
আজ কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রের জন্মবার্ষিকী
‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গেয়ে তখন তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন অনেক। বিদগ্ধ-মহলে ‘কৃষ্ণকলি’ মানেই তখন তাঁর নাম। তাঁর কণ্ঠ ছাড়া এই গান অন্য কারো গলায় শুনতে তখন অনেকেই ইতস্তত করেন। একেকটা গান যেমন একেকজনের গলায় সেতার-শিল্পীর আঙুলের কড়ার মতন বসে যায়, এই গান যেন তাঁর কণ্ঠেও তেমনই। সমগ্র রবীন্দ্রসংগীত-প্রেমীদের কাছে এই কণ্ঠের দৃপ্তি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবার পর সংগীতের আরেক জাদুকর সলিল চৌধুরী তাঁর কাছে এলেন তাঁর আরেক অনবদ্য সৃষ্টি নিয়ে। ময়নাপাড়ার কৃষ্ণকলিকে তিনি দেশভাগের পরিস্থিতির মাঝে নিয়ে এসে লিখেছেন ‘সেই মেয়ে’। ইচ্ছে, গাইবেন যিনি রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলিতে এত সুন্দর করে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছেন সেই সুচিত্রা মিত্রই। তিনি গাইলেনও। ১৯৫০ সালে সেই গানের রেকর্ড বেরলো। সমান জনপ্রিয়তায় পৌঁছালো এই গানও। কিন্তু এবারে আর শুধু জনপ্রিয়তাই নয়, জুটল লাঞ্ছনাও। তৎকালীন ‘রবীন্দ্রভক্ত’দের দল, এই গানকে গ্রহণ তো করলেনই না, উলটে এই নিয়ে চলল তুমুল অশান্তি। কেন সুচিত্রা মিত্রের মতন একজন শিল্পী দাগী এক কমিউনিস্টের পাল্লায় পড়ে কৃষ্ণকলির প্যারোডি গাইবেন এই প্রশ্নবাণের সঙ্গে সঙ্গে সুচিত্রার সামনে তাঁর নতুন গান 'সেই মেয়ে'র রেকর্ড-ডিস্কও ভেঙে ফেলা হল।
এই অপমানের সামনে অন্য কেউ হলে কী করতেন জানা নেই, কিন্তু সুচিত্রা মিত্রের দৃঢ়তা সেখানেও দেখবার মতন। চিরকালীন এই দৃঢ়তাই তাঁর মেরুদণ্ড সোজা রেখেছে।
ট্রেনে জন্ম হয়েছিল বলে বলতেন, 'সবসময়ই চলছি। পথ চলাতেই আমার আনন্দ'। সকলেই তাঁকে চেনেন গেছো মেয়ে বলেই। কি কলকাতায়, কি শান্তিনিকেতনে, শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে সব অসাধ্যই তিনি সাধন করতে পারতেন। ছুটে চলাই যেন তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। অথচ এই 'অ-লক্ষ্মী' মেয়েই গান গাইতে বসতেন গলায় সরস্বতীকে আসন পেতে বসিয়ে রেখে। বড়ো হয়ে সংসারও করেছেন নিপুণভাবে। একবার দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনো এক অনুষ্ঠানে দেখা, ক্লান্ত সুচিত্রাকে দেখা মাত্রই দ্বিজেনবাবু প্রশ্ন করেন, 'তোমার কি শরীর খারাপ?’ তার উত্তর আসে এরকম: ''দ্বিজেন, এমন শরীর খারাপ আমার রোজই থাকে, কারণ আমি রান্না করে, বাসন মেজে৷ ঘর গুছিয়ে তবে গান গাইতে আসি। তোমাদের মতো ফুলবাবুর জীবন আমার নয়।'' ফুলবাবুর জীবন সত্যিই তাঁর নয়। সংসার সামলেছেন, সামলেছেন নিজের ব্যস্ততম সাংগীতিক জীবন, আবার বামপন্থায় আকৃষ্ট হয়ে গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়েছেন, মিছিলেও বেরিয়েছেন তিনি। অথচ এত ব্যস্ততার মধ্যেও আশ্চর্যজনক ভাবে, রবীন্দ্রনাথের গান, সুর নিয়ে কি অদ্ভুত তাঁর জ্ঞান, পড়াশুনো। পরের দিকে যখন রবিতীর্থে গান শেখাচ্ছেন, একদিন ক্লাস চলাকালীন বোর্ডে স্বরলিপি লেখবার প্রয়োজনে একজন ছাত্রকে চক নিয়ে আসতে বলেন, সেই ছাত্র স্বাভাবিক ছন্দে চকের সঙ্গে ডাস্টারটিও এনে দিলে দেখামাত্রই রাগ করে বলেছিলেন, 'আমার ডাস্টার লাগে না।' সেই ছাত্রের কথায়, 'আমি তখন ভাবছি, এ তো একটা গান, প্রতিটি গানের স্বরলিপি লেখবার ক্ষেত্রে 'ডাস্টার লাগেনা'র মতন কথা বলার জন্য কতখানি সাহস আর জ্ঞান লাগে!’
সাহস তাঁর সত্যিই ছিল। সততাও ছিল। ছক-ভাঙা হয়ে জীবনকে অন্যরকম ভাবে দেখতে চেয়েছিলেন। একটা সময়ের পর স্বামী ধ্রুবর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় নানান কারণে। তবুও, বিচ্ছেদই শেষ নয় তা প্রমাণ করেছেন তিনি। সম্পর্কের সুতো ছেঁড়েনি। দম্পতির পরিচয় মুছে যাবার পর সকলের কাছে পরিচয় করিয়েছেন বন্ধু বলে। প্রাক্তন স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেকে ফোন করে বলেছিলেন, ''আজ আমার বন্ধু চলে গেল। জগতে আমার আর কোনো বন্ধু রইল না।'' যে সম্মান প্রাক্তন প্রেমিক বা স্বামীর প্রতি তিনি দেখিয়েছেন তা আলাদা করে প্রতিটি মানুষের শিক্ষনীয় নয় কি?
শিক্ষনীয় আসলে অনেক কিছুই। সেইসময় চাইলে সংগীতশিল্পী সুচিত্রার গানের পাঠ রবিতীর্থে গেলেই হয়তো পড়া যেত, কিন্তু মানবী-সুচিত্রার কাছে জীবনের পাঠ কোন ইস্কুলে হত, জানা নেই। থাকলে তাঁর দৃঢ়তা, ঋজুতা, দায়িত্ববোধ, স্বধর্ম পালনে একাগ্রতা, ধৈর্য, ব্যথাকে হাসিমুখে সহ্য করবার ক্ষমতা এই সমস্ত কিছুর পাঠ হয়তো নেওয়া যেতে পারত। তাঁর জীবনময় কত জটিলতা, কাঁটা, তবুও জীবন ছিল সহজ, ফুলের মত। কলকাতার সুচিত্রার স্মার্টনেস, যা দেখে শান্তিনিকেতনের মোহর বারবার অবাক হয়ে যেত, সেই স্মার্টনেসকে অনায়াসে কোঁচড়ে বেঁধে ধুলোমাটির দেশের বুনোফুল হয়ে যেতে পারতেন সহজ সুচিত্রা। খোলা গলায় গেয়ে উঠতেন, 'জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে…'।
আরও পড়ুন: নবনীতার আদরের গজুদিদি
শেখাবার সময় বলতেন, 'জীবন মরণের বলে থামবে না।' জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে সম্পূর্ণটা একসাথে বলে তবে দম নিতে বলতেন৷ বলতেন, পিঠ সোজা রেখে বসতে। নিজেও তাই করতেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েও তার অন্যথা হয়নি। ৩ জানুয়ারি, রবীন্দ্রগানের অর্থ আর দর্শন নিয়ে সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকা, ভুল দেখলেই বকে-ঝকে শুধরে দেওয়া এই সহজ মেয়েটির চিরতরের চোখ বোজবার দিন। যে দূরন্ত ঝরনার প্রাণশক্তি নিভে গিয়েছিল কালের নিয়মে, সেই প্রাণ যাবার আগে নিশ্চয় পরিহাস করে গেয়ে গিয়েছিলেন সেই গান, যে গান তাঁর কণ্ঠে জীবনদেবতাকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলে যায়, 'আরো আরো প্রভু আরো আরো, এমনি করে আমায় মারো…’।
