সুদেষ্ণা মৈত্রের ‘জুতো যখন কথা বলে’ বইয়ের পাঠ-প্রতিক্রিয়া
আমাদের ছোটোবেলার স্মৃতির বেশকিছুটা অংশ গল্পের বই দাবি করতে পারে। শব্দব্রহ্ম যে ভালোলাগার ম্যাজিক মনের কোণে তৈরি করেছে, তার টান এখনও কমেনি। এই মধ্যবয়সেও যে স্বপ্ন দেখতে পারছি, তার কারণ ওই শব্দের জাদু। এখনকার শৈশব তো প্রযুক্তির জালে বন্দি। তবু শব্দের ম্যাজিক এখনও ছড়িয়ে আছে। মনের চোখ খোলা রেখে খুঁজে নিতে হবে। আমি সেদিন খুঁজে পেয়েছি সুদেষ্ণা মৈত্রের লেখা ‘জুতো যখন কথা বলে’ বইটিতে। আজকাল প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত পেপার ব্যাকের মাত্র আশি পাতার এই বইটিতে ছোটোরা খুঁজে পেতে পারে এক নির্মল আনন্দের পৃথিবী। মোট ১০টি ছোটোগল্প মণিমুক্তো হয়ে জ্বলজ্বল করছে দুই মলাটের মধ্যে। গল্পগুলি যেন কথা বলে চলে পাঠকের সঙ্গে। গল্প বলার ভঙ্গিটি বড়ো সরল, সুন্দর। প্লট নির্বাচন অনবদ্য। গল্পগুলি কল্পনা আর বাস্তবের আশ্চর্য মেলবন্ধনে পাঠককে কিছু শিখিয়ে দিয়ে যায়। এই বইটি শিশু কিশোর পাঠকদের জন্য লেখা হলেও পরিণত পাঠকও ডুব দিতে পারেন এই আনন্দের সরোবরে।
দেখবেন, অবহেলিত জুতো কথা বলে উঠছে। মানুষের ষড়যন্ত্রের প্রতিকূলে একজোট হয়ে দাঁড়াচ্ছে বনের সব পাখপাখালি। ময়না পাখির বন্দিত্ব দূর করতে এ যেন সবুজের বিপ্লব। কাজু আর বরফি নামের দুটি ছেলে-মেয়ে আঁকার প্রতিযোগিতায় নাম দেওয়ালো লক্ষ্মী নামের এক দরিদ্র বোষ্টমের মেয়েকে। তারপর যা হবে, সেটাই গল্পের ম্যাজিক। অনাবিল স্কুলে শিখবে সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ। তারপরেই আঙুলেরা কেমন করে কথা বলতে শুরু করবে। মজার লড়াই শেষে কীভাবে সব ঠিক হবে, সেটাই তো গল্প। ঘুড়িদের কান্না, গাছেদের বেদনার আখ্যান কেউ কিন্তু এভাবে বলেননি।
তমাল আর অমুর জীবনে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হয়। উপলব্ধিও! তিন্নি আর ওর দাদু মিলে সকলকে গ্লাভস পরতে বলে। কিন্তু ঠাম্মা কিছুতেই রাজি নয়। শেষপর্যন্ত কী হল, সেটা জানতেই গল্পের সঙ্গে পথ চলা যায়। একটা স্কুলের টিম ওয়ার্কে বারোটা টুপি বানানোর কথা ছিল। একটা টুপি খুব দুষ্টু। দুষ্টুমি করেই পালিয়ে যায়। এবার শুরু হয় গল্প। কেমন করে টুপি ফিরে আসবে, বই হাতে নিয়ে পড়ার মজাই আলাদা। জোজো একটা ভালো কুকুর আর পুসি বেশ দুষ্টু বেড়াল। পুসি বাড়ি থেকে পালাবার পথ খোঁজে আর জোজো ওকে পাহারা দেয়। চিরাচরিত বেড়াল কুকুরের রসায়ন নয়। তারপর সেই দুষ্টু্ পুসি একদিন সত্যি পালিয়ে যায়। তাকে আবার ফিরে পাওয়াই হল গল্প। ছোট্ট একটি মেয়ে বনের পথে হারিয়ে যায়। তাকে পথ খুঁজে দেয় টিয়াপাখি। মেয়েটির ভয় কাটাতে পাখিরা মজার মজার কথা বলে, মিটিং বসায়। হাতি, বাঁদর, পিঁপড়েদেরও দলে নেয়। বাড়ির পথ খুঁজে পাওয়াটাই তো গল্পের গল্প। এক অলস বাঘ হাতির পিঠে উঠে শিকার করতো। এই শিকার করা হাতির পছন্দ ছিল না একটুও। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল বনের পশুপাখি। বাঘকে নতুন মন্ত্র শেখানো হলো, ‘গোগো গিগি গাগা!’ সেই মন্ত্রশক্তির জোরে কী হল, জানতে গেলে পড়তেই হবে সুদেষ্ণা মৈত্রের লেখা বই ‘জুতো যখন কথা বলে’।
বইটি শুধু যে নির্মল আনন্দ বা গল্প পড়ার খুশি পাঠককে দেয়, তা নয়। এক সহজিয়া খুশি এবং জীবনে মানুষ আর প্রকৃতির সুন্দর সহাবস্থানের মন্ত্র শেখাবে। গল্প-পাঠক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, চরিত্রগুলি প্রতীকী। এক গভীর জীবনবোধ এবং সহজ বাস্তব প্রতিটা শব্দের আড়ালে স্নেহসবুজ ভঙ্গিতে রয়েছে। পাঠকের কাজ তাকে খুঁজে নিয়ে আত্মস্থ করা। ছোটোদের জন্য লেখা এই গল্পের ভুবনে প্রবেশ করার মুদ্রিত মূল্য মাত্র ১৩০ টাকা। বাংলা সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা এবং এখন গল্পদিদা নামে শিশুমহলে খুব জনপ্রিয় লেখিকার লেখার ধারা বিদেশি রূপকথা এবং ছড়ার পৃথিবীর কাঠামো মনে করিয়ে দিতে পারে। তার সঙ্গে এসে মিশেছে আমাদের রূপকথা উপকথার সুবাস। বইয়ের প্রচ্ছদ এবং গল্পের সঙ্গে মানানসই ছবি এঁকে দিয়েছেন মনোনীতা কাঁড়ার। লুইস ক্যারোল আর লীলা মজুমদারের মেলবন্ধন বাংলা সাহিত্যে প্রথম চোখে পড়ল সুদেষ্ণা মৈত্রের ‘জুতো যখন কথা বলে’ বইটিতে। আরও অনেক প্রত্যাশার দাবি রইলো লেখিকার প্রতি। বইটি কিন্তু অবশ্যপাঠ্য।
বই- জুতো যখন কথা বলে, লেখক- সুদেষ্ণা মৈত্র, প্রকাশক- আজকাল, মুদ্রিত মূল্য- ১৩০ টাকা।