বিষ্ণুপুর ঘরানার পত্রিকা ‘সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা’

কিংবদন্তী রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী ১৩৩০ সালে প্রকাশ করেন এটি

দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
এই বাংলায় বিষ্ণুপুর শুধুমাত্র মল্লরাজাদের রাজ্যভূমি নয়, একই সঙ্গে একটি প্রাচীন সঙ্গীত জনপদও। বিষ্ণুপুর রাজাদের আন্তরিক উৎসাহ থেকে এই ঘরানা কোনোদিন বঞ্চিত হয়নি। এবং এই ঘরানার শিল্পীরাও নিজেরা নানা ধরণের সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছিলেন। এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আরও নানা দিকে বিস্তৃত করেছিলেন।

বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপ্রতিম পুরুষ রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী বাংলা তেরশ তিরিশ ;সালে ‘সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। সারা ভারতের সঙ্গীত ও সঙ্গীত প্রভাকরদের নিয়ে এখানে আলোচনার অবকাশ থাকত। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক সংখ্যার শুরুতে কারও একজনের লেখা গান বা কবিতা দিয়েও শুরু হত সে মাসের পত্রিকা। যেমন আমরা দেখতে পাচ্ছি বৈশাখ ১৩৩৮ সংখ্যার প্রথম প্রকাশে নরেশ্বর ভট্টাচার্য-লিখিত কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে সেই সংখ্যা। একটা ঘরানা নিজেই নিজের পরিচয় ও সামাজিক কর্তব্যের পরিচয় ধরে রাখছে এই পত্রিকার মাধ্যমে। এবং সঙ্গীত সমাজের সকলের কাছে যাতে এই পত্রিকার পরিচয় পৌঁছে যায় তাই নিয়ম করে সেখানে দেওয়া হত বিজ্ঞাপন।

সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকার মতো সম্পূর্ণ গান নির্ভর একটি পত্রিকাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়ে আরও কিছু পরিকল্পনা করেছিলেন গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দায়িত্ববান সম্পাদকেরা। যে কারণে আমাদের চোখে পড়ে প্রত্যেক সংখ্যার শুরুতে কারও একজনের লেখা গান বা কবিতা দিয়েও শুরু হত সে মাসের পত্রিকা। যেমন আমরা দেখতে পাচ্ছি বৈশাখ ১৩৩৮ সংখ্যার প্রথম প্রকাশে নরেশ্বর ভট্টাচার্য- লিখিত কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে সেই সংখ্যা। সঙ্গে সুচিত্রিত ছবি। ধারণা করা যায় এই ছবির নির্মাতা ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। এই চিত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ছবি বলতে চায় রাখালের বাঁশির মধ্যে থেকে যে সুর বাহিত হয় সেই সুরের ধারায় অতি বড় বন্য পশুও শান্তভাবে বিচরণ করে। সঙ্গীতের এই ধারার বিজ্ঞান ভিত্তিক যে প্রয়োগ যেখানে বলা হয় অস্থির চঞ্চল হিংস্রতাকেও সঙ্গীতের সুর শান্ত করতে পারে এবং সঙ্গীতের সুর প্রবেশ করলে মনের ভেতর থেকে এই ভাবগুলি দূরীভূত হয়।

একটা ঘরানা দাঁড়িয়ে থাকে তার নিজের বহুমুখী সৃজনশীলতার ওপরে। যেমন বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পীরা নিজেরা গান লিখতেন এবং নিজেরা সেই গানের সুরও দিতেন। এই যে গান লেখার চর্চা করা বা তাকে আবার সুরারোপিত করা এসবের মধ্যে দিয়েই একটা ঘরানার নিজস্ব অবয়ব রচনা হতে থাকে। যে কারণে একই সাথে আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি বিষ্ণুপুর ঘরের শিল্পী গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে গান লিখে তার আবার ভনিতাও দিয়ে গিয়েছেন গানে। এমন ভনিতার উদাহরণ উত্তর প্রদেশের অনেক ঘরানাতেই মেলে। যেমন শরি মিয়াঁর টপ্পাতে আমরা এমন ভনিতার উপস্থাপনা পাই।

বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী ও প্রবক্তারা যে নিয়মিত বিভিন্ন রাগ রাগিণী-র মধ্যে নিজেদের ঘরানার পরিচয়কে ধরে রাখার জন্যে নিজেদের মতো করে স্বরলিপি তৈরি করতেন তারও অনেকটা হদিশ মেলে ‘সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা’র পাতায় পাতায়। যেমন ইমন-তেতালার স্বরলিপি করছেন গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই সব কাজই হচ্ছে টাটকা বাংলা ভাষায়। হিন্দি ভাষা নির্ভর সঙ্গীতও এখানে ছাপা হয়েছে বাংলা ভাষায়। তাই বলতেই হয়, বাংলার বুকে বাংলার নিজের ঘরানাকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে যে ধরণের পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা দরকার তার সবটাই করেছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরের শিল্পীরা। বাংলার বুকে তাঁরা চিন্তা করেছিলেন কীভাবে সঙ্গীতকে ভাবাশ্রয়ী রেখেও তার বিজ্ঞানভিত্তিক দিকগুলিকে যথা সম্ভব রক্ষা করা যায়। তাই এমন পত্রিকার নাম হয়েছিল ‘সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা’। এর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক ছিল অটুট। এই উদ্যোগগুলি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, বিষ্ণুপুর ঘরের সঙ্গীত গুণীরা নিজেদের পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর, অন্য মাধ্যম বাহিত করার জন্য বিজ্ঞান ভিত্তিক গবেষণার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাই আজ সব দিক বিচার করে একটা কথা আমরা বলতেই পারি যে, বিষ্ণুপুর ঘরানা হল বাংলার একমাত্র নিজস্ব ঘরানা। যে ঘরানা আরও দীর্ঘ দিন তার আত্ম পরিচয় যে বহন করে চলবে এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

Developed by DXDasia