়াতে পেরে ভীষণ গর্ববোধ করছি।”

লকডাউনের সময় কাজ হারিয়েছেন একাধিক ডেলিভারি বয়। বিনা নোটিশে তাঁদের চাকরি গেছে। ২০১৯-এর একটি ঘটনা অবাক করেছিল গোটা দেশকে। এক মুসলিম ছেলের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল এক হিন্দু কাস্টমারের বাড়িতে খাবার পৌঁছানোর। কিন্তু কাস্টমার সেই খাবার খেতে নারাজ। কারণ ছেলেটি একজন মুসলিম। জোম্যাটোর ডেলিভারি বয় ফৈয়াজ পরে দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, “এমন ঘটনায় আমি আহত, তবে আমি কী করতে পারি… আমরা দরিদ্র মানুষ, আমাদের এই জাতীয় ব্যবহারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।”

কয়েকদিন আগেই জোম্যাটো কর্মচারীর খাবার পৌঁছাতে একটু দেরি হয়েছে বলে, এক মহিলা জুতো পেটাও করেন। ‘অশান্ত’ বিশ্বে মাঝে মাঝে সুখবর পেলে কার না ভালো লাগে! ‘ক্যালকাটা ৬৪’ এবং ‘অওয়াধি বিরিয়ানি’র এহেন উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন নেটাগরিকেরা। একটি ফেসবুক পোস্টে অভিনেতা অরিত্র দত্ত বণিক প্রথম প্রকাশ্যে আনেন খবরটি। পোস্টে অরিত্র লেখেন, “সারাবছর হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে রকমারি খাবার পার্সেল নিয়ে কাস্টমারদের জন্যে নিয়ে যান তাঁরা। কোনোদিন ভিতরে ঢুকে আরাম করে দু-মিনিট বসার বা টেস্ট করার সুযোগ হয় না। তাই সমস্ত জোম্যাটো ডেলিভারি পার্টনারদের একদিন ব্যক্তিগতভাবে নেমন্তন্ন করে শুধুমাত্র তাঁদের জন্য লাঞ্চ পার্টি আয়োজন করল আমাদের বন্ধু অওয়াধি বিরিয়ানি এবং ক্যালকাটা ৬৪-এর বিজনেস হেড দেবজিত পাল। মিডিয়াতে এই খবরগুলো আসে না, হয়তো কোনোদিন আসবেওনা। শুধুমাত্র দেবজিতের মতো বহু মানুষ আজও বেঁচে আছে বলে, নতুন কিছুর সম্ভাবনা দেখতে পাই।”

অরিত্র দত্ত বণিকের ফেসবুক পোস্ট

Post Tags
Developed by DXDasia