
৪০টি চাইনিজ রেস্তোরাঁ এই পাড়ার তথা কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ
সাল ১৭৯৮, এক চিনা ব্যবসায়ী কলকাতায় আসেন এবং ঘাঁটি গাড়েন ট্যাংরা এলাকায়। মনে করা হয় আধুনিক ভারতের প্রথম চিনা নাগরিক তিনিই। ব্যবসা করতে আসেন কলকাতায়। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল হেস্টিংসের অনুমতিক্রমে ট্যাংরায় একটি চিনির কারখানা কিনে ফেলেন তিনি। এরপর থেকে এক বড়ো সংখ্যায় শুরু হয় চিনাদের কলকাতা আসা। কলকাতা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ১৮২০ সালে কলকাতায় চিনা নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭০ জন। এই সংখ্যা অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায় প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও কমে না এই সংখ্যা। স্বাধীনতার বছর পনেরো পর লাগে ইন্দো-চিন যুদ্ধ। কলকাতার চিনারা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একজোটে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ট্যাংরা ও তপশিয়া অঞ্চলে একত্রিত বসবাস শুরু করেন তাঁরা। চিনাদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের নাম হাক্কা। এরা চামড়া শিল্পে অত্যন্ত দক্ষ। কলকাতায় বসবাসকারী এই চিনাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন হাক্কা। তাঁরা শুরু করেন চামড়ার ব্যবসা। একের পর এক গড়ে উঠতে থাকে ট্যানারি। শ্রমিক হিসাবেও কাজ পান চিনারাই। এভাবে চিনা নাগরিক বাড়তে বাড়তে একসময় কলকাতায় তাঁদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় কুড়ি হাজারের কাছাকাছি।
এরপর ১৯৮৭ সাল নাগাদ এক মামলার রায় দেয় সুপ্রিমকোর্ট। তপশিয়ার চামড়া কারখানাগুলি থেকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। এই দূষণের ইতি টানতেই বন্ধ করে দেওয়া হয় কারখানাগুলি। প্রচুর শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেকেই ফিরে যান দেশে। সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে যাঁরা রয়ে যান, তাঁরা ধীরে ধীরে কারখানাগুলিকে রেস্তোরাঁ বানিয়ে বসেন। খুব কম সময়ে অথবা খুব সহজ পথে হয়নি এসব। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তেলচিটে কারখানা থেকে তৈরি হয় এই ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁগুলি। ১৯৯০ থেকে মোটামুটিভাবে শুরু হওয়া প্রায় ৩০টি চাইনিজ রেস্তোরাঁ এই পাড়ার তথা কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ। সরকারের পক্ষ থেকে এই পাড়াকে চাইনিজ হেরিটেজ কলোনি বানানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয় একসময়।

তবে এমন নয় যে চায়নাটাউন পুরোটাই আগে কারখানা ছিল এবং কারখানা নিষিদ্ধ হওয়ার পরই সমস্ত রেস্তোরাঁ খুলে ফেলা হয়। প্রায় দশটি রেস্তোরাঁ এখানে কারখানার সময় থেকেই চলেছে বহাল তবিয়তে। তাদের কেউ কেউ প্রায় দু’দশক ছুঁতে বসেছে। এর মাঝের সময়ে অথেন্টিক চাইনিজ রেসিপিতে মিশে গিয়েছে ভারতীয়দের চাহিদা। তৈরি হয়েছে ইন্ডিয়ান চাইনিজ রেসিপি। বাঙালিদের চাহিদা অনুযায়ী মশলা ও ঝালের পরিমাণ বহুমাত্রায় বেড়েছে এই খাবারে। কেবল সসের ব্যাপারে এখনও অথেন্টিক চায়নাটাউন। সকালে শেফ এসে সস বানিয়ে দিয়ে যান সেখানে। নানা ধরনের অরিজিনাল চাইনিজ সস। এই একটা জিনিসে কোনও কম্প্রোমাইজ হতে দেননি তাঁরা। হোটেলের মালিকানাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বংশ পরম্পরায় রয়ে গেছে চিনাদেরই হাতে।
গত কয়েক বছরে যদিও বিপুল মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে চিনা পাড়ায় এঁদের জনসংখ্যা। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। রাস্তায়-ঘাটে, ছোটো-বড়ো রেস্তোরাঁয় সর্বত্র চিনা খাবারের প্রাচুর্য বাড়ায় গুরুত্ব কমে আসছে এই পাড়ার। কলকাতার একমাত্র চিনা স্কুলটি এখানে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন হল। শহরের একমাত্র চাইনিজ মিডিয়াম স্কুল ছিল এটি। এখন ভাড়া দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। আর কয়েকবছরে এই ক্ষয় কী রূপ নেবে তা নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই পাড়ার মানুষেরা। হয়তো রেস্তোরাঁগুলিও তুলে দিতে হবে অন্য কারুর হাতে। সরকারের পক্ষ থেকে লাইসেন্স রিনিউয়ালের অসহযোগিতা তার মধ্যে অন্যতম কারণ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মালিকরা। কেবল একটি রেস্তোরাঁর পাড়া নয়, এই অবক্ষয় যেদিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর কয়েক বছরে এই চিনা সংস্কৃতির চিহ্নমাত্র দেখতে পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে হয়তো আমাদের সাধের কলকাতায়।
তথ্যঋণ – সপ্তর্ষি চৌধুরী
