পশ্চিমবাংলার লোকশিল্পী সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী হল পটুয়া- পেশা দেব-দেবীর মাহাত্ম্য চিত্র অঙ্কন
পশ্চিমবাংলার লোকশিল্পী সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী হল পটুয়ারা। পেশা হল দেব-দেবীর মাহাত্ম্য চিত্র অঙ্কন। আচার ও রীতিতে এঁরা মুসলমান। ওঁদের ভাষায় আমরা 'হিঁদুর গীত করি আর মোছলমানের রীত করি'। রাজার আদেশে ধর্ম বা সমাজ চ্যুত নাকি বিশ্বকর্মার ছয় অভিশপ্ত পুত্রদের একজন হয়ে অভিশাপের বহন, সেটা বিষয় নয়। আজকের দিনে এই বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে এমন ভাবে যেখানে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বোধের এক চলমান জীবন্ত ও রক্ত মাংসের উদাহরণ হল এই পটুয়া চিত্রকর সমাজ। যাঁদের প্রধান বসতি মেদিনীপুর জেলার নয়া গ্রামে। বিয়ের অনুষ্ঠানে মৌলবি এসে ইসলাম মতে কলমা পড়িয়ে যান আবার একই সাথে হিন্দু রীতি মতে গায়ে হলুদ হয়। এমন মিলন মেলার বাহন হল পটুয়া।
এই পটুয়া সম্প্রদায়ের একজন প্রবীন ও প্রাচীন চিত্রকর হলেন নয়া গ্রামের দুখুশ্যাম চিত্রকর। একটা সময় গ্রামে গঞ্জে গান সহযোগে পট দেখিয়ে বেড়াতেন, আজ আর সে সব হয় না ঠিকই কিন্তু আজও মেলা পার্বণের জন্য নিয়মিত পট আঁকেন আর পটের গান রচনা করেন। সেই সঙ্গে নতুন সময়ের নবীন পটুয়াদের তৈরি করেন গান শিখিয়ে ও পট আঁকা শিখিয়ে। কাগজের ওপর খসড়া বা দেহ রেখা কী ভাবে টানতে হয়, নাটকের দৃশ্যের মত কী ভাবে কাহিনীকে বদলে বদলে ও পাল্টে দিয়ে সাজাতে হয় এ সব শেখাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন এই প্রবীণ পটুয়া। তাঁর আঁকা পটে আমরা প্রত্যক্ষ করি পুরুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বীরচিত ভাব আর নারী দেহের লালিত্য। বর্তমানে নিজের পটের শৈলীতে আপন মনের মাধুরী দিয়ে মিশিয়ে দেন কালীঘাট পটের গোলগাল চরিত্রকে।
তাঁর করা জড়ানো পটের মধ্যে পূরাণ, ভাগবত, চন্ডীমঙ্গল যেমন আছে তেমনই আছে অনেক সামাজিক কাহিনী। সম্প্রতি নেতাজী সুভাষ ও রবীন্দ্রনাথের জীবন আলেখ্য নিয়ে দুটি পট এঁকেছেন। তাঁর সঙ্গে বেঁধেছেন দুটি গান। জনপ্রিয় পালা গানের সুরকে চয়ন করেছেন পট দুটির জন্য। নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবনকে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন দুখুশ্যাম। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ প্রাধান্য পেয়েছে দুখুশ্যামের এই পট দুটিতে। লম্বা জড়ানো পটে দুখুশ্যাম-এর স্বরচিত এই কাহিনী বেশ মনোরম।
এই দুখুশ্যাম চিত্রকর পঞ্চাশ ষাটের দশকের রাজনৈতিক গান বেঁধে বিখ্যাত হয়েছিলেন। অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন কে তীব্র ব্যঙ্গ করে বেঁধেছিলেন ‘কংগ্রেস বিপ্লবী’ পট। আর সভা সমিতি হলে সেই সব গান মঞ্চে গেয়েও বেড়াতেন। তারপর থেকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দুখুশ্যামের। বর্তমানে নয়া গ্রামের প্রবীন এই শিল্পীর কাছ থেকে জানা যায় গাছ-গাছালি ও মাটি থেকে পটের রং তৈরির প্রাচীন নিয়ম।
দুখু জানায় ছাগলের ঘাড়ের লোম বা কাঠবেড়ালির লোম বাঁশের কঞ্চির ডগায় বেঁধে এককালে তৈরি করা হত তুলি। আর রং পাওয়া যেতো প্রকৃতি থেকে। লাল মেলে সিন্দুর, আলতা আর হিঙ্গুল পাথর থেকে। হালকা লাল পাওয়া যায় পুঁইয়ের বিচি থেকে। হলুদ পাওয়া যায় কাঁচা হলুদের মূল থেকে রস নিয়ে। হরিতাল পাথরেও হলুদ পাওয়া যায়। দুখু বলেন সিমের পাতার রস থেকে সবুজ মেলে। কালো পাওয়া যায় উনুনে পোড়া হাড়ির তলার ভূষো থেকে। চাল পুড়িয়েও কালো পাওয়া যায়। সাদা আসে শঙ্খ আর খড়িমাটি থেকে। আর সেই রং যাতে আটকে থাকে কাগজে বা কাপড়ে তাই বাবলা গাছের রস থেকে আঠা তৈরি করা হয়। এমনই সব প্রাচীন পদ্ধতি জানার সুযোগ হয় দুখুশ্যাম পটুয়ার কাছ থেকে। বয়স আঁশি ছুঁই ছুঁই কিন্তু প্রাণবন্ত এক চিত্র পুরুষ।
ভিডিও ফোটোগ্রাফার-বিষ্ণু মুখার্জি