২৫ লক্ষ দর্শক, প্রায় ২৬ কোটি টাকার বই বিক্রি
কোভিডের পর এটি ছিল দ্বিতীয় বইমেলা, একইসঙ্গে মাস্কহীন বইমেলাও বটে। শেষ শীতের মরশুমে বইমেলা উপভোগ করলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। শুধু ভিড় নয়, বই কেনাবেচার দিক থেকে আগের সমস্ত রেকর্ডকেও ভেঙে দিল এবারের বইমেলা। বইমেলার সাফল্য নিয়ে এক সাংবাদিক বৈঠকে এই দাবি করেছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড।
যদিও গিল্ডের পক্ষ থেকে সুধাংশু শেখর দে জানাচ্ছেন, বইমেলার জন্য এখনও অবধি বড়ো মাঠ হল ময়দান। মানুষ যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়তেন সেখানে। এবং সকল প্রকাশকদেরই স্টল দেওয়া হত সেখানে। অধুনা সেন্ট্রাল পার্ক ময়দানের মতো প্রশস্ত নয়। স্বাভাবিকভাবেই স্টলের মাপ কমানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই মাঠেই কিন্তু এবছর রেকর্ড সংখ্যক স্টল বসেছিল। গিল্ড কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে এ বছর বইমেলায় প্রায় ৯০০টি রাজ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনীর স্টল ছিল। যা ৪৫ বছরের রেকর্ড।

ময়দানের বইমেলা দুই বছরের জন্য চলে এসেছিল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। এরপর পার্ক সার্কাস, মিলনমেলা হয়ে বইমেলা পেয়েছে নিজস্ব মাঠ। গতবছর সেন্ট্রাল পার্কের এই প্রাঙ্গনকে ‘বইমেলা প্রাঙ্গন’ বলে ভূষিত করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুধাংশু শেখর দে জানাচ্ছেন, “বই ব্যবসার সঙ্গে আর পাঁচটা ব্যবসার মিল নেই। এর সঙ্গে যুক্ত আছে অসংখ্য প্রেস, বাইন্ডিং, কালি, কাগজওয়ালা, লেখক, লেখকের পরিবার। এই এতকিছুর সংমিশ্রনে একটা বই তৈরি হয়।” তাঁর মতে একজন লেখকই হলেন প্রকাশনার লক্ষ্মী। শুধুমাত্র জনপ্রিয় লেখক নন, একজন নতুন লেখককে খুঁজে পাওয়ার জন্যও বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জানা গিয়েছে, ২০২৩-এর বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশকরা অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি বই প্রকাশ করেছেন। কোনো কোনো প্রকাশনী ৭০-১০০টি টাইটেল প্রকাশ করেছে। এমন কিছু প্রকাশনী সংস্থা আছে, যাদের বই কলেজস্ট্রিটে সারাবছর পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র বইমেলাতেই তাদের উপস্থিতি। তাই পাঠক সেই স্টল থেকে বিপুল সংখ্যক বই কিনেছেন। তাছাড়া পাঠক, বিক্রেতা সকলেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, বইমেলায় এসে বই নেড়েচেড়ে, কখনও দু-পাতা পড়ে বই কেনার একটা আলাদা আনন্দ আছে। অনলাইন সেই সুযোগ কখনওই দিতে পারে না।

ফ্র্যাঙ্কফুট বইমেলার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৬ সালে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনের মাঠে কয়েকটা মাত্র স্টল আর প্রদর্শনী দিয়ে শুরু হওয়া এই মেলা এখন আক্ষরিক অর্থেই আন্তর্জাতিক। কলকাতার ময়দানে বার কয়েক স্থান বদলের পর অল্পকালের জন্য সল্টলেক স্টেডিয়াম হয়ে এই মেলা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে মিলনমেলায় থিতু হয়েছিল বেশ কিছু বছর। তারপর তা স্থানান্তরিত হয়েছে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে। কলকাতার ময়দানের তুলনায় বর্তমান মেলার জায়গা তুলনামূলকভাবে ছোটো হলেও, এ বছর দশর্ক-ক্রেতাদের উপরি পাওনা ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো চালু হয়ে যাওয়া। শিয়ালদহ স্টেশনের কাছ থেকে মেট্রোরেলে উঠলে সরাসরি পৌঁছানো গেল করুণাময়ী স্টেশনের পাশে মেলার মাঠে। ফলে বইপ্রেমী মানুষদের যাতায়াতের একটা বড়ো সুবিধা হয়েছে।

গত কয়েকদিন মেলা ঘুরে এবং প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, প্রতিবছর বইমেলায় সব থেকে বেশি বিক্রি হয় রান্নার বই, ভূতের গল্প আর রহস্য গল্প-উপন্যাস। পাশাপাশি কবিতা বা গদ্যের বইয়ের ক্রেতাও কম নেই। তুলনামূলকভাবে কম বিক্রি হচ্ছে অনুবাদের বই, সিনেমা সম্পর্কিত বই এবং আঞ্চলিক ইতিহাসধর্মী বই। কিছু প্রকাশক এখনও ধন্দে রয়েছেন, কোন বইগুলির চাহিদা আসলে বেশি! পাঠকদের মন জুগিয়ে চলাও এক ধরনের গবেষণার বিষয়। প্রতিবারের মতো লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে টানা কয়েকদিন ভিড় ছিল দেখার মতো।
গতবছর কলকাতা বইমেলায় প্রায় ২৩ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। এবছর সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে হয়েছে কম-বেশি ২৬ কোটি। যা সর্বকালীন রেকর্ড। গিল্ডের অন্যতম কর্মকর্তা ত্রিদিববাবুর চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, “মানুষ ভালোবেসে বই কিনেছেন। এমন অনেকেই বই কিনেছেন যাঁরা হয়তো আগে সেভাবে বই পড়তেন না, কিন্তু কোভিডের সময় থেকে তাঁরা বইমুখী হয়েছেন।” এ বছর বইমেলার ফোকাল থিম কান্ট্রি ছিল স্পেন। ভারতে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত হোসে মারিয়া বলেন, “কলকাতার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক সুগভীর। সাহিত্য-সংস্কৃতিই পারে সেই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে।” শেষবার ২০০৬ সালে ময়দানে বইমেলার ফোকাল থিম কান্ট্রি ছিল স্পেন। প্রায় ১৭ বছর পর আবার ২০২৩-এ তারা কলকাতা বইমেলায় নিজেদের সাহিত্য সম্ভারে প্যাভিলয়ন সাজিয়েছিল।
গিল্ডের পক্ষ থেকে ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় রবিবারের একটি বৈঠকে জানান, ২০২৩-এর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি, শনিবার পর্যন্ত ২২ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়েছে। রোববার সেই সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় কম-বেশি ২৫ লক্ষ। যা সমস্ত রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছে। এবং এ বছর কলকাতা বইমেলায় বই বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকার। ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে জানান, “বাংলা বই নাকি বিক্রি হয় না! এসব আশংকা যে অমূলক তা প্রমাণ করেছে কলকাতা বইমেলা।” জানা গিয়েছে, এ বছর বইমেলায় বই, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য জিনিস কিছুই চুরি যায়নি। বই বা ফোন হারিয়ে ফেললেও গিল্ড কর্তৃপক্ষ দায়িত্বসহ তা পৌঁছে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে। তবে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা চোখ এড়াতে পারেনি। যেমন ঝাড়গ্রামের তরুণ লিটল ম্যাগাজিন কর্মী অমিত মাহাতো অভিযোগ করেন পাঁচ নম্বর গেটের পাশে তাঁকে একা ঘুরতে দেখে অযথা সন্দেহ করেন কর্তব্যরত পুলিশ এবং অমিতকে হেনস্থা করার অভিযোগ তোলেন। আবার নিষেধ সত্ত্বেও ফুডকোর্টে প্লাস্টিক ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে।

শেষ শনি ও রবি দুপুরে রোদ উপেক্ষা করে বইমেলা প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছিল লেখক-পাঠকের পুনর্মিলন উৎসব। নামী-অনামী প্রকাশনীর স্টলের ভিতরে গিজগিজ করছিল মাথার ভিড় – জনপ্লাবন। স্টলের বাইরেও দীর্ঘ লাইন। তা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। ভিড় ঠেলে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যেতে অনেকটা সময় লাগছিল। তাও উৎসাহিত বইপ্রেমীদের ঢল বাড়তে থাকে ক্রমেই। মেলার ভিড় যত বেড়েছে, রাস্তার ট্রাফিক সামলাতে ততটাই কালঘাম ছুটেছে বিধাননগর পুলিশের পদস্থ আধিকারিক থেকে সিভিক ভলান্টিয়ারদের। তবে, সুষ্ঠভাবে মেলা আয়োজন করতে পেরে সরকারের সমস্ত দফতরকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে গিল্ড। পুলিশ-প্রশাসন থেকে সব বিভাগের সহযোগিতা মিলেছে এই বইমেলায়। রোববার রাত ৯টা নাগাদ বেজে গেল ৪৬তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার শেষ ঘণ্টাধ্বনি। লেখক-প্রকাশক পরস্পরের কোলাকুলি ও আড্ডায় মুখরিত হল মেলার মাঠ। ঘোষিত হল ২০২৪ সালের ফোকাল কান্ট্রি ব্রিটেনের নাম। ২০২৪ সালে সব ঠিকঠাক থাকলে ৩১ জানুয়ারি থেকেই শুরু হবে ৪৭তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা।

এদিন বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয় বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, বিধাননগর পুরসভা, পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, বিধাননগর পুলিশ, দমকল, সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি এবং বাকি পার্টনারদের। বাংলার ঐতিহ্য দুর্গাপুজোকে তুলে ধরার অভিনব ভাবনার জন্য পুরস্কৃত করা হয় জাগো বাংলাকেও। হলের মধ্যে ছোটো স্টল হিসেবে পুরস্কার পায় মায়া বুকিস। বড়ো স্টল হিসেবে পুরস্কার পায় পেঙ্গুইন। মেলার মধ্যে খোলা জায়গায় ছোটো স্টলের মধ্যে যুগ্মভাবে জয়ী হয়েছে ৯ নং সাহিত্য পাড়া লেন এবং বাণী শিল্প। বড়ো স্টলের মধ্যে জয়ী হয়েছে প্রতিভাস এবং কারিগর।