রণধীর রায় : যাঁর হাত ধরে উচ্চাঙ্গসংগীতে একক যন্ত্র হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল এস্রাজ

সিন্ধু-গান্ধার, মধু-পলাশের মতো রাগের স্রষ্টা

রণধীর রায়

এক যন্ত্রের সঙ্গে অন্য যন্ত্রের প্রভেদ ও সামঞ্জস্য কোথায়-কতটা, যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে কণ্ঠসংগীতের কী সম্পর্ক, সংগীতের সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক -এই নিয়ে তুমুল তর্ক-আলোচনা এবং সেই প্রসিদ্ধ উঁচু গলার হাসি, এই নিয়ে রণধীর। রণধীরের মগ্নতা শিল্পের মগ্নতা।
-শঙ্খ ঘোষ

না  শুনলে যেমন বোঝা যাবে না ‘সেই প্রসিদ্ধ উঁচু গলার হাসি’ বলতে শঙ্খবাবু ঠিক কী বলতে চেয়েছেন, তেমনই সংগীতের প্রকৃত শ্রোতা হতে না পারলে অনুভব করা যাবে না এস্রাজ বাদ্যযন্ত্রটি নিয়ে রণধীর রায় আজীবন কী বলতে চেয়েছেন – সংগীতে শিল্পের মগ্নতা কেমন ভাবে থাকে।

নতুন গৎ, বন্দিশ ও নতুন রাগ রচনার প্রতি তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিলো। যেমন, তিলক-কল্যাণ, সিন্ধু-গান্ধার, মাজ-ইমন, ভূপ-ভাটিয়ার ও মধু-পলাশ ইত্যাদি রাগগুলি তাঁর নিজস্ব কল্পনা।

রথের দিন, কলকাতায় ৪ জুলাই ১৯৪৩-এ রণধীর রায়ের জন্ম। বাবা ও মা যথাক্রমে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসুর ছাত্র ছিলেন। শিল্পীদম্পতি প্রশান্ত ও গীতা রায়ের কনিষ্ঠ সন্তান রণধীর বাবার কর্মসূত্রে ১৯৫১ সালে চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। ঐ বছরই পাঠভবনে ভর্তি হন। সংগীতভবনে অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের ছাত্রী, ছোটোমাসি লতা রায়ের এস্রাজ-অনুশীলনই বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি রণধীরের প্রেমের সূচনা। বিষ্ণুপুর ঘারানার প্রখ্যাত শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এস্রাজ বাদন শৈলীর প্রবর্তনের ধারায় এস্রাজের জয়যাত্রা। আট বছরের রণধীর সেই ধারার আর এক বিখ্যাত শিল্পী অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। একেবারে প্রাচীন পদ্ধতিতে, অর্থাৎ মাপা সময়ে, ছকে বাঁধা শিক্ষা নয়, যুগোপযোগী। তাঁর কথায় তিনি এস্রাজ যন্ত্রটি নির্বাচন করেছিলেন এর ধ্বনির প্রতি আকর্ষণে। ১৯৮৫ সালে ফরাসি তথ্যচিত্র নির্মাতা ক্লদ সোভাজো রণধীর রায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তার কিছু অংশ নিজের সাক্ষীচিত্র ‘এসরাজের রণধীর’-এ ব্যবহার করেছেন অরিন্দম সাহা সরদার।  সেখানে রণধীর বলেছেন, “সংগীতভবনে বিভিন্ন রবীন্দ্রসংগীত শুনে বাড়িতে এসে বাজানোর চেষ্টা করতাম। ছোটো থেকে খেলাচ্ছলেই বাজাতাম।” হয়তো মাঠ থেকে ফুটবল খেলে ফিরেছেন, পোশাক বদলেই বসে যেতেন এস্রাজ নিয়ে, যেন খেলা তখনও চলছে। এই স্পিরিটটাই রণধীর রায়।

গুরু অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় হয়তো কৌতুক করেই রণধীরকে বলতেন, সেতার বা সরোদের মত এস্রাজ দেখতে সুন্দর নয়, তাই লোকে এস্রাজ শুনতে ভালোবাসে না। আবার স্বয়ম্ভর একক যন্ত্র হিসাবে এস্রাজের সীমাবদ্ধতার কথা বলতেন সে সময়ের সমালোচকদের এক অংশ। রণধীর রায়কে সেই সময় থেকেই এই কথাগুলি ভাবিয়েছিলো। সদা হাস্যময় শান্ত রূপের এই সংগীতময় মানুষটি তাঁর সংগীত-যাপনের (১৯৫১ থেকে ১৯৬৬ অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কাছে, ১৯৬৬-৬৯ কেন্দ্রীয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্রথমে বিষ্ণুগোবিন্দ যোগ, তারপরে ধ্রুবতারা যোশীর কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন। ১৯৭৫ সালে বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে এস্রাজের শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন) মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এই যন্ত্রের অনন্ত সম্ভাবনার দিক। এস্রাজকে একক পূর্ণতায় প্রতিষ্ঠা দেবার তীব্র অভীপ্সা কাজ করত তাঁর মধ্যে। তাই প্রচলিত যন্ত্রটির গঠনের সীমাবদ্ধতাকে আবিষ্কার, একই সঙ্গে ধ্বনি ও বাজ নিয়ে গবেষণামূলক পরীক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করা, রণধীর রায়ের হাত ধরেই এস্রাজ উচ্চাঙ্গসংগীতের অধিবেশনে অনুষঙ্গ-যন্ত্রের পরম্পরা থেকে সেতার, সরোদ ও সুরবাহারের পাশে একক যন্ত্র হিসেবে ভিন্ন মর্যাদায় আসন পেলো। গায়কী ও গৎকারী ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রচলিত এই দুই অঙ্গের নানা দুরূহ রূপের প্রকাশ সম্ভব হলো রণধীরের এস্রাজে। অর্থাৎ সংগীতের যে বিরাট ক্ষেত্র তার সবটাই ধরা দিল এস্রাজে। কোন বিফলতার দিক আর রইলো না। তিনি মনে করতেন একক বাদন আর সহযোগিতা দুটি ভিন্ন ধারার কাজ। তাই তার বাদন শৈলীও আলাদা। সম্ভবত এই দুটি ধারাকেই তার স্বতন্ত্র মর্যাদা দিতে পেরেছিলেন একমাত্র তাঁর গুরু অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়।

অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কাছে, ১৯৬৬-৬৯ কেন্দ্রীয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্রথমে বিষ্ণুগোবিন্দ যোগ, তারপরে ধ্রুবতারা যোশীর কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন। ১৯৭৫ সালে বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে এস্রাজের শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন।

বর্তমানে যারা এস্রাজ যন্ত্রে দেশে-বিদেশে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশন করেন, তাঁরা সকলেই রণধীরের পরিকল্পিত যন্ত্রটি ব্যবহার করেন। তাই এস্রাজ-যন্ত্র ও যন্ত্রীর আত্মপরিচয়ের অহংকার এখন রণধীর রায়।

নতুন গৎ, বন্দিশ ও নতুন রাগ রচনার প্রতি তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিলো। যেমন, তিলক-কল্যাণ, সিন্ধু-গান্ধার, মাজ-ইমন, ভূপ-ভাটিয়ার ও মধু-পলাশ ইত্যাদি রাগগুলি তাঁর নিজস্ব কল্পনা। সংগীতের পাশাপাশি রিমোট কন্ট্রোলে গাড়ি চালানো, বিভিন্ন মডেলের এরোপ্লেন নিজে হাতে তৈরি করা, নানা ধরনের ঘুড়ি ওড়ানো ছিল তাঁর সখ। এছাড়া মাউথ অর্গ্যান, পিয়ানো, অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতেন। আবার হ-য-ব-র-ল’র উদো, অচলায়তনের মহাপঞ্চক, শারোদৎসবে লক্ষেশ্বর ও কালমৃগয়ায় বিদূষকের চরিত্রে নিজে গান গেয়ে অভিনয় করেছেন। একধরনের যন্ত্রের সঙ্গে অন্যধরনের যন্ত্রের সামঞ্জস্য ঠিক কোথায়, কতখানি, যন্ত্রসংগীত ও কণ্ঠসংগীতের সম্পর্ক বা প্রভেদ, কবিতার সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক, শিল্পের চর্চায় এই নিবিষ্টতা নিয়ে সদা মগ্ন থেকেছেন রণধীর। এই মগ্নতা, শিল্পের মগ্নতা। যে মগ্নতা শিল্পীকে করে বড়ো অনেক অনেক বড়ো, যে বড়ো অন্তহীন। প্রচলিত রীতি অনুসারে নিজের নামের আগে পণ্ডিত বা অন্য কোন উপাধি ব্যবহারে তাঁর ছিলো প্রবল অনীহা।

 

তথ্যচিত্র ‘এস্রাজের রণধীর’

বিষ্ণুপুর সংগীত ঘরানার শিল্পী অশেষচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় তাঁর এই শিষ্যকে কোনোদিন বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী বানাতে চাননি। রণধীর নিজেকে শান্তিনিকেতন ঘরানার এস্রাজ শিল্পী বলে মনে করতেন। শান্তিনিকেতনে সকলের কাছে তিনি ‘টুকু দা’। সাংগীতিকদের বিচারে এখনও পর্যন্ত এই ঘরানার সর্বশ্রেষ্ঠশিল্পী রণধীর রায়। যিনি বেশ জোর দিয়ে বলতেন ‘মিউজিক ইজ মিউজিক’।

____________________ 

তথ্যসূত্র : 
অরিন্দম সাহা সরদারের সাক্ষীচিত্র এস্রাজের রণধীর

Developed by DXDasia