বাঙালির থুতু স্বাধীনতা এবং রাজ্যের পিক-চার

থুতু-পিকের পিক-ইউলিয়ার প্রবলেম

অনেক হয়েছে। এবার রাজ্যের পিক-চারটাই বদলে দিতে উদ্যোগী হল সরকার। একজন মুখ্যমন্ত্রীকে পুলিশ প্রশাসনের বড়কর্তাদের সঙ্গে যখন থুতু, পিক নিয়ে বৈঠক করতে হয়, বোঝা যায়, অসুখ কত গভীরে। এর পর থেকে রাস্তায়, অফিসে, সেতুতে, হাসপাতালে থুথু ফেললে জরিমানা দিতে হবে। আইন খতিয়ে দেখছে সরকার। মঙ্গলবার এই নিয়ে নবান্নে বৈঠক হয়েছে।

অন্যদের কথা অন্য কখনও বলা যাবে। কিন্তু বাঙালির এই থুতু-স্বাধীনতার বয়স অনেক হল। অর্জিত স্বাধীনতা লড়াকু বাঙালি সহজে ছাড়তে চায় না। দক্ষিণেশ্বরের স্কাইওয়াক পিকে রাঙিয়ে দিয়ে তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই বাঙালি দিয়েছে। কিন্তু মুসকিল হল, পুলিশের স্বাধীনতাবোধ কিছু কম থাকায় পুলিশ সেটা মানতে চাইছে না। স্কাইওয়াকে নাকি যার থুতু যার পিক, তার থুতু তার পিক তাদের তাদের দিয়েই ধোয়ানো হয়েছে। বাঙালির থুতুস্বাধীনতার ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা।

থুতু নিয়ে আমরা কত কথাই না বলি। আকাশে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়ে। তা পড়ে তো পড়ে সে আমি বুঝব। সরকারের কী! তার পর যেমন আমরা বলি, হার মেনে এখন লোকটা নিজের থুতু নিজে চাটছে। তার মানেই প্রমাণ হল, সব সময় বাঙালি থুতু ফেলে না, মাঝে মধ্যে চেটে পরিষ্কারও করে। এই ভাল দিকটা কেউ দেখছে না। যখন বলা হয়, লোকটার কাজ-কম্ম দেখে লোকে থুতু দিচ্ছে, থুতু ফেলা নিষিদ্ধ হলে থুতু দেওয়া নিষিদ্ধ হতে কতক্ষণ! এ তো ভাষার উপর খবরদারি!  থুতু আমাদের কত কাজে লাগে! থুতু দিয়ে কেউ ডাকটিকিট লাগায়, কেউ বইয়ের পাতা উলটায়, কেউ আবার থুতু দিয়ে টাকা গোনে। থুতুকে যত ছোটো করে দেখা হচ্ছে থুতু মোটেই তত ছোটো নয়। থুতু আমাদের সাহিত্যেও আছে। সুকুমার ‘বুড়ির বাড়ি’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কাঁটা দিয়ে আঁটা ঘর- আঠা দিয়ে সেঁটে/ সুতো দিয়ে বেঁধে রাখে থুতু দিয়ে চেটে।’

বোঝাই যাচ্ছে বাঙালির থুতু-ইতিহাস মোটেই ফেলনা নয়। এবার দেখা যাক, রাস্তা-ঘাটে থুতু ফেলা বন্ধ হলে কী কী হতে পারে। প্রথমেই যেটা বলার পিকদান-এর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠবে। সবাই তো আর এক রকমের পিকদান নেবে না, গন্নি-মান্নিরা কেউ টেরাকোটার পিকদান, কেউ রুপোর, কেউ স্টিলের, কারও আবার প্রয়োজন মুক্তো বসানো, কারও দলের প্রতীক আঁকা। পিকদানে নাম লেখা থাকবে কি না এখনই বলা মুসকিল। তবে থাকলে ভালো। যেমন, বিভিন্ন আন্দোলনে লাঠি-ফাটি চললে পরে দেখা যায় অনেক চটি, জুতো এদিক ওদিক পড়ে আছে। নতুন নিয়মে প্রচুর পিকদানও পড়ে থাকবে। পালানোর সময় তো আর পিকদান হাতে নিয়ে দৌড়ানো যাবে না, পুলিশ ধরে ফেলতে পারে। ফলে নাম লেখা থাকলে পরে যার যার পিকদান সে সে থানা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে পিকদানের চাহিদা খুব বেড়ে গেলে শস্তা চাইনিজ পিকদানে বাজার ছেয়ে যেতে পারে। সরকার যদি চাইনিজ পিকদানের উপর বাড়তি আমদানি শুল্ক না বসায়, দেশীয় পিকদান শিল্প মার খেতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে আগে থেকে সাবধান থাকাই ভালো।

আরও একটা সমস্যা আছে। হাতে পিকদান নিয়ে যারা বাসে উঠবে, তারা নিশ্চয়ই নিজের নিজের পিকদান সামলিয়ে রাখবেন। বাসে হয়তো লেখাও থাকবে, ‘নিজের পিকদান নিজ দায়িত্বে রাখুন’। কিন্তু কথা হল ঝাঁকি, ভিড়, ধাক্কাধাক্কিতে এক আধটা পিকদান তো উল্টে যাবেই। তাতে অফিস যাওয়ার জামা কাপড়ে লাল দাগ লাগবে। ‘লাগা চুনড়িমে দাগ’ বলে গান গেয়ে তো আর অফিস কামাই করা যাবে না। ওই নিয়েই অফিস করতে হবে। গায়ে অন্যের পিকের দাগ নিয়ে অফিস করা, পাশের লোটাই বা কী ভাববে! তাহলে কি বাসের গতি কমিয়ে দেওয়া হবে? পরিবহণ দফতরের এক কর্তাকে এই নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে তিনি খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বললেন, পিক-ইউলিয়ার প্রবলেম…ভাবতে হবে!

Developed by DXDasia