
‘নৈঃশব্দের পত্রগুচ্ছ’ এবং ‘পাঁচ মাথার মোড়’
‘নৈঃশব্দের পত্রগুচ্ছ’ – হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত এবং সুস্থ সকল মানুষের অবশ্যপাঠ্য বই
অলোকপর্ণা
বহুদিন হল আমরা চুপ করে আছি। গাছ, জিরাফ বা অন্ধকারের মতো। চুপ করে থাকতে থাকতে আমাদের দুটো ঠোঁটে সেলাই পড়ে গেছে। আমাদের ভিতরে ভিতরে কথার ভীরু স্বপ্ন তৈরি হয়েছে, কিন্তু ‘ভীরু’ শব্দের হ্রস্ব-উ কারের মতো পাকিয়ে থেকেছে আমাদের জিভ। টানটান চাবুকের মতো সপাট হতে পারেনি। আমরা আজনম শুধু চেয়ে থেকেছি। অন্ধকারে। থকথকে অন্ধকারে চোখে একরাশ আলো এসে পড়লে চোখ জ্বলেছে, চোখ পুড়েছে। আগুন দেখা যায়নি। ইতিউতি খানিক ধোঁয়া কেবল চোখ হতে চোখ জ্বালিয়েছে।
“চুলহে নেহি জ্বালায়ে ইয়া বস্তি হি জ্বল গ্যয়ে/ কুছ রোজ হো গ্যয়ে হ্যায় অব উঠতা নেহী ধূঁয়া।/ আঁখো মে জ্বল রাহা হ্যায় কিঁউ বুঝতা নেহী ধূঁয়া।/ উঠতা তো হ্যায় ঘটা- সা বরসতা নেহী ধূঁয়া।।”
বেশ বড়ো, চৌকো, মলিন মতো এই বই। অনেকক্ষণ বুকে চেপে ধরে রাখা যায় এমন তার আকার, পরে যদিও হার্ড কভারে ভিন্ন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত বই বুকে হাজার শব্দ নিয়েও বাক্যহীন। যন্ত্রণা যেমন বোবা, ঠিক তেমন।
“নদীর কাছে গল্প ছিল-/ ঘাটের কাছে নৌকো ছিল বাঁধা/ শুরুর দিকে বৃষ্টি অল্প ছিল/ খাতার পাতা মোটের ওপর সাদা।”
অন্ধকার ছাড়া আলো যেমন চোখে তেমন ফোটে না, নৈঃশব্দ্যকে ধারণ করতে খানিক শব্দের দরকার পড়ে। শব্দ, ছবির পাশাপাশি শূন্যস্থানের এক বড়ো ভূমিকা আছে এই বইতে। মাঝে মাঝে অর্চন মুখার্জির ছবিগুলি একেকজন একেক আশ্রয়ের মতো গজিয়ে আছে এই বইয়ের গায়ে। কত গভীরে যে ঘাই মারে সেসব ছবি, পাঁকাল মাছের মতো, ভিতরের নোনা গভীর অবধি গিয়ে আর ফেরে না। থেকে যায় সেখানেই। রান্নাঘরে তুলাযন্ত্র হাতে দাঁড়ান “লেডি জাস্টিস” মায়ের চোখ বাঁধা কালো কাপড়ে। সত্যকে চিনতে না চেয়ে অন্ধ সে মায়ের পাশে ভ্রূণ ভঙ্গীতে শুয়ে আছে নগ্ন পুত্রসন্তান, ক্যামেরার চোখে চোখ রেখে, আমাদের চোখে চোখ রেখে। রান্নাঘরের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেখাচ্ছে রোস্টেড টার্কির মত। তার পাজরের হাড়ে আমাদের বিনোদন ঝলসে উঠছে, ঠিক যেমন একফালি রোস্টেড টার্কি আমাদের প্লেটে এসে পড়লে হয়। আরেক ছবিতে এক শূন্য ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা- সরল কর। চেয়ারে কালো স্টকিংস পরা ক্রসড লেগ এক “সুজয়” কিছুটা ঝাপসা, আর ক্যামেরার কাছাকাছি বেঞ্চে স্পষ্ট এক “সুচরিতা” বসে। সব প্রশ্নের সহজ সরল উত্তরের মত দুজনেই আবার ক্যামেরার চোখে চোখ রাখা। আরেক পাতায় জেগে আছে কালো কাজল লেপটে দেওয়া মুখে সাদা রং লাগান মূকাভিনয় শিল্পীর দুই চোখ। পাশ থেকে ছটা হাত তাকে প্রথাগত নারীর সাজে সাজাতে প্রস্তুত। মূক ওই দুটো চোখ কথা বলে, কিছু চায়, দাবি জানায়। ছবিটা দেখতে গিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে, এই ছটা হাতের কোনখানি আমার? প্রশ্ন জাগে, ওই মূক মুখ কেন এমন চেনা চেনা লাগে? দশটা ছবির প্রতিটা এভাবে নিজেই একেকটি বই, পরতের পর পরতের পর পরত। প্রতি ছবিতে নৈঃশব্দ্য প্রকট, নৈঃশব্দ্য বাঙময়।
অভিজিৎ মজুমদারের লেখনীকে এই বইয়ের গায়ে শিল্প বলা উচিত। প্রতিটা ছবিকে পাশপবালিশের মত আদুরে আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে সেই লেখনী।
“সায়ন যন্ত্রের মত নির্দেশ পালন করল। মডেলিংয়ের সুবাদে বিনা তর্কে ডায়রেক্টরের নির্দেশ পালনে ও অভ্যস্থ। শুধু একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখল অন্ধকারে রজতের চোখদুটো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। ফসফরাস দেওয়া ঘড়ির মত। যেন ভালো করে তাকালে সময় পড়া যাবে।”
অথবা,
“আচ্ছা, প্রজাপতির ডানা কি তার নিজের? আর তার গুটির সুতো? সেটা কার?
তার ডানা মেলার অনুমতি কি তাকে কোনও সরকার থেকে নিতে হয়? সমাজ কি ঠিক করে তার ডানার কম্পন স্পন্দন?
আচ্ছা প্রজাপতি কি তার ডানার রঙ নিজে পছন্দ করে?”
কত অনায়াস এই লেখনী, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, কোথাও ছন্দপতন ঘটেনা, অথচ ছবি থেকে ছবিতে অনুবাদ হয়ে চলে, এক ফর্ম থেকে অন্য ফর্মে ভেঙে গুড়িয়ে বয়ে চলে। যেমন,
“…তাঁদের হঠাৎ দেখা হয়ে যায় রেলের কামরায়। এজনের হাতে থাকে ভাঙা হারমোনিয়াম, অন্যজনের হয়তো ঝালমুড়ি।
– তারপর?
– ঝালমুড়ি আড়চোখে তাকায় হারমোনিয়ামের দিকে।
– আর হারমোনি?
– সে তো তখন চোখ বুজে গাইছে, ‘একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি।’
-আসে ঘুরে? একবার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পড়ে?
– সেটাই তো ঝালমুড়ি জিজ্ঞেস করতে চায়, “সেই যে আবার আসবে বলে অন্যের হাত ধরে চলে গেলে, কই আর তো এলে না?”
– জিজ্ঞেস করল, ঝালমুড়ি?”
– নাহ্, তার আগেই যে স্টেশন এসে গেল।
– কী নাম স্টেশনের?
– নীরবতা।”
প্রাক ৩৭৭, নীরব এক স্টেশন থেকে এই বই আঁকা ও লেখা শুরু হয়েছিল, শেষ হতে হতে আমরা ৩৭৭ পার করে এসেছি। কিন্তু নৈঃশব্দ্য এখনও কার্ফিউয়ের মত আশরীর জাঁকিয়ে আছে। এখনও রোজ সুজয়, সুচরিতা, হাদিয়া, রজত, প্রীতমরা নিভে আসছে অল্প অল্প করে। বলা উচিত নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ঠিক যে প্রক্রিয়ায়, বিশুদ্ধ স্বার্থে, সংখ্যালঘুর বাকহরণ করে সংখ্যাগুরুরা, যুগে যুগে, পৃথিবীর প্রত্যেকটা প্রান্তে। ঠিক সেভাবেই, সেই ভঙ্গিমায়। নিশ্চুপ সমাজের হোমোফোবিয়ার শেষ দেখার আশায় প্রতিদিন একটা করে সূর্য উঠে আসছে পৃথিবীর আকাশে, স্বপ্ন দেখছে, একদিন পৃথিবীর সব দেশের প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি রামধনু পতাকাটাও উড়বেই উড়বে।
ততদিন পর্যন্ত My letter to silence- নৈঃশব্দের পত্রগুচ্ছ একটি আশ্রয়, হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত এবং সুস্থ- সকল মানুষের অবশ্যপাঠ্য।
বই- নৈঃশব্দ্যের পত্রগুচ্ছঃ My letter to silence | প্রকাশক- গুরুচন্ডা৯ | কথা ও শব্দ- অভিজিৎ, অর্চন মুখার্জি

দেবব্রত, সলিল, হেমন্ত, সুচিত্রা এবং ডিলান – এই নিয়েই পাঁচ মাথার মোড়
বিষাণ বসু
শিল্পসংস্কৃতি ও সংস্কৃতিচর্চা এবং সংস্কৃতিচর্চার পাঠ, দুইয়ের মধ্যে কিছু ফারাক রয়েছে। তুলনায়, দ্বিতীয়টি কিঞ্চিৎ দুরূহ – সাধারণের বোধগম্য ভাষায় তাকে পরিবেশন করার প্রয়াসও তেমন সুলভ নয় – কিন্তু, সেই পাঠের অভ্যাস জারি না থাকলে শেষমেশ সংস্কৃতিচর্চারই ভিত নড়বড়ে হয়ে দাঁড়ায় – সেই পাঠের চর্চা না হলে শিল্পসংস্কৃতি ব্যাপারটা এটাও-হয়-ওটাও-এ এসে ঠেকে – দেবব্রত বিশ্বাস আর অর্বাচীন গায়কের গানের ফারাক করার কান বা মেধা তৈরি হয় না। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ‘পাঁচ মাথার মোড়’ বইখানা পড়তে পড়তে কথাগুলো খুব মনে পড়ল।
একেবারে শুরুর নিবন্ধখানাই ধরুন – দেবতাদের কথাবার্তা : দেবব্রত ও ঋত্বিক –
“আসলে অবাক পৃথিবী – রেকর্ড কোম্পানি তাঁর বদলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে রেকর্ড করানোয় যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হন দেবব্রত।… ঋত্বিক কোমল-গান্ধারে কিন্তু জর্জ বিশ্বাসকেই ব্যবহার করেন তার কারণ ঋত্বিক চেয়েছিলেন ‘বিদ্রোহ চারিদিকে বিদ্রোহ আজ’ – এই স্তবকে জোর পড়ুক। অপরদিকে হেমন্তবাবুর গানের ঝোঁক, অন্যদিকে – ‘এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম’।”
যাঁরা এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে হেমন্তকে ছোট করা হয়েছে বলে হাঁ হাঁ করে উঠছেন, তাঁদের জন্যে বইয়ের শেষ নিবন্ধ বাঙালি এবং সর্বভারতীয় : হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। “আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে গায়ক বা সুরকার ভাবলে কিছুই বলা হয় না। তিনি সময়ের একটা অবিনশ্বর দাগ, এমন এক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি যিনি যুগের নিদ্রাভঙ্গকে বিপুল প্রতিভায় ইতিহাসের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত করেন।”
সে কথা থাক, ‘অবাক পৃথিবী’-তে ফিরি। দেবব্রত বিশ্বাস ও ঋত্বিক ঘটক প্রসঙ্গে বলতে বলতেই সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় চলে গিয়েছেন একই গানকে দুজন দিকপাল গায়ক ধরেছেন কত ভিন্নতায়, এবং সেই ভিন্ন ইন্টারপ্রেটেনশনের অভিঘাত কতখানি পৃথক – এবং, সেখান থেকে প্রায় অভাবনীয় দক্ষতায় চলে গিয়েছেন পল রবসনে –
“বস্তুত, পল রবসন তাঁর বিখ্যাত গান ‘ওল্ড ম্যান রিভার’-এ ঠিক এরকম পরিবর্তনই করেছিলেন। মূল গানের ঝোঁক ছিল প্রবহমান বিষণ্ণতায়। রবসনের বিস্তৃত আলোচনায় দেখানো যেতে পারে, কয়েকটি শব্দ পাল্টে নিয়ে সমস্ত গানটির অভিমুখ বদল করে দিলেন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার প্রতি। দেবব্রত এই সত্য জানতেন, ঋত্বিক জানতেন আইপিটিএ ও মার্ক্সবাদী সংস্কৃতির মলাট।”
ঘর থেকে বাইরে, আমাদের কলকাতার কুঁয়োতলা থেকে পশ্চিমে যাতায়াত প্রতি পদেই – একটি নিবন্ধ তো সরাসরি বব ডিলানকে নিয়েই – বাঙালির ডিলান চর্চা। আবার তার ঠিক আগেরটিই সলিল চৌধুরীকে নিয়ে – আগুন, রজনীগন্ধা ও সলিল চৌধুরী। আর সেইখানেও পুবপশ্চিম মিলেমিশে একাকার। সলিল চৌধুরীর “যারে, যারে উড়ে যারে পাখি” গানখানা নিয়ে বলতে বসে বলেন –
“বিটোফেন বিষয়ে তাঁর অসামান্য দার্শনিক বক্তব্য পেশ করার সময় জার্মান পণ্ডিত ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অন্যতম সারথি থিওডোর আডোর্নো তাঁরই সহকর্মী ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন, দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে উদ্ধার করে, এমন গানও আছে যা পাখিদের ভাষাকে নশ্বরতার হাত থেকে রক্ষা করে। সলিল চৌধুরীর মহত্ত্ব এখানেই যে তিনি উড়ন্ত পাখির যাত্রামুহূর্তকে গানে চিরদিনের করে রাখলেন।”
এবং লেখা শেষ হয় এইভাবে –
“সলিল জানতেন, জীবনানন্দের মতোই জানতেন, বন্ধু ঋত্বিকের মতোই জানতেন, হয়ত একদিন সমস্ত চরাচরের সমস্ত জীবের হৃদয়ে মৃত্যুহীন স্বর্ণগর্ভ ফসলের খেতে বুননের জন্য তাঁর ডাক পড়বে। আমাদের সুরের আকাশে যখন আগুন, তখন তো সলিল চৌধুরী, এমনকি মাটিতে যখন রজনীগন্ধা, তখনও।”
গানের জগতের পাঁচ দিকপাল – দেবব্রত বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র এবং বব ডিলান – তাঁদের গান, তাঁদের শিল্পযাপন এবং তাঁদের ঘিরে বাঙালির সামগ্রিক শিল্পযাপন ধরতে চেয়েছেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। উচ্চাকাঙ্খী প্রয়াস নিঃসন্দেহে – হয়ত সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা লেখকের তরফে ততখানি নয় – বিভিন্নসময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত পাঁচখানা নিবন্ধ আপাত-সম্পর্কহীন, কিন্তু, মূল সুর অবশ্যই আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির এক টুকরো ইতিহাস – এবং, মগ্ন পাঠকের পক্ষে এর মধ্যে অন্তত দুটি নিবন্ধ (দেবব্রত-ঋত্বিক ও সলিল চৌধুরী) কীভাবে গান, বা বৃহত্তর অর্থে শিল্প, পড়া যেতে পারে, তার প্রশিক্ষণ।
পড়তে পড়তে হতাশাও জাগে। ঠিক কী কী দিকপালেরা আমাদের সংস্কৃতির আকাশে তারকা হয়ে বিরাজ করেছেন – আর সেখান থেকে কত অবলীলায় আমরা এসে পৌঁছেছি এই মধ্যমেধা ও পুনরাবৃত্তির বর্তমানে – না, এ কোনো অতীতচারী দীর্ঘশ্বাস নয়, সিরিয়াসলি ভাবুন, বর্তমান প্রজন্ম কি তেমন করে মগ্ন হতে পারলেন দেবব্রত বিশ্বাসের গভীরে – দেবব্রত-সলিলকে ধরতে গিয়ে সঞ্জয়বাবু পৌঁছেছেন কখনও পল রবসন, কখনও বাখ-মেনডেলসন কিম্বা মোৎসার্ট বা বিটোফেনে – সেই অবগাহন, মেধার এই ব্যাপ্তি, ইদানীং, কতটুকু?
রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গানকে কত অনায়াসে রাজনৈতিক গানে পরিণত করতে পেরেছিলেন দেবব্রত। না, তার জন্যে তাঁকে বহিরঙ্গে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে হয়নি – স্থানকালপাত্র বিশেষে কিম্বা পরিবেশ অনুসারে গায়কীর ফারাক বা গানের উচ্চারণই যথেষ্ট ছিল। আজ অবশ্য আমাদের কাছে বহিরঙ্গই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। গায়ক দাঁড়িয়ে গাইবেন না বসে, ধুতি পরবেন না জিনস, গায়িকা খোলা চুলে হাতে কর্ডলেস নেবেন নাকি হারমোনিয়াম, অনুষঙ্গে থাকবে এসরাজ নাকি গিটার, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ‘যুগোপযোগী’ করতে ‘উলালা’ জরুরি নাকি নয় – এই তর্কে মজে থাকতে চাইলে এই বই আপনার না পড়লেও চলে।
আদতে শিল্প-সংস্কৃতি, সে যে আঙ্গিকেই হোক না কেন, এক অবগাহন – এক নিরন্তর যাপন। সেই অতলের স্পর্শ পেতে হলেও, অবগাহন জরুরি। স্বতঃস্ফূর্ততা শিল্পের ক্ষেত্রে সম্পদ কিনা জানি না – তবে, অবগাহন আর মেধাবী চর্চা ছাড়া কোনো শিল্পই কি শিল্প হয়ে ওঠে?
“যাঁরা আজ গাইছেন আর ভাবছেন গয়না বদল করলেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের রাজকন্যা পালঙ্ক থেকে জেগে উঠবে। তাঁরা বুঝতে পারেন না সুচিত্রা মিত্রের সরস্বতীবন্দনা এত পলকা নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন, বাঙালির ঘামে, শোকে, রোজনামচায়। বর্ষার আঘাতে আর রৌদ্রের ধিক্কারে যা কিছু স্বতঃস্ফূর্ত তা শিল্প নয়।”
বই- পাঁচ মাথার মোড় | লেখক- সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় | প্রকাশক- গুরুচণ্ডা৯
