শিল্পী রেবা হোরের জন্মশতবর্ষে দেবভাষার প্রদর্শনী
৭০/২ সেলিমপুর রোডের দেবভাষা বাড়িতে শুরু হয়েছে শিল্পী রেবা হোরের শতবর্ষ-উদযাপন উপলক্ষ্যে একটি প্রদর্শনী; যা বর্তমান অস্থির সময়ে, শিল্পীর কাজের মারফৎ একটা সময়কে ফিরে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। রেবা হোরের কাজ যাঁরা দেখেছেন তাঁরা এই প্রদর্শনীতে এসে আবার বিস্মিত হবেন। আর যাঁরা আগে দেখেননি, তাঁরা কিছু সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন এটুকু বলতে পারি। তবে রেবা হোরকে শুধুমাত্র দেখে ফিরে আসার সময় নয় এটা। (রেবা হোরের শতবর্ষ)

রেবা হোরের ছবি জীবন থেকে তুলে আনা খণ্ড চিত্র। কোথাও অতীতের স্মৃতি, কোথাও সেসময়ের অস্থিরতা, ক্ষয়। ওঁর চারপাশের মানুষের অন্তর্জগতকেই কাগজে ক্যানভাসে মূর্ত করেছেন, কিন্তু ন্যাচারালিস্টিক কায়দা থেকে খানিকটা সরে এসে।
একটা দীর্ঘ সময় ধরে যাঁদের কাজ আমরা দেখছি, সে ভাষা আমরা অনেকটা জানি। তাই আমাদের খুঁজে দেখতে হবে নতুন কী পাওয়া যায়। দরকার হলে একটা সময়ের পিঠে আরেকটা সময়কে চাপিয়ে দেখতে হবে। রেবা হোরকে পড়তে গেলে আজকের সময়ের মতন করে পড়বো। খুঁজে দেখবো ওতে আজকের জীবনের সমস্যার কথা রয়েছে, নাকি শুধুই সৌন্দর্য দর্শনেই ফুরিয়ে গিয়েছে। প্রথমে ওঁর ছবিতে দেখেছি ফর্ম, বলিষ্ঠ লাইন, অসংখ্য আঁচড়, ফিগারেটিভ কম্পোজিশন। এসব তো সবাই দেখতে পাচ্ছেন, আশ্চর্য হচ্ছেন বারবার। কিন্তু এর আড়ালে যে কথা রয়েছে সেসব খুঁজবো। হয়তো সাবজেক্টিভ দৃষ্টিতেই। আসলে শিল্পীর সংবেদনাই শিল্পকে উন্নীত করে। তাই চল্লিশ বছর পরেও সেসব ছবি হাতড়ে দেখতে ইচ্ছে করে। (রেবা হোরের শতবর্ষ)
রেবা হোর সারাজীবনে যা সঞ্চয় করেছিলেন তা যশ, প্রতিপত্তি নয় বরং নিঃসঙ্গ কর্মময়তা। দেবভাষার দেয়াল জুড়ে ওঁর যে সমস্ত কাজ রয়েছে তা মোটে এক শতাংশ। যা দেখলে আমরা শিল্পীর কাজের আংশিক ধারণা পেতে পারি মাত্র। শিল্পের গোড়ার কথাই নিঃশর্ত অনুশীলন। বলা বাহুল্য রেবা হোর সে কাজই করেছেন। ওঁকে সঙ্গ করিনি আমি, তাই যা বলছি সবই ওঁর কাজ দেখে। তবে এ কথা বলতেই হয়, রেবা হোরের জীবনবোধ আর ওঁর শিল্পের দীর্ঘকালীন রূপান্তরের ছায়া এই প্রদর্শনীতে। যেমন শিল্পী হিসেবে ওঁর পরিবর্তন এ প্রদর্শনীতে লক্ষ্য করা যায়, তেমনই মানুষ হিসেবেও ওঁর অভিযোজন দেখার মতন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় ওঁর ছবির খুবসুরতি বদলে, আরও ‘স্কেচি’ আরও অস্থির হয়েছে। সমাজের মানুষ ক্রমে একা হয়েছে, ফলে ছবির মানুষও নিঃসঙ্গ হয়েছে। শিল্পী নিজে আরও একা হয়েছেন কিনা আমার বলার কথা নয়। ‘সকলে প্রত্যেকে একা’ শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই কবে লিখেছিলেন, শিল্পীর ক্ষেত্রে সে তো চিরকালীন স্টেটমেন্ট। (রেবা হোরের শতবর্ষ)

এ প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখলে, আশা করি একথা সংবেদনশীল দর্শক বুঝবেন। রেবা হোরের ছবি জীবন থেকে তুলে আনা খণ্ড চিত্র। কোথাও অতীতের স্মৃতি, কোথাও সেসময়ের অস্থিরতা, ক্ষয়। ওঁর চারপাশের মানুষের অন্তর্জগতকেই কাগজে ক্যানভাসে মূর্ত করেছেন, কিন্তু ন্যাচারালিস্টিক কায়দা থেকে খানিকটা সরে এসে। আবার খুব ভালো করে দেখলে বোঝা যায় আকাদেমিক প্রাকটিস ওঁর ছিলই। বেসিক একটা ড্রয়িং করে নিয়ে কোথাও ইঙ্ক-এর ওয়াশ দিয়েছেন, কোথাও জলরঙের কাজ শেষ করে, তার ওপরে প্যাস্টেল এ ড্রয়িং করেছেন। মিডিয়াম এর নিয়ম আর মানেননি পরের দিকে। (রেবা হোরের শতবর্ষ)
ওঁর কাজ তো জীবনের কথাই বলে। আত্মসংঘাত, সামাজিক টানাপোড়েন কাটিয়ে লড়াইয়ের পথ দেখায়। রেবা হোরের প্রাকটিস, আবেগ আর লড়াই— সমান্তরাল পথে চলে, কখনো মিলেমিশে যায় আবার ইউ টার্ন নিয়ে ফিরে আসে ভালোবাসায়। ধীরে ধীরে রেবা হোরের ছবির বিবর্তন ঘটেছে। তার জন্য দায়ী সমাজ আর ওঁর ব্যক্তিজীবন। ওঁর ছবি শরীরকেন্দ্রিক। মানুষের-নামানুষের শরীরী রূপ। রয়েছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া সময়ে, একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়া শরীর ও আকারহীন স্থির মুখ। ভাবের প্রাধান্য চিরকাল দেখা গিয়েছে ওঁর কাজে। কোথাও থেমে থাকেননি। শিল্পীর চেতনা নিরন্তর বিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়ে চলে। কারণ সে কুড়িয়ে নিতে জানে, কিছু ফেলতে পারে না। রেবা হোর নিরন্তর লড়াই ও উত্তরণের পথই নিজের চেতনার রঙে ফুটিয়ে তুলেছেন আজীবন। এখানেই ওঁর কাজ স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে।

রেবা হোরের শতবর্ষে এই প্রদর্শনীতে বেশ কিছু স্কেচবুক আছে। যার প্রতিলিপি সবাই উল্টেপাল্টে দেখতে পারবেন। সে যেন এক অন্য মানুষের কাজ। আগে বলেছিলাম আকাদেমিক প্রাকটিস কখনো ছাড়েননি রেবা হোর। তার প্রমাণ মেলে এই খাতাগুলোয়। গভঃ আর্ট কলেজে শেখা পোর্ট্রেট আঁকার নির্ভুল মাপ দেখা যায় এখানে। পরিণত শিক্ষিত হাতের ড্রয়িং বলে দেয় আর্ট ডাক্তারির থেকে বেশি স্কিলের দাবি রাখে। চর্চাই এই স্কিল ধরে রাখার একমাত্র পথ।
গ্যালারিতে আর আছে বেশ কিছু মিনিয়েচার টেরাকোটার কাজ। সেসব এক্সপ্রেশনে পরিপূর্ণ। সোমনাথ হোরের সঙ্গে থেকে, ওঁর থেকে টেরাকোটা তো আশা করতেই পারি আমরা। সবচেয়ে বিস্ময়কর কিছু নামানুষ বা অ্যানিমালের ছবি। সেখানে সরাসরি সোমনাথ হোরের প্রভাব রয়েছে। তার নমুনা আপনারা দেখতে পাবেন এ প্রদর্শনীতে এলে।

রেবা হোর এমন একজন শিল্পী, যিনি আমাদের দেখার জগৎকে ঘিরে থাকা সেই স্বল্পমেয়াদি নরম সৌন্দর্যকে, যা আমরা তথাকথিত কঠিন বাস্তবতার ব্যস্ততায় উপেক্ষা করে যাই। আকাদেমিক কাঠামোর মধ্যে প্রশিক্ষণ পেলেও, তিনি নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বতন্ত্র শৈলী গড়েছেন। যেমন ১৯৪০-এর দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে পরিচয় ও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান, তাঁর সংবেদনাকে রূপ দিয়েছিল। তাই ওঁর কাজ আন্দোলনমূলক প্রচার বা আদর্শগত অভিব্যক্তিতে জড়িয়ে থাকলেও পৃথক ছিল।
এই প্রদর্শনীতে চার দশক ধরে রেবা হোরের আঁকা চিত্রকর্মগুলির একটা অংশ একত্রিত করা হয়েছে, যা হোরের বাস্তবধর্মী চিত্রকলা থেকে বিমূর্ততার দিকে উত্তরণের পথকে অনেকটা তুলে ধরে।

রেবা হোরের প্রথম জীবনের কাজ আকাদেমিক ভারসাম্য মেনে অনুসন্ধান শুরু করে। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে, কাজগুলোতে দেখা যায়, ওঁর শিল্পভাষা আরও তীব্র হয়ে, রঙের ঘন লেয়ারে স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে। পরের দিকে ওঁর শিল্পচর্চা আরও বেশি আবহধর্মী ও সিম্বলিক হয়ে ওঠে। রং ওঁর কম্পোজিশনকে নিয়ন্ত্রণ করত। তাই ওঁর নিজের চিন্তা মূর্ত এবং বিমূর্ততার মধ্যে এই ক্রমবিকাশমান টানাপোড়েনকে বর্ণনা করে।

আশির দশক থেকে ওঁর শেষ দিকের কাজগুলিতে মাধ্যমগত পরিবর্তনের একটি দৃষ্টান্ত দেখা যায়, যেখানে তিনি তেলরঙ থেকে ক্রেয়ন, প্যাস্টেল, মোম, ইঙ্ক এবং বেশ কিছু টেরাকোটা করেছেন—এই পরিবর্তনগুলি একদিকে যেমন ছিল সময়ের দাবিতে, তেমনই অন্যদিকে ছিল ওঁর নিজের অভিব্যক্তির পরিসরকেও বিস্তৃত করার খিদে। দেবভাষার এই প্রদর্শনীতে শেষদিকের কাজের উদাহরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে মিশ্র-মাধ্যম রচনায় প্যাস্টেলের ব্যবহার ও উপকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি অবিচল সম্পৃক্ততাকে তুলে ধরে। এই প্রদর্শনীতে চার দশক ধরে রেবা হোরের আঁকা চিত্রকর্মগুলির একটা অংশ একত্রিত করা হয়েছে, যা হোরের বাস্তবধর্মী চিত্রকলা থেকে বিমূর্ততার দিকে উত্তরণের পথকে অনেকটা তুলে ধরে। এই কাজগুলি রূপ, রং আর কম্পোজিশনের বুননে বিচ্ছিন্ন আবার সম্পৃক্ত। স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা কীভাবে রেবা হোরকে প্রভাবিত করেছেন, তার প্রতিফলন এই প্রদর্শনী।

যাঁরা আসবেন দেবভাষায়, তাঁদের মনে রাখা দরকার একশো বছরের সময়কে ছুঁতে যাচ্ছেন। কাজেই সময় নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে কাজগুলো দেখুন। নিজের মতন করে পড়ুন। নতুন কিছু খুঁজে পেলে লাফিয়ে উঠে আরেকজনের মতামত জানতে চান। নিংড়ে নিয়ে উপভোগ করুন সবটা।
_________
প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ২৩ মে থেকে, চলবে আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত, ছুটির দিন ও রবিবার বাদে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা।