বাগান আর বিজ্ঞান নিয়ে আজীবন মেতেছিলেন ঠাকুরবাড়ির গিরীন্দ্রনাথ

উনিশ শতকের বিলাসী জীবনযাত্রাই ছিল তাঁর স্বভাব, এমনকি ব্রাহ্মধর্মও গ্রহণ করেছিলেন

দেবেন্দ্রনাথের যশের কিস্‌সা তো সকলে জানে। কিন্তু দ্বারকানাথের মধ্যম পুত্র গিরীন্দ্রনাথের কথা সেইভাবে প্রচার হয়নি কখনো। ঠাকুরবাড়ির সেপিয়া রঙের নস্টালজিয়ায় গিরীন্দ্রনাথ এক সোনার ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। তাঁর সূক্ষ্ম বিলাসিতার গল্প, রসবোধ, শিল্পমনস্কতা— অলক্ষ্যে ছুঁয়ে গিয়েছিলো রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের মতো শিল্পীদের মন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আরেক দখিনা বাতাসের নাম ছিল গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

‘ফি রবিবারই শুনেছি দাদামশায় বন্ধু-বান্ধব, ইয়ার-বক্সী নিয়ে বের হতেন—সঙ্গে থাকত খাতা-পেন্সিল, তাঁর ছবি আঁকার শখ ছিল। দু-একজোড়া তাসও থাকত বন্ধু-বান্ধবদের খেলার জন্য। এই জগন্নাথ ঘাটে পিনিস থাকত, তার উপরে হাতিমার্কা নিশেন উড়ছে পতপত করে। ওই তাঁর শখ, দামামা পিটিয়ে চলতেন পিনিসে।’ রানি চন্দকে এই গল্প শুনিয়েছিলেন অবন ঠাকুর। তাঁর বিলাসী দাদামশায়ের গল্প। গঙ্গা ভ্রমণের সময় যখন অতন্দ্র নীরবতায় সকলে তাস খেলতেন, গিরীন্দ্রনাথ খানকয়েক তাস নিয়ে গঙ্গায় দিতেন ফেলে। অমনি হইহই কাণ্ড। ঠিক এই হইচইটাই চাইতেন গিরীন্দ্রনাথ। নৌকা ভ্রমণে মাঝে মাঝে এসে অংশগ্রহণ করতেন ঈশ্বর গুপ্ত। গিরীন্দ্রনাথের আবদারে নতুন নতুন কবিতা লিখে আনতেন। একবার গরমকালে বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে সবাই মিলে ডাবের জল, বরফ, আরো বিচিত্র খাবার খাচ্ছেন সবাই আর ঈশ্বর গুপ্তকে গিরীন্দ্রনাথ বলেছেন গ্রীষ্মকালের কবিতা লিখতে। ঈশ্বরগুপ্তও মজার ছলে বলে উঠলেন, ‘দে জল দে জল বাবা দে জল দে জল/ দে জল দে জল বাবা জলদেরে বল।’ গিরীন্দ্রনাথ মানেই এমন হাসিখুশি নস্টালজিয়া। ছবি, গান, যাত্রা, অভিনয়ে তিনি পুরোদস্তুর শিল্পী ছিলেন। ‘কামিনীকুমার’ নামে কাব্যোপন্যাস লিখেছিলেন। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেও পরম উৎসাহ ছিল তাঁর। ঠাকুরবাড়ির গ্রন্থাগারে রাখা পদার্থবিদ্যার বইগুলি মন দিয়ে পড়তেন গিরীন্দ্রনাথ। 

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘বিলাসিতার প্রতিমূর্তি’ ছিলেন গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তবে উনিশ শতকের ধনী পরিবারের বিলাসী জীবনযাত্রাই ছিল তাঁর। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে গিরীন্দ্রনাথও ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তত্ত্ববোধিনী সভার অধ্যক্ষও হয়েছিলেন একটা সময়। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের মতো ব্রাহ্মধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ অনুরাগ ছিল না তাঁর। সেই কারণেই দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর গিরীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক সত্তা এবং ধর্মভীরু চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেবেন্দ্রনাথ যখন শালগ্রাম শিলা ছাড়া পিতৃশ্রাদ্ধ করবেন বলে মনস্থির করেন, তখন গিরীন্দ্রনাথ মনে মনে সংশয় প্রকাশ করেন। গিরীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের অজ্ঞাতসারে আত্মীয় পরিজনের মন রাখতে শালগ্রাম শিলা নিয়ে প্রথা মেনে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন অভিমানী শব্দ— ‘আমি তাড়াতাড়ি ষোড়শ ও দানসামগ্রী সকল উৎসর্গ করিয়াই আমার তেতলায় চলিয়া গেলাম। –শুনিলাম গিরীন্দ্রনাথ শ্রাদ্ধ করিতেছেন।’ এরপর গিরীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় লক্ষ্মী জনার্দনের সেবক হয়ে যান। তাঁর স্ত্রী যোগমায়া পরে লক্ষ্মীজনার্দনের দায়িত্ব নেবেন এবং বৈঠকখানা বাড়িতে চলে আসবেন। দুই ভাই মনে মনে পরস্পরের অনুরক্ত থাকলেও দুটি ভিন্ন ধর্মমতকে আঁকড়ে ধরবেন। কার টেগোর কোম্পানির  দায়িত্ব নিয়েছিলেন গিরীন্দ্রনাথ। কিন্তু দক্ষ হাতে তা সামলাতে পারেননি। দ্বারকানাথের বিপুল ঋণশোধের দায় নিতে চেষ্টা করলেও দেবেন্দ্রনাথের মতো নিজের শখ কমাতে পারেননি গিরীন্দ্রনাথ। 

বাগানবিলাস, বিজ্ঞানবিলাস — এইসব নিয়েই মেতে থাকতেন তিনি শিশুর মতো। একবার এক কাবুলিকে ঠকিয়েছিলেন। জলে টাকা ফেলে ব্যাটারি চার্জ করে দিয়েছিলেন। কাবুলি আর কিছুতেই টাকা তুলতে পারে না। সে এক কাণ্ড! ব্রহ্মসংগীতও রচনা করেছিলেন তিনি। দুর্গাপুজোর দায়িত্ব নিতেন খুশিমনে। তাঁর লেখা ‘বাবুবিলাস’ যাত্রা হতো মহাসমারোহে। একবার ভাগ্নে ঈশ্বর মুখুজ্জ্যেকে আসল গোঁফ দাড়িওয়ালা দারোয়ান সাজালেন। মাঝখানে সিঁথিকাটা গালের দুদিক দিয়ে কান পর্যন্ত টেনে নেওয়া দাড়ি। সেই দেখে ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের দাড়ি রাখার শখ জাগলো। দেবেন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সকলের।

গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী ছিলেন ব্যক্তিত্বময়ী যোগমায়া। গণেন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ, কাদম্বিনী আর কুমুদিনী— এই তাঁদের ছেলে মেয়ে। শোনা যায়, কাদম্বিনীর পাত্র খুঁজতে গিয়ে এক কাণ্ড করেছিলেন। সুদর্শন কুলীন ঘরের ছেলে যজ্ঞেশপ্রকাশকে গঙ্গার ঘাট থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ পিরালী বংশের মেয়ের সঙ্গে তখনকার দিনে কুলীন ঘরের ছেলেদের বিয়ে হতো না। 

সংক্ষিপ্ত জীবন ছিল গিরীন্দ্রনাথের। মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে ছুটি নেন জীবনচক্র থেকে। দ্বারকানাথের মতো বিপুল বৈভব অর্জন করেননি। দেবেন্দ্রনাথের মতো সম্মানও নয়। তিনি ছিলেন নিজের মতো। যেন এক খেয়ালি পাগলা ঝোরা। যুক্তি তর্ক নিয়ম নিষেধের বাঁধনে তাঁকে আটক করা যায় না। গিরীন্দ্রনাথ এক বহুমুখী শিল্পীর নাম।

সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির সাতকাহন, শান্তা শ্রীমানী

Developed by DXDasia