২ পূর্ণ করে ৩-এর পথে রুচিশীল বাঙালির অনলাইন পত্রিকা ‘শনিবারের কড়চা’

আজ শনিবারের কড়চা-র জন্মদিন

ঠিক দুই বছর ধরে বঙ্গদর্শন.কম থেকে আমরা একটি ডিজিটাল পত্রিকা প্রকাশ করছি শনিবার, পাক্ষিক ভাবে৷ একদিন হঠাৎই এক মিটিংয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ সেন বললেন, একটা অনলাইন পত্রিকা করা যাক। নিয়ম করে সপ্তাহান্তে বেরোবে (প্রায় দেড় বছর এটি সাপ্তাহিক ভাবে বেরোয়)। প্রত্যেকটি সংখ্যা হবে বিষয়ভিত্তিক। কিন্তু পত্রিকার নাম কী হবে! অন্যান্য পত্রিকার চেয়ে কীসেই বা আলাদা হবে সে! এদিক-সেদিক থেকে নানারকম নাম ভাবলাম ইন্দ্রজিৎদা, আমি আর মৌনী। শেষমেশ ঠিক হল ‘শনিবারের কড়চা’। প্রত্যেক শনিবার ঠিক বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে। সম্পাদনার গুরু দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। মৌনী (মৌনী মণ্ডল) কার্যনির্বাহী সম্পাদক। আর ইন্দ্রজিৎ সেন সবসময় নানান বিষয় এবং লেখকদের সন্ধান দিয়ে গেছেন আমাদের৷ তথাগত (তথাগত চৌধুরী) নিজের মতো করে লে-আউট করেন। কখনও সেই কাজে এগিয়ে এসেছে আমাদের কনিষ্ঠ সহকর্মী অলিনী (অলিনী মুখার্জি)। শুরুর দিকে এই নকশার ক্ষেত্রে নানাভাবে সাহায্য করেছেন প্রবীণ সহকর্মী অরুণ পাল। নানাসময় প্রচ্ছদ এঁকে দেন পার্থ দাশগুপ্ত, উদয় দেব, হিরণ মিত্র, মৌনী, অলিনী অথবা আমি নিজেই। দুই বাংলার বিশিষ্ট মানুষরা এখানে নিয়মিত লেখেন। এখনও পর্যন্ত ৮২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

অনলাইনের যুগে বহু অনলাইন পত্রিকা প্রকাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতো কাজ করছে। ‘শনিবারের কড়চা’ অনলাইন ম্যাগাজিনের নবতম সংযোজন ছিল। আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে ২০২১-এর ৭ অগাস্ট প্রকাশিত হয়েছিল কড়চা-র প্রথম সংখ্যা। যেখানে আমাদের প্রচেষ্টা ছিল দুই বাংলার একত্রিকরণ। অনেকেই বলবেন, এ আর নতুন কী! দুই বাংলাকে এক মঞ্চে রেখে একাধিক কাজ হয়েছে বছরের পর বছর। আমরা তার বাইরে গিয়ে দুই বাংলার দুই আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনার পরিসর উন্মুক্ত করলাম। নতুন চোখে, নতুন আঙ্গিকে। ‘শনিবারের কড়চা’-র মাধ্যমে বিশ্বভারতী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন করেছিলেন দুই বাংলার বিশিষ্টজনেরা।

এই আন্তর্জালিক পত্রিকা কোথায় আলাদা, তা বিচার করবেন প্রিয় পাঠক৷ তবে যে কথা না বললেই নয়, তা হল আমরা প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম প্রত্যেকটি সংখ্যা হবে বিশেষ বিষয়যুক্ত৷ ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ‘শনিবারের কড়চা’ ‘ম্যাগাজিন’-এর চেয়েও অনেক বেশি ‘জার্নাল’, যা বহু গবেষকের কাজে আসছে। দুটি উদাহরণ দিই,

২০২২-এর ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা প্রকাশ করেছিলাম বিস্মৃত কৃতি বাঙালি-দের নিয়ে একটি সংখ্যা। নাম ছিল ‘বাংলাই প্রথম’। খুব জোর দিয়েই আমরা বলার চেষ্টা করেছিলাম বাংলাই প্রথম। স্বাধীন ভারতের প্রথম অলিম্পিয়ান, বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম বইয়ের নামে রাস্তার নামকরণ, প্রথম ফিল্ড রেকর্ডের ধারণা, প্রথম পেশাদারি ফটোগ্রাফির ভাবনা, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা রাজবন্দি – যুগ যুগ ধরে বাংলা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে, গর্বিত করেছে। কিন্তু আজকের প্রজন্ম প্রায় ভুলে যেতে বসেছে নীলিমা ঘোষ, নগেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন ভট্টাচার্য, ননীবালাদেবী, লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরীদের। নিঃসন্দেহে এঁদের নিয়ে বিশদে লেখা আলোচনার পরিসর তৈরি করবে এবং গবেষণার কাজে আসবে।

আরেকটি উদাহরণ দিই। আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবসে আমরা প্রকাশ করেছিলাম ‘বাংলার বাঘ’ সংখ্যা। কী ছিল সেখানে? বক্সা-ডুয়ার্সে বাঘেদের ফিরে আসা এবং তার প্রক্রিয়া, বাঘ ও মানুষের পারস্পরিক উদযাপনে জয়দীপ কুণ্ডুর ‘শের’, ‘বাঘ পাগল’ ফটোগ্রাফার বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরীর কাহিনি – এই চমৎকার বিষয়গুলি আজকাল অন্যান্য মিডিয়ার নজরে খুব একটা না এলেও আমরা ভাবিত।

প্রত্যেকটি পত্র-পত্রিকার শিল্পমূল্য এবং বাজার দুই-ই ভাববার বিষয়। ‘শনিবারের কড়চা’ আদর্শচ্যুত হয়নি। শিল্পমূল্য এবং বাজার – এই দুইকে নিয়ে চলেছে সমানতালে। তাই আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন সংখ্যায় লিখেছেন মোহন সিং খাঙ্গুরা, সুশোভন অধিকারী, পবিত্র সরকার, হিরণ মিত্র, জয় গোস্বামী, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, সোহিনী সেনগুপ্ত, প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি, শেখর দাশ, অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী, প্রয়াত অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, লোপামুদ্রা মিত্র, প্রচেত গুপ্ত, মন্দাক্রান্তা সেন, সুতপা সেনগুপ্ত, শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, নেতাজি-কন্যা অনিতা বসু পাফ-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যক্তিগতভাবে আমার দুটি প্রিয় সংখ্যার কথা বলি। প্রয়াত মহান কবিদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা ২০২১-এর ৯ অক্টোবর প্রকাশ করেছিলাম পাণ্ডুলিপির কবিতা, অর্থাৎ কবিদের হাতে লেখা কবিতা। একুশ শতকে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি ক্রমশ মুছতে মুছতে তা পৌঁছেছে কম্পিউটার টাইপে। আমাদের ফিরে যেতে ইচ্ছা করছিল সেই সময়ে, যখন এক একটা পত্র বিনিময় বা পত্রে লেখা বাক্য হয়ে উঠত কবিতা-বিশেষ। বাংলা সাহিত্যের বাইশ জন কবিদের হাতে লেখা কবিতা প্রকাশ করেছিলাম আমরাই প্রথম। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘এক্সক্লুসিভ’। কে না ছিলেন সেই তালিকায়! বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, উৎপল কুমার বসু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মণীন্দ্র গুপ্ত, অরবিন্দ গুহ (ইন্দ্র মিত্র), শামসুর রাহমান, রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচী, অমিতাভ দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, নবনীতা দেবসেন, তারাপদ রায়, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্ত, পিনাকী ঠাকুর।

আরেকটি সংখ্যার কথা বলি। নাম দিয়েছিলাম ‘অ-সাধারণ’ (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১)। যেখানে মনীষা পৈলান, রাজু নেপালি, গাজি জালালুদ্দিন, রাহিলা খাতুন, অনুপম পাল, সীমা সেন এবং অসীমা ভাণ্ডারী নিজেরাই কলম ধরেছিলেন নিজেদের জন্য। সোচ্চার কণ্ঠে গেয়ে উঠেছিলেন জীবনের জয়গান। এঁরা প্রত্যেকে একাকী, লড়াকু, একরোখা, জেদি, সাহসী, নির্ভীক, সপ্রতিভ। তাঁদের কলম আমাদের শিখিয়েছিল শোভন-সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন।

এছাড়াও বর্ধমান, নদিয়া, দার্জিলিং, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম-সহ আরও জেলা নিয়ে জেলাভিত্তিক কাজ — ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা যেমন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, বিনয় মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, নবনীতা দেবসেন, শঙ্খ ঘোষ, তরুণ মজুমদার, সুচিত্রা সেন, উত্তমকুমার আরও কত কত কিংবদন্তিদের নিয়ে আমরা কাজ করেছি। মেয়েমহলে উদযাপন করেছি নারীদের বিপুল কর্মকাণ্ড, ভালোবাসা সংখ্যায় উদযাপন করেছি সমপ্রেমী মানুষদের গল্প, সাজঘরে নিয়ে এসেছি সেকাল আর একালের বদলে দেওয়া ফ্যাশন স্টাইল।

গত একদশক ধরে বঙ্গদর্শন.কম বাংলা ও বাঙালির মনন-মেধা-শিকড় নিয়ে একনাগাড়ে তথ্যসমৃদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে। আমরা কখনওই এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাইনি। বরং বেশি করে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া কৃতি বাঙালিদের জীবনদর্শন উপস্থাপন করেছি আপনাদের সামনে। আমাদের আশ্রয় সেইসব মানুষগুলি, যাঁরা অন্ধকারের মধ্যে থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে জানেন। কেউ ভাঙা বাড়ি সারিয়ে তোলেন, কেউ সাধ্যমতো শিক্ষার প্রসার ঘটান, আবার বন্ধুর যত্ন নেন আরেক বন্ধু — এটাই তো বাংলা। আর এটাই আমরা তুলে ধরতে চাই। ‘শনিবারের কড়চা’ আরও দীর্ঘ পথ হাঁটুক, এই আশা রাখি।

__________
অনিবার্য কারণবশত শনিবারের কড়চা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে আগামী এক মাস। ৮৩তম সংখ্যা নিয়ে আমরা আবার ফিরব সেপ্টেম্বর মাস থেকে। আপনাদের জন্য রয়েছে বিশেষ চমক।

Developed by DXDasia