সন্ধ্যা নামলে চাঁদের আলোয় দেবেন্দ্রনাথকে ব্রহ্মসংগীত শোনাতেন রবীন্দ্রনাথ

দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ— সম্পর্কের আলোছায়া

‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘ছোটোবড়ো’ কবিতায় একটি ছোটো ছেলের কাছে বড়ো হওয়া মানেই ‘বাবার মতো’ বড়ো হওয়ার স্বপ্নকথা! ‘ইচ্ছাপূরণ‘ গল্পেও রবীন্দ্রনাথ ছেলেকে বাবার মতো আর বাবাকে ছেলের মতো করে দেখিয়ে গল্পে আশ্চর্য বিভ্রাট তৈরি করেছিলেন। বাবার মতোন হয়ে ওঠার ইচ্ছাটা হয়তো রবীন্দ্রনাথেরই মনের দেরাজে লুকানো ছিল। মনস্তত্ত্ব ‘ফাদার ফিক্সেশন’ বলে একটি ধারণার কথা বলেন। এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি নারী বা পুরুষকে তাদের অজান্তেই বাবার মতোন করে তোলে। 

দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির কলকাতাবাসী পঞ্চমপুরুষ। জীবনের প্রথম প্রহরে ঘোর পৌত্তলিক ছিলেন তিনি। শালগ্রাম শিলার অর্চনা দেখতেন, দুর্গাপুজোর উৎসবে উৎসাহিত হতেন, প্রতিদিন যখন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরীকে প্রণাম করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করতেন, তখন তাঁর মনে বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বরই শালগ্রাম শিলা, ঈশ্বরই দশভূজা দুর্গা, ঈশ্বরই চতুর্ভূজা সিদ্ধেশ্বরী। কিন্তু সময়ে মর্জি বোঝা ভার। কেই বা জানতো, একদিন তিনি নিজেই রামমোহনের মতো একেশ্বরবাদী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবেন। ১৮৩৮ সালে পিতামহী অলকাদেবীর মৃত্যু এবং ঈশোপনিষদের তাৎপর্যপূর্ণ একটি শ্লোক সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের মন। অপৌত্তলিক রীতিতে পিতৃশ্রাদ্ধ করে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তার অভিঘাতে একরকমভাবে সমাজের পৌত্তলিক জ্ঞাতিরা তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন। সৌদামিনীদেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যখন পাঁচ ছয় বছর বয়স, তখন তিনি বাড়ির শালগ্রাম শিলা নিয়ে খেলতে বসেছিলেন। সে যাত্রা শান্তিস্বস্তয়ন করে ঠাকুর পরিবার তাঁদের পৌত্তলিক জীবনচর্যাকে রক্ষা করেন। কিন্তু পরিণত দেবেন্দ্রনাথের এই ধর্মবিদ্রোহে ঠাকুরবাড়ির তথাকথিত পৌত্তলিক দেবসংস্কার ছত্রখান হয়ে যায়। ঠিক এই ভাবনাবদলের সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। তাঁর অন্নপ্রাশনের দিন রবীন্দ্রনাথের নামের চারিদিকে সারি সারি মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সৌদামিনীদেবী স্মৃতিচারণে দেবেন্দ্রনাথের এই ইচ্ছের কথা জানিয়ে  বলেন, ‘—রবির নামের উপর সেই মহাত্মার আশীর্বাদ এইরূপেই ব্যক্ত হইয়াছিল।’ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথের কাছে বাবা ছিলেন দূরের মানুষ। দেশভ্রমণ থেকে বাড়ি ফিরলে ছোট্ট রবির খুব ইচ্ছে হতো, তাঁর সঙ্গে ভাব করে নিতে। কিন্তু সে সৌভাগ্য সহসা হত না। মায়ের হয়ে বাবাকে প্রথম চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাশিয়ানরা ভারত আক্রমণ করতে পারে — এই ছিল চিঠির বিষয়। চিঠির উত্তরটি ছিল আরও আকর্ষক। দেবেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, রাশিয়ানদের তিনি তাড়িয়ে দেবেন। এই লোমহর্ষক উত্তর পাওয়ার পর বাবাকে রোজ চিঠি লিখতেন রবীন্দ্রনাথ। ভাবতেন, চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে বাবার কাছে। চিঠি পৌঁছতো না ঠিকই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন ইচ্ছেতরঙ্গ হয়ে নিশ্চয়ই ছুঁয়ে গিয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের মন। সেই কারণেই বাবার তরফ থেকে এল হিমালয় যাত্রার প্রস্তাব। এই প্রসঙ্গে পরে ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখবেন রবীন্দ্রনাথ— ‘চাই এই কথাটা যদি চীৎকার করিয়া আকাশ ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম, তবে মনের ভাবের উপযুক্ত উত্তর হইত।’

এরপর এক রূপকথার জন্ম হয়েছিল। ঘুমের গভীর থেকে দেবেন্দ্রনাথের ডাকে জেগে উঠে পড়তে বসতেন রবীন্দ্রনাথ। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে উপনিষদের মন্ত্রপাঠ শুনতেন। যখন সন্ধ্যা নেমে আসত, আকাশে চাঁদ উঠত, গাছের ছায়ার ভিতর দিয়ে বারান্দায় এসে পড়ত জ্যোৎস্নার মৃদু আলো— তখন রবীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথকে ব্রহ্মসংগীত শোনাতেন। বাবার লাল শাল পরা মোমবাতির সেজ হাতে উপাসনারত ছবি রবীন্দ্রনাথকে একরকমভাবে সম্মোহিতই করেছিল । দেবেন্দ্রনাথের অপার পাণ্ডিত্য রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছে। বাবাকে অনুসরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, অতিক্রম করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ বাবার বাধ্য ছেলে। শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনার সময় প্রত্যেক মাসের দ্বিতীয় দিনে খাতাপত্র নিয়ে দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতেন। চিঠিতে বাবা ছেলেকে লিখতেন, ‘প্রাণাধিক রবি!’ রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি ইচ্ছেকে সমর্থন করেছেন দেবেন্দ্রনাথ। মনের বেদনার কথাও ভাগ করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। দেবেন্দ্রনাথের প্রেরণাতেই রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকেই যেন নিজের দার্শনিক মনের উত্তরাধিকার দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের কাছেও বাবা ছিলেন পরম শ্রদ্ধার!

প্রমথনাথ বিশী ‘রবীন্দ্রকাব্য প্রকৃতি ও জীবনসাধনার উপরে দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধে অনুমান করেছিলেন, দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চোখে রাজর্ষি, গোবিন্দমাণিক্য চরিত্রে তাঁরই ছায়া। ‘গোরা’ উপন্যাসের পরেশবাবুর মধ্যেও দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘পিতৃদেব’ অধ্যায়ে বাবার কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মহর্ষির মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়ে যে প্রবন্ধগুলি লিখেছিলেন, সেগুলি পরে ‘চারিত্রপূজা’ বইটিতে সংকলিত হয়। 

মৃত্যুর মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের মুখে ‘অসতো মা সদ্গময়’ শুনতে শুনতে দেবেন্দ্রনাথের শেষ নিঃশ্বাস পড়ে। অবনীন্দ্রনাথ ‘ঘরোয়া’ বইটিতে লিখেছিলেন, ‘একটু শ্বাসকষ্ট না, মুখবিকৃতি  না, দক্ষিণ মুখে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন ঘুমিয়ে পড়লেন। দেবেন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ বাবাকে ‘সুন্দরের উপাসক’ মনে করতেন। তখন দেবেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘শাশ্বত জ্যোতি’! 

আত্মিকধর্মকে আঁকড়ে সংসার ধর্ম পালনের পথ ছিল দেবেন্দ্রনাথের। কিন্তু তিনিও তো মানুষ ছিলেন। এত বছর গড়িয়ে যাওয়ার পর, আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, দেবেন্দ্রনাথের মনোভাবও সবসময় সমর্থনযোগ্য ছিল না। বাবার নির্দেশে বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর কিশোরী স্ত্রীর পুনর্বিবাহ বন্ধ করে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। কে বলতে পার, নিজের মেয়েদের বাল্যবিবাহের অন্তরালে দেবেন্দ্রনাথের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল কীনা! মৃত্যুর দূরত্ব দেবেন্দ্রনাথের ছায়ার থেকে সরিয়ে এক নতুন মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করালো। 

১৯০৫ সালে দেবেন্দ্রনাথের চিরনিদ্রার পর থেকে একটু একটু করে জেগে উঠতে লাগলো রবীন্দ্রনাথের স্বাধীন মন— একথা সাহস করে বলেই ফেলি। ব্রাহ্ম পিতার ব্রাহ্ম সন্তান, কিছু ক্ষেত্রে গোঁড়া মানসিকতার ঋক্থ বহনকারী অনুগত পুত্র রবীন্দ্রনাথের নির্মোক ভেদ করে যে রবীন্দ্রনাথ আত্মপ্রকাশ করবেন, তিনি এবার নিজস্ব কিছু ইচ্ছেকে মূল্য দেবেন। ব্রাহ্মধর্মকে অনুসরণ করলেও, এই সমর্থনের মধ্যে কোনো উদারতা খুঁজে পাননি। দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর কবি নবীনচন্দ্র সেনের সঙ্গে এক নিভৃত আলাপচারিতায় এই রবীন্দ্রনাথই বলবেন যে, তাঁর মনে সন্দেহ জাগে তিনিও ‘পৌত্তলিক’ কীনা!

ব্রাহ্মনায়ক দেবেন্দ্রনাথ গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনকে ত্যাগ করে প্রতিমার পীঠস্থানে উপাসনার বেদি বানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু শিলাইদহে গোপীনাথের বিগ্রহকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গোপীনাথের আশীর্বাদ নিয়ে শিলাইদহে সুরেন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছে, রথীন্দ্রনাথ বিগ্রহকে প্রণাম করেছেন। দেবেন্দ্রনাথের ইচ্ছেয় সাহানাদেবীর পুনর্বিবাহ আটকে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ! কিন্তু নিজের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন বিধবা প্রতিমাদেবীর। আমরা কি জানি, এর অন্তরালে কোনো অনুশোচনা ছিল কীনা! রবীন্দ্রজীবনে কাদম্বরীদেবীর প্রভাব আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। কাদম্বরীর আত্মহত্যার পর দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে তাঁর চিঠি, কাগজপত্র, ছবি — প্রায় সব নষ্ট করে ফেলা হয়। রবীন্দ্রনাথও প্রতিবাদ করতে পারেননি। কারণ তিনি ছিলেন পিতার অনুগত পুত্র। কিন্তু সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ নীরবে লিখে রেখেছেন অসংখ্য সাহিত্য— তাঁর জীবনের ধ্রুবতারার উদ্দেশে। এই কি প্রতিবাদ?

পুরোপুরি ‘বাবার মতো’ কি আদৌ হতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? সেই ইচ্ছেটাও কি শেষজীবন পর্যন্ত তাঁর মনের মধ্যে ছিল? হয়তো নয়। ব্যক্তিগত উপলব্ধির আলোয় শেষ পর্যন্ত একলাই পথ চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই চলার পথের পাথেয় ছিল মহর্ষির আশীর্বাদ । 

সহায়ক গ্রন্থঃ

জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পিতৃস্মৃতি, সৌদামিনী দেবী
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (ভূমিকা ও তথ্যপঞ্জী-জ্যোতির্ময় সেন)
রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত ইত্যাদি।

 

Developed by DXDasia