রান্না করে, বাসন মেজে, ঘর গুছিয়ে গান গাইতে আসি, ফুলবাবুর জীবন আমার নয় : সুচিত্রা মিত্র

উদাত্ম কণ্ঠের সুচিত্রা

কবার মঞ্চে অনুষ্ঠান চলাকালীন গানের কথা ভুল বলে ফেলেছিলেন তিনি। রবিঠাকুরের গান। তখুনি গান থামালেন। হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন সকল দর্শক শ্রোতার কাছে। আবার প্রথম থেকে গান শুরু করলেন। তিনি সুচিত্রা মিত্র (Suchitra Mitra)। নিজের চোখে তাঁকে দেখার সুযোগ হয়নি কোনোদিন। কিন্তু খুব ছোটোবেলা থেকে আমার গুরুমা মায়া সেনের সান্নিধ্যে থাকার সুবাদে এমন অনেক গল্প শুনে বড়ো হয়েছি। আর গল্পের সঙ্গে সঙ্গে শুনেছি সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে রেকর্ডেড সব রবীন্দ্রসংগীত। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে খুব সৎ এবং আদর্শবাদী মানুষই একমাত্র প্রকৃত শিল্পী হতে পারেন। এবং সুচিত্রা মিত্র ছিলেন সেরকম একজন শিল্পী। যাঁর কাছে রবীন্দ্রসংগীত শুধুমাত্র সুর-তাল-লয় ছিল না। প্রতিটি গানের কথাকে তিনি নিজের অন্তরে আত্মস্থ করে নিতে পারতেন সহজেই।

সুচিত্রা মিত্রের বড়োবোনের বান্ধবী উমা স্নেহানবীশ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ হলে কবিগুরুর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে। কবি তখন সদ্য প্রয়াত। সেখানে গান গাওয়ার আনুষঙ্গিক কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল না। তার মাঝেই ছোট্ট সুচিত্রা নাকি সেদিন খালি গলায় গেয়ে উঠেছিলেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’। গানটি সবার খুব মনে ধরেছিল। তারপরে তিনি বৃত্তি নিয়ে শান্তিনিকেতনের সংগীতভবনে ভর্তি হলেন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর মাত্র ২০ দিন পর। কবিগুরুকে না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই খারাপ লাগাকে দূরে সরিয়ে রেখে আপন করে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের খোলা আকাশকে। শুধুই গান নয়; নাচ, অভিনয় সবেতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পারদর্শী। তাই হয়তো তাঁর গানের মধ্যে সুন্দর এক নাটকীয়তা ফুটে উঠত। নাটকের কথা বলতে মনে পড়ল, একবার চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যর গান শিখছি। ‘আমি চিত্রাঙ্গদা আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী’ গানটি একটি অনুষ্ঠানে গাইতে হবে। স্বরলিপি দেখে গান তোলার পরেও আমি বিভিন্ন পুরোনো শিল্পীদের গান শুনি। বিশেষ করে নৃত্যনাট্যর গানে এই শোনা ভীষণভাবে কাজে দেয়। গানটি সুচিত্রা মিত্রের রেকর্ড শোনার পরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সবটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ‘নহি দেবী নহি সামান্যা নারী’ — একটা চরিত্রকে কতটা পরিমাণ নিজের ভেতরে বসাতে পারলে এভাবে গাওয়া যায়। আমার মনে হয়েছিল তাঁর জীবনের চলার পথের সংগ্রাম, আইপিটিএ-র গণনাট্য আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং যে কোনও রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সঙ্গে যেন এই গান ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সে গান আমি আজও শুনি। বারবার শুনি। এবং প্রতিবার একইরকম ভাবে গায়ে কাঁটা দেয়।

বিবাহের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দমে ছেলেকে বড়ো করে তোলার পাশাপাশি অনুষ্ঠান, রেকর্ডিং সামলানো সবটা একা হাতে করা ভীষণ সহজ কাজ ছিল না। সাতাশি বছরের জীবনে বেশিরভাগ সময় একলা চলতে হয়েছে বলেই বোধহয় অন্যের উপর নির্ভর করতে পছন্দ করতেন না।

আমাদের বাড়িতে এখনও সকাল হলেই রেডিও চালানো হয়। এফএমের যুগে কলকাতা ক কিংবা কলকাতা খ-এর ফ্রিকোয়েন্সি ধরা মুশকিল। তবে মনে আছে ছোটোতে খুব ভোরবেলায় রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান ব্রডকাস্ট করা হত। সেখানেই প্রথম শুনলাম সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি/ কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক/ মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে/ কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।’ প্রতিটা স্তবকের ‘কালো’ শব্দটি ফিরে ফিরে আসছে আর চমক লাগছে। একটা শব্দকে কতবার কতভাবে বলা যায়, ওঁর গানে প্রথম বুঝেছিলাম।

আমার গুরুমা মায়া সেন এবং সুচিত্রা মিত্র দুজনেই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে অধ্যাপনা করেছেন। আমার মতে মায়াদি যেমন ছিলেন একজন অসামান্য ট্রেনার, সুচিত্রা মিত্র ছিলেন অসাধারণ একজন পারফর্মার। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুচিত্রা মিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘কী রকম ঝরঝরে চেহারা, টরটরে কথাবার্তা, কী স্মার্ট চলাফেরা! আমরা অবাক হয়ে সুচিত্রাকে দেখতুম।” রবীন্দ্রসংগীতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি সুচিত্রা মিত্র, আমরা জানি এই লড়াই চিরকালীন। কিন্তু আমার মতে দুজনে দুজনার মতো করে রবীন্দ্রসংগীতের আলাদা দুই জগৎ তৈরি করেছিলেন। যেখানে রেষারেষির কোনও স্থান ছিল না।

যেমন মোহরদির কণ্ঠে মুক্তছন্দের গান আমার বড়োই প্রিয়। কিন্তু আবার বাউলাঙ্গ কিংবা কীর্তনাঙ্গের গান হলে সুচিত্রা মিত্রের জুড়ি মেলা ভার। এক জায়গায় পড়েছিলাম তিনি লিখছেন, “আমার তো মনে হয় বাঁচার যে আগ্রহ, এই যে বিপদকে ভয় না করার যে শিক্ষা, জীবনকে নৈরাশ্যের সুরে ভারাক্রান্ত না করে তোলা, এই যে আলো–বাতাস, আকাশ–মাটি এ সবই যেন একান্ত আপনার মনে হওয়া—এ শিক্ষা গুরুদেবের গানের মধ্য দিয়েই পেয়েছি। জীবনে এর চেয়ে বড়ো মন্ত্র, বড়ো আনন্দ আমার আর নেই।” তাঁর গান শুনে মনে হয় রবিঠাকুরের গানের মতোই তিনি ছিলেন কখনও কঠিন আবার কখনও ভীষণ স্নেহময়ী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় গর্জে উঠেছেন যেমন, তেমনি নিজের অগণিত ছাত্র ছাত্রীদেরকে সন্তানসম স্নেহে শিখিয়েছেন রবিঠাকুরের গান।

আমার আশেপাশের বেশ কিছু মানুষের থেকে আমি এমন অভিযোগ শুনতে পাই, রবীন্দ্রসংগীতকে প্রাতিষ্ঠানিকতার মোড়কে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে। এমন মন্তব্যের পেছনে গায়কি অথবা ভাবধারার প্রয়োগ কারণ হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি পুরোনো দিনের শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গানকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরেছিলেন তাঁদের স্বকীয় নিজস্বতা দিয়ে। সুচিত্রা মিত্র তাঁদের মধ্যে অন্যতমা। দাঁত চেপে গলা চেপে রবিঠাকুরের গান গাওয়া নয়, গলা ছেড়ে পুরোদমে উদাত্ম কণ্ঠে গান গাইতেন তিনি। আর এই বিষয়টি সেই ছোটোবেলা থেকেই আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। যখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে মাস্টার্স পড়তে শুরু করলাম, নাট্যগীতির গান ছিল “খাঁচার পাখি ছিলো সোনার খাঁচাটিতে/ বনের পাখি ছিল বনে, একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে/ কী ছিল বিধাতার মনে”। এই গান ইউটিউবে সেবার প্রথম শুনলাম সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে। শুধু উদাত্ম কণ্ঠে বজ্রস্বরে গান নয়, গানে ফুটে উঠেছিল খাঁচার পাখির পরাধীন মনের আকুতি। এখানেই একজন প্রকৃত শিল্পীর জয়। তিনি শুধু এক ধরনের গানেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেননি। রবিঠাকুরের বিভিন্ন অঙ্গের গানে অবাধ বিচরণ করে গেছেন অনায়াসেই। তাছাড়া শুধু রবীন্দ্রনাথের গান নয়, অতুলপ্রসাদী, আধুনিক বাংলা গানও গেয়েছেন সমান তালে।

ছোটো থেকেই নাকি অভিনয়ের প্রতি বিশেষ টান ছিল সুচিত্রাদির। সেই ইচ্ছেও পূরণ হয়েছে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত সিনেমা দহনে। তবে সেখানেও তাঁর প্রতি এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তাঁর চরিত্রের ডাবিং অন্য কোনো শিল্পীকে দিয়ে করানো হয়েছিলো বলে তিনি বলেছিলেন, “আমি দহন-এর শ্যুটিং করতে পারলাম আর একদিন গিয়ে ডাবিং করে আসতে পারতাম না! তাতে আমার সময়ের খুব অভাব হয়ে যেত?” বিবাহের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দমে ছেলেকে বড়ো করে তোলার পাশাপাশি অনুষ্ঠান, রেকর্ডিং সামলানো সবটা একা হাতে করা ভীষণ সহজ কাজ ছিল না। সাতাশি বছরের জীবনে বেশিরভাগ সময় একলা চলতে হয়েছে বলেই বোধহয় অন্যের উপর নির্ভর করতে পছন্দ করতেন না। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না সবই নাকি করতেন নিজের হাতে।

সুচিত্রা মিত্রের কাছে রবীন্দ্রসংগীত শুধুমাত্র সুর-তাল-লয় ছিল না। প্রতিটি গানের কথাকে তিনি নিজের অন্তরে আত্মস্থ করে নিতে পারতেন সহজেই।

এই সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অনেকের মুখে শোনা একটা গল্প মনে পড়ল। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় বলছেন, একদিন কোনও একটি অনুষ্ঠানে সুচিত্রা মিত্র গিয়েছেন। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। দ্বিজেনবাবু জানতে চান, ‘‘সুচিত্রা, তোমার কি শরীর খারাপ?’’ তিনি বলেছিলেন, ‘‘দ্বিজেন, এমন শরীর খারাপ আমার রোজই থাকে। কারণ আমি রান্না করে, বাসন মেজে, ঘর গুছিয়ে তবে গান গাইতে আসি। তোমাদের মতো ফুলবাবুর জীবন আমার নয়।’’ তাঁর জন্মশতবর্ষে আজও একইভাবে বাঙালির মনে রবিঠাকুরের গান দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন। এরকম আজি হতে আরও শত হাজার সহস্র বছর পরেও আমরা তাঁর গান শুনে উদ্বুদ্ধ হব, অনুপ্রাণিত হব।
 

Developed by DXDasia