বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ভাবিয়েছিল নয় বছর বয়সী কবি সায়ন মিত্রকে

প্রয়াত শিশুকবি সায়ন মিত্রের কবিতার বই ‘সবার মাঝে আমি’ পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলায় পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস-এর স্টলে

সায়নের জন্ম ১৯৮৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। বসন্তের সবটুকু উপকরণ ছিল তাঁর চলার সঙ্গী। সামান্য একটা যুগ, তারপর সবার মন জয় করে, কাউকে কিচ্ছু বুঝতে না দিয়ে, একদিনের সামান্য জ্বরে চলে গিয়েছিল সায়ন। সেদিন ছিল সরস্বতী পুজোর ভাসান। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই শুরু হয় ছবি আঁকা। যেকোনো গান শুনলেই গুণগুণ করে সুর তুলত। প্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম একটি –‘অরূপ তোমার বাণী’। সাত বছর বয়স থেকে সায়ন কবিতা ও ডায়েরি লিখতে শুরু করে। পাশাপাশি ইতিহাস পড়া আর মানুষ-প্রকৃতিকে নিয়ে বিভিন্নভাবে ভেবে যাওয়া ছিল তাঁর সারাদিনের কাজ। বাবা-মা’র কাছে সায়নের প্রশ্ন থাকত – জীবনের পরে কী আছে! এই উজ্জ্বল ছেলেটির দুর্দান্ত সব লেখা আর ছবিতে ভরাট এক পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয়েছে সদ্য। বইটির নাম ‘সবার মাঝে আমি’ (Sabar Majhe Ami)। প্রকাশক পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস (PandM Communications)।

সায়ন মিত্রের কথা যখন লিখছি, বারবার বাংলা সাহিত্যের দিকে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। মনে পড়ছে ‘কিশোর কবি’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের (Sukanta Bhattacharjee) কথা। সুকান্তের বিদ্রোহাত্মক লেখনী বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের সম্পদ। কিন্তু তাঁর বেশিদিন বেঁচে থাকতে না পারার শূন্যস্থান আজও সাহিত্যের পাতা কুরেকুরে খায়। সায়নের কথা কি কেউ জানে? সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো সায়ন শুধুমাত্র বিদ্রোহে থেমে নেই। সায়নের তুমুলভাবে বেঁচে থাকার পৃথিবীতে আছে প্রকৃতি, ছড়া, ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা আর বিচিত্র সব রচনা। এই বইয়ের ক্রমন্যাসও সাজানো হয়েছে সেইভাবে। 

হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নিয়ে তৎকালীন দেশের পরিস্থিতি সায়নকে ভাবিয়েছিল। তাঁকে কলম ধরিয়েছিল। তিনি শুধু নিজের জন্য বা পরিচিতদের জন্য কথা বলছেন না, সায়ন সোচ্চার হচ্ছেন দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জন্য, প্রত্যেকটি মানুষের হয়ে।

১৯৯২ সালের অক্টোবর মাসে অর্থাৎ বাবরি মসজিদ (Babri Mosque) ধ্বংসের ঠিক দুই মাস আগে দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি সায়নকে ভাবিয়েছিল। সায়ন লিখছেন, “মসজিদ, মন্দির দুই কথা! মানুষ?/ ধর্ম নিয়ে বর্ম পরে কর্ম কর।/ এই যদি তাদের দীক্ষা, কী তাদের শিক্ষা?/ একই আছে জাতি মানুষ।” – আশ্চর্যরকমভাবে গায়ে কাঁটা দেওয়া একটি লেখা। এইসময় সায়নের বয়স নয় থেকে এগারো বছর। এত অল্প বয়সে যে ছেলেটি দেশের ধর্ম নিয়ে দাঙ্গার কথা ভেবেছিলেন, আজ সমাজের এক অংশের মানুষরা তা ভাবতে পারছে না! সাম্প্রতিক সময়েও কী প্রাসঙ্গিক এই লেখা। পাশাপাশি আরও একটি লেখার উদাহরণ দেওয়া যাক। ‘ভেদাভেদ’ নামের একটি লেখায় সায়ন লিখছেন, “ক্রিশ্চান, মুসলিম, হিন্দু সবাই একজাতি/ এসো ভাই আমরা করি কেন হাতাহাতি,/ হিন্দুরা করে ধর্ম নিয়ে মারামারি/ মুসলমান বর্ম পরে করে বাড়াবাড়ি/ অন্ধকূপে বন্ধ হয়ে আমরা করি হাতাহাতি/ এসো ভাই, আমরা সবাই এক জাতি।” – কী অসামান্য এক একটি লাইন। কবিতার আবহে যদি একটু চোখ দেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে, এই কবিতাটি লেখা হচ্ছে ১৯৯২ সালের ২৬ ডিসেম্বর। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কয়েকদিন পর। হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নিয়ে তৎকালীন দেশের পরিস্থিতি সায়নকে ভাবিয়েছিল। তাঁকে কলম ধরিয়েছিল। তিনি শুধু নিজের জন্য বা পরিচিতদের জন্য কথা বলছেন না, সায়ন সোচ্চার হচ্ছেন দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জন্য, প্রত্যেকটি মানুষের হয়ে।

সায়ন মিত্রের (Sayan Mitra) লেখা প্রসঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Subhash Mukhopadhyay) ১৯৯৫ সালে লিখেছিলেন, “সায়ন যা লিখেছে, তাতেই বোঝা যায়, বড় হওয়ার সব সম্ভাবনাই তার মধ্যে ছিল। রূপ রস গন্ধ স্পর্শ দিয়ে নিকট দূরের সব কিছুকে সে নিজের করে নিয়েছিল। শব্দ আর ছন্দকে সবে সে মুঠোয় আনতে শিখছিল।” সুপ্রিয় ঠাকুর শান্তিনিকেতন থেকে ১৯৯৫ সালের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “এই অল্প বয়সে, পৃথিবীর প্রতি, জীবনের প্রতি, বিশেষত মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা সে পেল কী করে!…”

“যে চলে যায় সে চলে যায়, সে আর ফিরে আসে না কোনোদিন। কিন্তু মানুষের এক ফোঁটা চোখের জলের দাম দিতে পারে না কেউ। এমনকি মৃত্যুও হার মানে তার কাছে।”

সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) মতো চলচ্চিত্র নির্মাতা যে সায়নের প্রিয় ছিল তা তিনি একটি লেখায় বুঝিয়েছেন। সত্যজিতের শেষযাত্রার প্রাক্কালে সায়ন লিখছেন, “সত্যজিৎ রায়/ শেষ যাত্রায় যায়/ রাস্তা দিয়ে ছোটে লোক/ সত্যজিৎ সত্যজয়ী হোক।/ সত্যজিতের অনেক গল্প মানুষের জানা/ রবীন্দ্রনাথের পর সে একটা মুক্তদানা/ শুয়ে আছেন সত্যজিৎ নন্দনে/ চলে গেল সে মানুষকে ভাসিয়ে দিয়ে ক্রন্দনে।” – বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর সত্যজিৎ রায়কে এক আসনে বসিয়েছিলেন সায়ন। তাই তাঁদের প্রতি তাঁর এই নিবেদন। শুধু তাই নয়, চ্যাপলিন, নেতাজি, ইন্দিরা গান্ধি প্রমুখদের নিয়েও একের পর এক লেখা লিখেছেন।

এই বইয়ের পঞ্চম সংস্করণ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা বইমেলায়। যেটি পাওয়া যাচ্ছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হলের H-21 স্টলে (পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস এবং বঙ্গদর্শন)।

এই বইয়ে কবিতা/ ছড়ার পাশাপাশি আছে কিছু গদ্যও। যেখানে জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে মানুষ বেঁচে থাকে ভালোবাসায়। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সায়ন লিখছেন, “যে চলে যায় সে চলে যায়, সে আর ফিরে আসে না কোনোদিন। কিন্তু মানুষের এক ফোঁটা চোখের জলের দাম দিতে পারে না কেউ। এমনকি মৃত্যুও হার মানে তার কাছে।”

শারীরিকভাবে সায়ন আর নেই, কিন্তু তাঁর এই অসামান্য বইটি আছে পাঠকদের জন্য। ১৯৯৫ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর এই বইয়ের পঞ্চম সংস্করণ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা বইমেলায় (Kolkata International Book Fair)। যেটি পাওয়া যাচ্ছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হলের H-21 স্টলে (পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস এবং বঙ্গদর্শন)। বইয়ে সায়নের লেখার পাশাপাশি রয়েছে তাঁর লেখা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি। লিখেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয় ঠাকুর, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এবং মাদার টেরেসা। এই বই পৌঁছে যাক পাঠকদের হাতে। কলকাতা বইমেলা ছাড়াও বইটি পাবেন অনলাইনেও। দ্য বেঙ্গল স্টোর (The Bengal Store) থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকে। 

সবার মাঝে আমি | কবি- সায়ন মিত্র | পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস | মুদ্রিত মূল্য- ১৫০ টাকা।

Developed by DXDasia