দুর্ঘটনাগ্রস্ত অভিষেক-কে নিয়ে তথ্যচিত্র বানালেন তাঁরই চিকিৎসক সুপর্ণ গাঙ্গুলি

অকেজো পা নিয়েই স্বপ্নের দৌড়, ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন অভিষেক স্বামী

“Success is not achieved by winning all the time. The real success comes when we rise after we fall.” – Muhammad Ali

সাড়ে পাঁচ মিনিটের তথ্যচিত্রটি শুরু হচ্ছে কয়েকটি স্থিরচিত্রের কোলাজ দিয়ে। একজন যুবকের শিশুবয়সের ছবি, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ ছবি। তারপর হঠাৎ যেন আয়না ভেঙে যায়। পরের ফ্রেমে অ্যাম্বুলেন্সে শায়িত একজন আহত মানুষ, ডাক্তার-নার্সদের ছুটোছুটি। হুইলচেয়ারে বসা সেই যুবক। যুবকটির নাম অভিষেক স্বামী (Abhishek Swami)। স্বল্প দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্রটি তাঁকে নিয়েই। নাম – This is Not the End। তৈরি করেছেন তাঁরই চিকিৎসক ডঃ সুপর্ণ গঙ্গোপাধ্যায় (Dr. Suparna Gangopadhyay)। পুরো তথ্যচিত্র জুড়ে অভিষেকের জীবনে হঠাৎ নেমে আসা অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলা আছে। এই তথ্যচিত্রটিই এবার মনোনীত হয়েছে তুরি চলচ্চিত্র উৎসবে (Turi Film Festival)। প্রতিযোগিতার হেলথ অ্যান্ড কেয়ার বিভাগে।

একটু বোধহয় ভুল বলা হল। বা পুরোটাই। অ্যাক্সিডেন্ট তো এক-দুটো ফ্রেমে সীমাবদ্ধ। তারপর? তারপর লড়াই। জেদ, সাহস, চেষ্টা। আলোর দিকে যাওয়া, আলো খুঁজে পাওয়া। তথ্যচিত্রের শেষদিকে অভিষেক বলেন, “After this accident, things might have changed a bit. Plans though I’d say, is still the same”। পিছনে আত্মবিশ্বাসী গলায় এই ভয়েসওভার, আর ফ্রেমজুড়ে তখন তাঁর লড়াইয়ের দৃশ্যপট- বিভিন্ন রকমের ব্যায়াম, সাপোর্ট নিয়ে হাঁটা। এত বড়ো অ্যাক্সিডেন্টের পরেও এতটা আত্মবিশ্বাস পান কীভাবে? জানতে চাওয়ায় অভিষেক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এটা মনের ভিতর থেকে এসেছে। মা-বাবা, আত্মীয়-বন্ধুদের দেওয়া সাহস থেকেও এসেছে। আমার মা-বাবা আমার সামনে একবারও কাঁদেননি আজ পর্যন্ত। বরং আমাকে সাহস জুগিয়ে যান রোজ। আর আমার চিকিৎসক ডঃ সুপর্ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর টিম যে ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটা থেকে অনেক সাহস পেয়েছি।” নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলেন অভিষেক। তাঁর মেরুদণ্ড আর মস্তিষ্ক চোটগ্রস্ত হয়েছিল। চোট লাগে তাঁর মেরুদণ্ডের মিড-থোরাসিক লেভেলে, অর্থাৎ পিঠে। তাঁর শরীরের নিচের অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। দশ কিলোমিটার ম্যারাথনে নিয়মিত অংশ নেওয়া যুবকের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে হুইলচেয়ার। কিন্তু জীবনের প্রতি তাঁর প্যাশন কমেনি এক ফোঁটাও। তাঁর চিকিৎসক সুপর্ণ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “একজন যুবক, যে ম্যারাথনে নিয়মিত অংশ নেয়, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে, বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে, এমন একটা দুর্ঘটনা তাকে মানসিক ভাবে শেষ করে দিতে পারে। তার উপর তখন কোভিডের সময় ছিল। হাসপাতালে থাকতে থাকতেই অভিষেকের দুবার কোভিড হয়। কিন্তু ওর মধ্যে একটা আশ্চর্য জেদ, মানসিক জোর দেখেছিলাম।”

ইন্সটিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতা (Institiute of Neurosciences Kolkata)-র চিকিৎসক সুপর্ণবাবু যোগ করলেন, “এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে কয়েকটা নির্দিষ্ট মানসিক পর্যায় আসে। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে DABDA (Denial, Anger, Bargaining, Depression, Acceptance)। অভিষেকের ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়টা বেশ তাড়াতাড়ি এসেছিল। আর শেষ পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল M, অর্থাৎ Moving Forward”। আর অভিষেকের কথায়, “আমার চিকিৎসক আমাকে বোঝাতে পেরেছিলেন, জীবনে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব। বোঝাতে পেরেছিলেন, এই অবস্থা থেকেও উঠে দাঁড়ানো যায়।”

সম্পূর্ণ তথ্যচিত্র

 

কিন্তু হঠাৎ কেন এই তথ্যচিত্রের ভাবনা? এই ভাবনা একেবারেই নতুন নয়, তেমনই জানালেন সুপর্ণবাবু। তাঁরা এই ধরনের রোগীদের রিহ্যালিবিটিশনের ভিডিও আপলোড করেন ইউটিউবে। লক্ষ্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। “রিহ্যাব মানে কিন্তু শুধু কিছু ম্যাসাজ করা বা ব্যায়াম দেখিয়ে দেওয়া নয়। মানসিক ভাবে তাঁদের পাশে থাকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। যে কাজ সবাই খুব সহজেই করতে পারেন, বা যেসব কাজের দক্ষতা মানুষের সহজাত, এই ধরনের রোগীদের সেসব কাজ নতুন করে শিখতে হয়। যেমন- নিজের হাতে জলের বোতলের ঢাকনা খোলা, বিছানায় একপাশ থেকে অন্যপাশে ফেরা ইত্যাদি। কতটা মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাঁদের, তাঁদের পরিজনকে, আন্দাজ করাও দুঃসাধ্য। আমরা একটা বড়ো প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলাম, যেখানে এই পুরো লড়াইটাকে নিয়ে একটা বার্তা দিতে পারি। তুরি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বিষয়ে জানার পরেই আমরা তথ্যচিত্রটি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিই।” এমন তো আরও রোগী আছেন। অভিষেককেই বেছে নেওয়ার কারণ কী? ডঃ গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন, অভিষেকের আত্মবিশ্বাস, জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ, অভিষেককেই এই বিষয়ের জন্য বেছে নিতে প্রেরিত করেছে। সুপর্ণবাবু নিজেই এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন।

কিন্তু হঠাৎ কেন এই তথ্যচিত্রের ভাবনা? এই ভাবনা একেবারেই নতুন নয়, তেমনই জানালেন সুপর্ণবাবু। তাঁরা এই ধরনের রোগীদের রিহ্যালিবিটিশনের ভিডিও আপলোড করেন ইউটিউবে। লক্ষ্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। “রিহ্যাব মানে কিন্তু শুধু কিছু ম্যাসাজ করা বা ব্যায়াম দেখিয়ে দেওয়া নয়। মানসিক ভাবে তাঁদের পাশে থাকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন পেশাদার পরিচালককে দিয়ে পরিচালনা করালে তথ্যচিত্রটি পেশাদারিত্বের দিক থেকে আরও অন্য মাত্রা পেত না কী? “তা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমি, আমার মেডিক্যাল টিম, অভিষেক, ওঁর পরিবার যে মানসিক যুদ্ধ করে এসেছে, এখনও করছে, তা কি অন্য একজন ঠিক সেভাবেই বুঝতে পারতেন? সে প্রশ্ন রয়েই যায়। আর এই ফেস্টিভ্যালটি মূলত অ্যাস্পায়ারিং পরিচালকদের জন্য। আগেই বললাম, এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কথা শোনার পরেই আমরা তথ্যচিত্রটি করার কথা ভাবি। তাই আমিই পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমি ছাড়া এই তথ্যচিত্রের সঙ্গে যুক্ত বাকি টেকনিশিয়ানরা কিন্তু সবাই পেশাদার”, বলেন তিনি। প্রসঙ্গত, তুরি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জুরিবোর্ড-এ রয়েছেন জয়ন্ত কৃপালানী (Jayant Kripalani), জাপানের পরিচালক এবং কন্টেন্ট প্রোডিউসার তাকেউচি রিন্তারোউ (Takeuchi Rintarou), পরিচালক অরিন্দম শীল (Arindam Sil) প্রমুখ। এই ফেস্টিভ্যালে প্রতিযোগিতার জন্য ছবি জমা পড়েছে ইউকে, বাংলাদেশ, নেপাল-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এর মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে ছড়িয়ে যাবে এই লড়াইয়ের কাহিনি, উদ্বুদ্ধ করবে অনেককে, আশাবাদী অভিষেক ও সুপর্ণ দুজনেই।

অভিষেকরা জিততে চান, অভিষেকরা জিতেও যান। তাই এই যুবক আবার গাড়ি চালাতে শিখে নিয়েছেন নতুন করে। হুইলচেয়ার ম্যারাথন (Wheel Chair Marathon)-এ অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি জানান, “আমি তো ভালো চিকিৎসা পেয়েছি। অনেকে তো সেটুকুও পান না। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তাঁদের বার্তা দিতে চাই, অন্ধকার যতই থাকুক, লড়াই চালিয়ে গেলে আলো ফুটবেই”। আরও আলো ফুটুক অভিষেকের জীবনে, অভিষেকদের জীবনে। তথ্যচিত্রের শেষ দৃশ্যের মতনই দু-হাত ছড়িয়ে আবার দৌড়ে যান অভিষেক। হুইলচেয়ারে নয়, নিজের পায়ে। আর সুপর্ণবাবুর মতো চিকিৎসকরা তাঁদের রোগীদের এভাবেই ফিরিয়ে আনতে থাকুন জীবনের দিকে, আর সেই গল্প ছড়িয়ে দিতে থাকুন সমাজে। ফোনালাপের শেষভাগে তিনি যেভাবে জানালেন, “এই ধরনের কাজ আমি ভবিষ্যতে আরও করবো, মানুষকে সচেতন করার জন্য। This is not the end, this is just the beginning”, সেইভাবেই। 

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে: ডঃ সুপর্ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অভিষেক স্বামী 

Post Tags
Developed by DXDasia