“বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়”—নিজের স্ত্রীকে নিয়ে লিখেছিলেন মানিক
‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের জানতে পারে, তার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে। এইসব খবর আনন্দ বয়ে আনে না জেলেপাড়ায়। কুবের ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে, ‘পোলা দিয়া করুম কী, নিজগোর খাওন জোটে না, পোলা!’
এ অবশ্য উপন্যাসের ‘বাস্তব’। তাও আবার পদ্মানদীর মাঝিদের দুনিয়ায়। সেখানে অভাব জোয়ারের মতো থইথই করে। সন্তানের জন্ম সে-সংসারে উদযাপিত হবে না, স্বাভাবিক। শহুরে, শিক্ষিত, রুচিশীল মধ্যবিত্তদের পৃথিবীটা এর চাইতে অনেক দূরে। কুবের-হোসেন মিঞার আখ্যান পড়ে চমকে উঠতে হয় বটে, কিন্তু তাতে পাঠকের ভাবের ঘর ভেঙে পড়ে না। যিনি এই উপন্যাস লিখেছেন, তাঁকে কুর্নিশ। কিন্তু তিনি নিজেও তা ‘মধ্যবিত্ত’। থাকেনও কলকাতায়। অতএব, এই গল্পও আসলে দূর থেকে বাস্তবের জাল বোনা কল্পনাই…
তর্ক জুড়লে এমনটা বলতেই পারতেন কোনো পাঠক। প্রতিটা যুক্তিই খাঁটি সন্দেহ নেই। তবু, একবার সেই ‘মধ্যবিত্ত’ লেখকের ডায়েরিতে অনুপ্রবেশ করুন পাঠক। অনেক জায়গার পাশাপাশি চারটি বাক্যে চোখ আটকাবে। নির্মোহ, সাদামাটা চারটি বাক্য– ‘‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।’’
ডলি অর্থাৎ কমলা মানিকের স্ত্রী। মালার সন্তানপ্রসবে কুবের খুশি হয়নি আর ‘‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়”। অর্থ-সংস্কৃতি-শ্রেণী-ভূখণ্ড ছাপিয়ে আবহমান মানবতার খোঁজ করছিলেন যে-সব পাঠক, তাদের চোক চিকচিক করে ওঠার কথা এই সমাপতনে।
লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিপজ্জনক। তাঁর গল্পের চরিত্র কোনোদিন সমুদ্র না দেখার যন্ত্রণা ভোলে নিজের চোখের নোনতা জল জিভ দিয়ে চেটে, ভয়ঙ্কর ভিখু মরতে মরতেও বেঁচে থাকে, ভিক্ষের জন্য পায়ের ঘা বাঁচিয়ে রাখা পাঁচীকে তুলে নেয় পিঠে। তার বেঁচে থাকার আদিমতা যেন চাঁদের মতোই প্রাচীন। প্রেমহীন অসুস্থ জীবন সইতে পারবে না বলে ‘দিবারাত্রির কাব্য’-এর আনন্দ নাচতে নাচতে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ঝাঁপ দেয় আগুনে। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ নিয়ে তো লেখা যায় পাতার পর পাতা। প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় বাজি ধরে ‘অতসী মামি’ গল্প লিখে ছাপতে দিয়েছিলেন যে মানুষটি, তিনি আসলে যেন চাইতেন একটা হেস্তনেস্ত হোক। বাংলা সাহিত্যের পৃথিবীটাকে বদলে দিতেই তাঁর আসা। সেখানে শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের অপ্রকাশিত অধ্যায় যেমন আছে, তেমনই আছে ভিখু, কুবেরদের দুনিয়া। আছে ‘হারানের নাতজামাই’, ‘সরীসৃপ’, ‘আত্মত্যার অধিকার’। সাহিত্যিক মানিক সত্যিই বিপজ্জনক।
আর মানুষ মানিক! ‘কালোমানিক’ ডাকনাম থেকে ‘কালো’ ছিটকে গেছিল শৈশবেই। খুব দুরন্ত। গোড়ালির পাশে গর্ত করে দিয়েছে জ্বলন্ত কয়লা, বারুদে আগুন লেগে বিস্ফোরণে সারা গায়ে ঢুকে গেছে কাচের টুকরো। মানিকের দামালপনা তাতে কমেনি। ছেলেটার পায়ের তলায় যেন বালি সরে সরে যায়। বাঁশি বাজায় চমৎকার। গান গায়। নদীর ধার ধরে হাঁটে। যেচে ভাব জমায় মাঝি, জেলে, গাড়োয়ানদের সঙ্গে। কৈশোরেই একদিন সে পালাল বাড়ি থেকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, টাঙ্গাইল নদীর পাড়ে নোঙর করা নৌকোয় গিয়ে উঠেছে সে। জেলে-মাঝিদের সঙ্গে গান-গল্পে ভালোই কাটছে দিন। ছেলে ঘরে ফিরল। তীক্ষ্ণ মেধা তাঁর। উজ্জ্বল চোখ। মুগুর ভাঁজা শক্ত পেশি। সম্মুখ সমরে কাহিল করে দেয় গুন্ডাদের। এমন চরিত্রও তো কম বিপজ্জনক নয়!
নিজের এহেন চরিত্রের ভারই যেন আজন্ম বয়ে বেরিয়েছেন মানিক। একদিকে তিনি কোনো এক অপার রহস্যতে মগ্ন, তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় স্মৃতি। কবে নদীর পাড়ের কাদায় পা গেঁথে যাচ্ছিল। কে বাঁচিয়েছিল সেদিন তাঁকে? খুঁজতে খুঁজতে নিজের শৈশবকেই আবিষ্কার করেন নতুন চোখে। আবার এই মানিকই বাস্তবতাকে দেখেন নির্মোহ দূরত্ব থেকে। মনের চোরাগলি ধরে হাঁটেন। যৌনতা নিয়ে তাঁর কলম কুণ্ঠাহীন জটিল। তিনিই আবার বামপন্থী রাজনীতির গর্ভে প্রবেশ করেন স্বেচ্ছায়। অভাব তাঁকে নিঃশেষ করে দিলেও পৈতৃক বাড়ি বেচে পাওয়া আট হাজার টাকা দান করে দেন পার্টি ফান্ডে। আর ভাড়াবাড়িতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর আগে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পরেও দ্রুত কাউকে খবর দিতে পারেন না তাঁর স্ত্রী। সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন অসহায়ের মতো জানতে চান, ‘‘বৌদি এমন অবস্থা, আগে টেলিফোন করেননি কেন?’’ উত্তরে ম্লান হেসে ডলি জানান, “তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।”
অভাব! একটা ছোটো অথচ আগুনে শব্দ। দাদা টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই এই অভাবকে নিয়ে ঘর করেছেন মানিক। ঘর বলতে ছোট্ট বাসায় গিজগিজ করে থাকা। লেখার টেবিলও নেই। তারপরেও, ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ আর ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। বাংলা সাহিত্য নতুন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছে এই দুই উপন্যাসে। অথচ, এই দুটি উপন্যাসই মানিকের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়েছে অনেকখানি। মানিক চিঠিতে লিখছেন, ‘‘প্রথমদিকে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ প্রভৃতি কয়েকটা বই লিখতে মেতে গিয়ে যখন আমি নিজেও ভুলে গিয়েছিলাম যে আমার একটা শরীর আছে এবং আমার পরিবারের মানুষরাও নিষ্ঠুরভাবে উদাসীন হয়ে গিয়েছিলেন। তখন একদিন হঠাৎ আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। একমাস থেকে দু’তিনমাস অন্তর এটা ঘটতে থাকে। তখন আমার বয়স ২৮/২৯, ৪/৫ বছরের প্রাণান্তকর সাহিত্যসাধনা হয়ে গেছে।’’
অত্যধিক শারীরিক-মানসিক ধকলে ১৯৩৫-এ ধরা পড়েছে মৃগীরোগ। তবু লিখে যেতেই হয়। “আজ এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমোলে কাল হাঁড়ি চড়বে না।” লেখাই পেটের ভাত এনে দেয়, তারপরেও কিন্তু ‘সস্তা’-র লেখা লেখেননি মানিক। অজুহাতে পিছলে যাননি বাজারি দুনিয়ায়। কী করেই বা যাবেন! একটা চাকরি পেলেন, সেখানে চাকুরিপ্রার্থী আরেক সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী। তাঁরও চাকরির প্রয়োজন। মানিক সম্পাদককে লিখলেন, পরিমল গোস্বামীর চাকরির বেশি প্রয়োজন, তাঁকেই যেন নেওয়া হয়। চাকরি হল, ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন বৈষম্য সহ্য না হওয়ায়। ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘে’-র বুধবারের বৈঠকগুলিতে যখন তিনি গল্পপাঠ করতেন, শ্রোতাদের ভিড় অফিস ছাড়িয়ে সিঁড়ি অবধি পৌঁছত। এত জনপ্রিয়তার পরেও টাকা নেই, খাবারের নিরাপত্তা নেই। অভাব!
৩০ নভেম্বর, জ্ঞান হারালেন। ২ ডিসেম্বর নীলরতন হাসপাতালে পৌঁছল তাঁর সংজ্ঞাহীন শরীর। অচৈতন্য শরীরের ডান হাতটা বারবার শূন্যে উঠে যাচ্ছিল। চেষ্টা করছিল লেখার। মানিকের চেতনা কি তখনো মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল লেখার? না লিখলে যে বাঁচা যাবে না, এই কথা তাঁর চেয়ে ভালো আর কে জানে! মাত্র একদিনের অপেক্ষা। ৩ ডিসেম্বর, মানিককে মুক্তি দিল জীবন। চিরতরে।
প্রকাশকদের দোরে দোরে ঘুরেও পাওনা টাকা আদায় হয়নি তাঁর। কালজয়ী সাহিত্য জন্ম দেওয়া বিনিময়ে দারিদ্র্যকে আরো আহ্বান করে ডেকে এনেছেন সংসারে। সেই মানুষটার শেষযাত্রায় উপচে পড়েছিল ভিড়, আর ফুলের পাহাড়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘‘পালঙ্ক শুদ্ধু ধরাধরি করে যখন ট্রাকে তোলা হয় তখন একটা চোখ খোলা, একটা বন্ধ। শরীরের ওপর রক্তপতাকা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ওপরে ফুল। মুখটুকু বাদে সমস্ত শরীরটা ফুলে আর ফুলে ছেয়ে গেছে।… সামনে পিছনে, দুইপাশে বহু মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ। মোড়ে মোড়ে ভিড়।…কিন্তু কাল কেউ ছিল না, কিছু ছিল না…জীবনে এত ফুলও তিনি পাননি।’’
না, মানিক বলে যেতে পারেননি, “ফুলগুলো সরিয়ে নাও আমার লাগছে।”
তথ্য ঋণ: ‘অপ্রকাশিত মানিক’, সম্পাদনা- যুগান্তর চক্রবর্তী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষ সংখ্যা-উত্তরাধিকার, দিবারাত্রির মানিক, বিনোদ ঘোষাল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬।