‘বিষ্ণুপুরী ঢং’ ও তার চরিত্র

এই ঘরের শিল্পীরা সমস্ত ঘরের বাদ্য বাদন ও সঙ্গীত চর্চা সম্পর্কে অবগত ছিলেন

দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
দীর্ঘ একটা সময়কাল ধরে বিষ্ণুপুর ঘরানার নিজস্ব পরম্পরা নির্মাণ হয়েছিল। একেবারে পূর্বে ঘরানা শব্দটির বদলে বলা হত ‘বিষ্ণুপুরী ঢং’। পরে সেটি ঘরানায় বদল হয়। এই পরম্পরার যে সময় সারণী সামগ্রিক ভাবে আমরা বুঝতে পারলাম তা হল আঠারো শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। বলতে গেলে দুশো বছরেরও বেশি কিছু সময়কাল ধরে এই ঘরানা বিস্তার লাভ করেছে। কেবল মাত্র সঙ্গীতেই নয়, বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও এই কথাটাই বলা যায়। এবং খুব গভীর ভাবে দেখলে বোঝা যাচ্ছে যে কোনও সঙ্গীত গুণীই কিন্তু সারেঙ্গি নামক যন্ত্র বাজাতেন বলে দেখা যাচ্ছে না। এবং প্রায় সকল সঙ্গীতগুণীই কিন্তু এক সঙ্গে একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। সমীক্ষার সময় গোকুল নাগের পৌত্রী এবং মনিলাল নাগের কন্যা শ্রীমতী মিতা নাগ জানালেন এই ঘরানায় বাদ্যযন্ত্র শেখার আগে প্রত্যেককে ধ্রুপদ সঙ্গীত জেনে তবেই বাদ্যযন্ত্রে তালিম নিতে হয়। মিতা নাগের থেকে আরও জানা যায়, সেতারে ধ্রুপদের বোল বাণীর চলন সহজেই অনুধাবন করতে পারা যায়। তা ছাড়া প্রত্যেক সময়েই দেখা গিয়েছে বিষ্ণুপুর ঘরের শিল্পীরা সমস্ত ঘরের বাদ্য বাদন ও সঙ্গীত চর্চা সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। কাল সীমানায় ফেলে দেখা যায় যে এটা প্রায় পাঁচটি জেনারেশন বা পরিবার ক্রমে লালিত হয়ে আসা একটি ঘরানা। যার নিজস্বতা রয়েছে সঙ্গীত চর্চার সর্ব ক্ষেত্রে। রামশঙ্কর ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের মিতা নাগ পর্যন্ত শুধু একটা দীর্ঘ যাত্রা পথই নয় একই সাথে আবার পরবর্তী পরিবার শাখা বা জেনারেশনও কিন্তু তৈরি হয়ে চলেছে। কারণ বিষ্ণুপুরের রামশরণ সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গীতগুণীদের কাছেও তালিম নিচ্ছে বহু তরুণ প্রজন্ম শুধু নয় সেই সঙ্গে অল্প বয়সের শিশুরাও। ফলে এই চর্চা চলছে এটা ঠিক কথা হলেও ঘরানার সঠিক অবয়ব অনুসন্ধান আজও সেই ভাবে করে ওঠা হয়নি। 

 

রবীন্দ্রনাথ গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে লিখেছেন – ‘গোপেশ্বর বাবুর গানের স্টাইলটা বিষ্ণুপুরী বলে কেউ কেউ তাঁর ওস্তাদিকে কলঙ্ক আরোপ করে থাকেন। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে দেখা যায় প্রদেশ ভেদে সাহিত্যের স্বাভাবিক রীতি ভেদ স্বীকার করা হয়েছে। বৈদর্ভী রীতি, গৌড়ীয় রীতি, প্রভৃতি রীতির বিশিষ্টতা তিরস্কৃত হয়নি। ভারতীয় স্থাপত্যের সঙ্গে উড়িষ্যার ও উত্তর ভারতের অনেক পার্থক্য। মাদুরার মন্দির রচনায় স্থাপত্য পদে পদে যে তান লাগিয়েছে তার অংশে অংশে অলংকার বৈচিত্রের যে অতি বাহুল্য তা কারো ভালো লাগে না। তার সঙ্গে সেকেন্দ্রার স্থাপত্যের তানবিহীনতা ও অলংকার বিরলতার তুলনা করলেই সেকেন্দ্রাকেই কারো কারো রুচিতে ভালো ঠেকে। তবুও ভারতীয় স্থাপত্যে দক্ষিণী  রীতিকে অস্বীকার করা চলে না। তেমনই হিন্দুস্থানী গান বাংলাদেশে যদি কোনও রীতি অবলম্বন করে থাকে তবে তার স্বাতন্ত্র্য মেনে নিতে হবে। সেই রীতির মধ্যেও যে কোনও উৎকর্ষের স্থান নেই তা বলা চলে না। যদু ভট্টের প্রতিভার প্রধান ভূমিকা বিষ্ণুপুরী রীতিতেই, রাধিকা গোস্বামী সম্বন্ধেও সেই কথা বলা চলে। পশ্চিমদেশী শ্রোতারা যদি এই রীতির গান পছন্দ নাও করে, তবে সেটাকেই চরম বলে মেনে নেওয়া চলে না।’ এরকম কথা থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বিষ্ণুপুর ঘরানা সাফল্যের সঙ্গে তার নিজস্ব চরিত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও পণ্ডিতদের মধ্যে এই নিয়ে তখনও দ্বিমত ছিল। যে দ্বিমতের আভাস আমরা পেলাম রবীন্দ্রনাথের লেখা বা বলা থেকেও। বর্তমানে সেই দ্বিমতের আর কোনও অবকাশ আমরা রাখতে চাই না কারণ একাধিক স্তর থেকে বারে বারেই আমাদের চোখে পড়েছে একটা ঘরানার যে অবয়বগত গঠন স্থাপত্য তা নির্মাণ করতে গেলে যে ধরণের বিজ্ঞান ভিত্তিক পদক্ষেপ দরকার হয় বিষ্ণুপুর সেই সব পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে।

Developed by DXDasia