বাংলার মাটিতে সম্পূর্ণ রাসায়নিক-মুক্ত ধানচাষ সম্ভব?

‘অর্গ্যানিক’ বা জৈব ফসল চাষের ক্ষেত্রে রাজ্যে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ চলছে

“কে বলেছে কীটনাশক দেওয়া উচ্চ ফলনশীল ফসলের তুলনায় জৈব কীটনাশক-মুক্ত ধান এবং শাকসব্জি কম উৎপাদন হয়? এ বিষয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য ডেটা দিতে পারবেন? আপনার ডিপার্টমেন্ট বা বিশ্ববিদ্যালয় কোনও সার্ভে করেছে?” ড. দেবল দেবের এই চাঁচাছোলা প্রশ্নগুলো আমায় বিচলিত করে তুলেছিল। নিজে কৃষি বিজ্ঞানী হয়েও আমি কখনো এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি এবং আমার সহকর্মী বা আমাদের গবেষকদেরও এ জাতীয় আলোচনা করতে শুনিনি। কয়েক দশক ধরে আমি শুনেছি এবং বিশ্বাস করেছি যে ভারতের কোটি কোটি মানুষের খাদ্য জোগাতে বিভিন্ন জাতের উচ্চ ফলনশীল বীজের সবুজ বিপ্লব এসেছিল এবং তার সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। উৎপাদন বৃদ্ধি না হলে ভারতে অচিরেই খাদ্য সঙ্কট দেখা দেবে। ড. দেবল দেবের মতো আমরা কখনওই বাংলার হারিয়ে যাওয়া জৈব ধানের জাত, ফলনের হার বা জৈব ফসলের নির্দিষ্ট খনিজ উপাদানগুলির তুলনা করে কোনও প্রশ্ন উত্থাপন করিনি এবং এই সংক্রান্ত কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করিনি।

ড. দেবলের ‘লুট হয়ে যায় স্বদেশভূমি’ বইটি পড়ার পর তাঁর ব্যারাকপুরের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম আমি। তাঁর লেখা বইটি পড়ে আমি জানতে পারি যে কীভাবে বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলার কৃষকরা কোনও রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ছাড়াই উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ করে চলেছেন, আধুনিক বিশ্বে যাকে আমরা 'অর্গ্যানিক' বা 'জৈব' পদ্ধতি বলে থাকি।

১৯৯৭-৯৯, যখন আমি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় কর্মরত ছিলাম, কলকাতা সার্ভিস সেন্টারের তাপস মণ্ডল আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বলেন যে তাঁরা জৈব শাকসব্জি ফলানোর চেষ্টা করছেন এবং তাঁরা চাইছেন কৃষকদের সভায় আমি এ বিষয়ে বক্তব্য রাখি। তাঁদের প্রস্তাবে আমি বেশ আনন্দিত হয়েছিলাম তবে, জৈব সবজি চাষও যে কখনও পাকাপোক্ত মডেল হয়ে উঠবে, এ ধারণা তখন আমার ছিল না। জৈব সবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব নয়, কারণ এই ধরনের ফসলে খুব সহজেই পোকা লেগে যায়, এইধরনের অনেক কথাই তাঁকে বলেছিলাম আমি। সেক্ষেত্রে, জৈব চাষ মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন এবং বাজারের চাহিদা কীভাবে মেটাতে পারে?তাপসবাবু খুব মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনেছিলেন। ড. দেবের মতো তিনিও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি নিজে কখনও জৈব পদ্ধতিতে চাষের চেষ্টা করেছি না কি কথাগুলো শুধুমাত্র একটা তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে বলছি। তারপর তিনি আমাকে তাঁদের লাইব্রেরি থেকে জৈব চাষ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বই পড়তে দেন। সেই বইগুলির একটিতে বাংলায় দেশী ধান চাষ করা নিয়ে খুব আকর্ষণীয় একটি কাহিনি পাই, এই প্রতিবেদনের উত্সটি ছিল সংবাদপত্রে প্রকাশিত রতনলাল ব্রহ্মচারীর একটি নিবন্ধ। এরপরই আমার হাতে এসেছিল ২০০০ সালে লেখা ড. দেবল দেবের বইটি। সেই বই থেকেই আমি ডায়মন্ড হারবারের বীজ ব্যাংক এবং এর চেয়ারম্যান অরূপ রতন মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারি। এই বইগুলি এবং সেগুলি থেকে পাওয়া তথ্য ভারতের সবুজ বিপ্লব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বদলে দেয়। শুধু তাই নয়, বইগুলি থেকে যে জ্ঞান আমি অর্জন করেছিলাম, তা আমার সহকর্মীদের সঙ্গেও ভাগ করে নিই।ড. দেবের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার পর, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে দেশী ধানের ফলন, যাকে তিনি ‘দেশী সম্পদ’ বলেছেন, তা অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন ধরনের হয়। কোনও অঞ্চলের পরিবেশগত অবস্থার উপর নির্ভর করে সেখানে চাষাবাদ-ফলন কীরকম হবে। তাঁর কথায়, “চাষের প্রক্রিয়া নির্ভর করে কোনও অঞ্চলের পরিবেশগত অবস্থার উপর, তার মানে এই নয় যে বিভিন্ন ধরনের জৈব ধান কম ফলনশীল। কোনও কোনও অঞ্চলে ফলন বেশি, কোথাও কম হতে পারে।” এমনকি ড. দেব আমাকে এও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আমি পরিবেশ এবং পরিবেশগত অর্থনীতির মূল ধারণাগুলি বুঝতে পেরেছি কিনা। ড. অমর্ত্য সেনের মতোই ড. দেব বলেছিলেন যে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সঙ্কট রাজনৈতিক কারণে উত্থিত হয় এবং কম বা বেশি ফলনের সঙ্গে এর কোন যোগসূত্র নেই।ড. দেব ১৯৯৭ সাল থেকে বাঁকুড়ার বহু চাষীদের সঙ্গে দেশীয় ধান চাষের ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছিলেন এবং সেই কারণে জিএমও বীজ, বিষাক্ত বীজ, দেশীয় জৈব চাষ, ভারতের বিভিন্ন কৃষক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি পরিবেশ, আদিবাসী গুরুত্ব, খাদ্য অর্থনীতি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞান আমার থেকে আলাদা রকমের ছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই, তা আমার চেয়ে ভালো। আস্তে আস্তে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ, সাক্ষাৎ বাড়ে এবং আমরা ভালো বন্ধু হয়ে উঠি।

১৯৯৯ সাল থেকে চাষীদের ধারণাটিও আমাকে আকর্ষণ করে, আমি জল সংরক্ষণে কর্মরত মহিলাদের একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য ফলতায় কাজ করে যাচ্ছিলাম। রাজ্য সরকার পৃষ্ঠপোষকতায় এটি সম্ভবত প্রথম গোষ্ঠী, এর আগে বেশিরভাগই এনজিও পরিচালিত ছিল। খবরটি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েন, ত্রিপুরাতেও পৌঁছয় এবং সেখান থেকে একটি টিম আসে আমাদের মডেলটি বুঝতে।বর্তমান কৃষি ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো খুঁজে পাচ্ছি আমি। আগে আর এখন, রাজ্যের কৃষি বিভাগে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি। রাজ্যের কৃষি বিভাগের ধান এবং শাকসবজি জৈব চাষে দুর্দান্ত কাজ করছে। জৈব ধানের ফলনও বেশি। আগে যেখানে ‘দেশীয় সম্পদ’-এর জমি ছিল প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর, আজ তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪২ লক্ষ হেক্টর। এই প্রক্রিয়া যদি অব্যাহত থাকে তবে বাংলায় সফলভাবে উচ্চ ফলনশীল দেশী ধান জন্মাবে, যা সম্পূর্ণ কীটনাশক ও রাসায়নিকমুক্ত এবং এভাবেই প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগের প্রকোপ থেকে মুক্তি পাব আমরা। 

Developed by DXDasia