ঝোপ বুঝে কোপ : ভাষা, সাহিত্য ও প্রবাদের রূপান্তর

প্রবাদবাক্যের পরম্পরা : প্রথম পর্ব

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (Evolutionary Biology) বা জীবাশ্ম বিজ্ঞান (Paleontology)-এ ‘মিসিং লিঙ্ক’ বলে একটি ব্যাপার রয়েছে। এর সংজ্ঞা করতে গেলে বলা যেতে পারে — এটি এমন একধরনের জীবাশ্ম বা জীবকে বোঝায়, যা দুটি ভিন্ন প্রজাতি বা পর্বের (Phylum) প্রাণীর মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এটি বিবর্তনের ধারায় এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়।

উদাহরণ হিসেবে যদি আর্কিওপ্টেরিক্স (Archaeopteryx)-কে ধরা হয়, তাহলে দেখা ও জানা যাবে যে, এটির মধ্যে সরীসৃপ (ডাইনোসর) এবং পাখির মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এই যে প্রবাদ-প্রবচন, তার শব্দ এবং ভাবনাগুলি যদি একটু ভেবে দেখা বা শোনা যায়, তাহলে খুব সহজেই বোঝা যাবে যে, এর মধ্যে বিরাট একটি বা একাধিক সময়বৃত্তের উপস্থিতি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভাষা, সাহিত্য এবং বিবর্তনের সদা বহমান এক ধারা।

এবার কথা হচ্ছে, শিরোনামে যা লেখা রয়েছে, তার সঙ্গে এই জীবাশ্মবিদ্যা ও তার তত্ত্বকে জুড়ে দেখার কারণ কী? আসলে, এই যে প্রবাদ-প্রবচন, তার শব্দ এবং ভাবনাগুলি যদি একটু ভেবে দেখা বা শোনা যায়, তাহলে খুব সহজেই বোঝা যাবে যে, এর মধ্যে বিরাট একটি বা একাধিক সময়বৃত্তের উপস্থিতি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভাষা, সাহিত্য এবং বিবর্তনের সদা বহমান এক ধারা। আর এখানেই ওই ‘মিসিংলিঙ্ক’-এর সঙ্গে একটি সমান্তরাল ভাবনা এবং তার সমবায় খুঁজে পাওয়া যাবে। হয়তো যা, তা প্রকৃত অর্থে নয়, তবুও যা, তা এক জীবিত সংযোগ সূত্র হিসেবে কাজ করে চলছেই।

আমাদের এই বাংলা ভাষায় শহর থেকে গ্রাম, দ্বীপাঞ্চল থেকে শিল্পায়নের ছোঁয়া-লাগা বৃহদঞ্চল, প্রান্ত থেকে কেন্দ্র, এক উপভাষা থেকে অন্য উপভাষা, সর্বক্ষেত্রে এইসব প্রবাদ-প্রবচনের অক্ষয় হাওয়া বয়ে যায়। কোথাও কোথাও জনভেদে নতুন এবং নিজস্ব প্রবাদেরও জন্ম হয়েছে। কিন্তু ওই যে, সবার সূত্র কিন্তু একটা জায়গায় বাঁধা হয়ে ঠিক রয়ে গেছে।

হয়তো স্থানাভাবের কারণে অনেক সংখ্যায় এমন প্রবাদ-প্রবচনের উল্লেখ ও আলোচনা করা সম্ভব না-ও হতে পারে, সেক্ষেত্রে অগ্রিম মার্জনা চেয়ে রাখাই বাঞ্ছনীয়। প্রবাদ নিজে সাহিত্য, সাহিত্য নয়ও, আবার সাহিত্যের পূর্ববর্তী ও যথাক্রমে পরবর্তী নানান বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তারও চেয়ে বেশি যা লালনপালন করে, তা হল মৌখিক পরম্পরা। ‘সাহিত্য’ বলতে যা বোঝায়, তা ভাষা-শব্দ-প্রকরণ-উচ্চারণে ভঙ্গি, নানান বাহুল্য, তার মধ্য দিয়ে ঘটনার বর্ণনা এবং বহুক্ষেত্রে কোনও বার্তা বা message, যা ‘moral’ কোনও কিছুর দিকে দিকনির্দেশ করে। এর মধ্যে আঞ্চলিক অবস্থান, পরিস্থিতি সবই উঠে আসে।

এই মৌখিক পরম্পরাই সুপ্রাচীন মানবসভ্যতার ধারাবিবরণ করে যায়। কেননা, লিখিত সাহিত্যের আয়ু মৌখিক পরম্পরার তুলনায় নেহাতই সামান্য। যদি সারা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে, প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলে সবার প্রথমে মৌখিক ধারার স্তর হিসেবে প্রবাদের অস্তিত্ব। সুমহান ঐতিহ্য, গরিমার জীবন্ত সাক্ষর ভারতবর্ষের বেদ, সে-ও কত কত বছর ধরে মৌখিকভাবেই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় টিকে ছিল। যা শুনে-শুনে মনে রাখতে হত। এই কারণে বেদ-এর অপর নাম ‘শ্রুতি’। সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার যে সকল সাহিত্য রয়েছে, তাতে অসংখ্য প্রবাদ ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে, প্রাচীনত্বের খুঁটিটি কতটা সুপ্রতিষ্ঠিত, তা বোঝাতে শব্দ ব্যয় না-করলেও চলে।

বাংলা ভাষার এমন কিছু প্রবাদ দেখে নেওয়া যাক – 
‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা’ – এই লাইনটি সবার পরিচিত এবং প্রায়শই ব্যবহার করে থাকি আমরা, যখন দেখি কেউ কোনও কিছু করতে ব্যর্থ হয়ে তার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে বা নিদেন পক্ষে নিজে তার থেকে অব্যাহতি চাইছে।

‘ঝোপ বুঝে কোপ মারো’ – এটি বলা হয় সঠিক সময়ে বা মোক্ষম সময়ে একটি কাজ করতে উদ্যত হওয়া বা কাজটি হাসিল করা বা সফল করা।

আপাতত এই দুটো প্রবাদ নিয়ে প্রথমের আলোচনাটি সেরে নেওয়া যাক – 

ওপরের দুটি প্রবাদের যে tone, তা Lord John Russell প্রদত্ত proverb-এর সংজ্ঞাটিই বোধহয় সবচেয়ে সঠিকভাবে দিতে পারে; তা হল – “proverb is the wit of one, and the wisdom of many’’. অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ‘wit of the one’ এবং ‘wisdom of many’ শব্দবন্ধ দুটি। এহেন বাক্য যখন কথোপকথনের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সেই পরিস্থিতির তাৎপর্য অনুযায়ী সঠিক ব্যবহারে যেভাবে একজনের ‘wit’ প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনই তার গ্রহণযোগ্যতা বা সম্মতি বা সিদ্ধান্তও যদি বলা যায়, সেই অনুযায়ী ‘wisdom of many’ কথাটিও প্রতিষ্ঠা পায়।

‘ইঙ্গিতে পণ্ডিত বোঝে, মূর্খ বোঝে কিলে/ আর বাকি সব বোঝে চোখে আঙুল দিলে’; এ-প্রবাদ বাংলায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয় পরিস্থিতি অনুযায়ী; অন্যদিকে, এর হিন্দিরূপটিকেও উল্লেখ করা হচ্ছে – ‘সমঝদার কো ইশারা কাফি হ্যায়’ বা ইংরেজিতে ‘A nod is as good as a wink’ – খুব মজার এই বিভিন্ন ভাষায় এমন প্রবাদের ব্যবহার।

এবার মজা হচ্ছে এই – পরিস্থিতি এক কিন্তু তা বোঝাতে অভিব্যক্তি কিন্তু পাল্টে যায় ভাষা বা ভূখণ্ডের ভিত্তিতে। উদাহরণ হিসেবে যদি ওপরের প্রবাদটিকেই ধরা হয় এবং হিন্দিতে ভাবা হয়, তাহলে সেখানে শোনা যাবে ‘লোহা গরম হ্যায়, মার দে/দো হথৌড়া’ বলতে। এবার দুটোকে যদি মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, দুটোই কিন্তু ধাতব কোনওকিছুকেই নির্দেশ করছে। পার্থক্য এটুকুই – একটি ভাষায় ‘কোপ মারো’ কথা দুটি ব্যবহারের দ্বারা ধারালো কোনও কিছুকে বোঝাচ্ছে; সেটা ছুরি-তলোয়ার-দা-কাটারি-কে যেমন বোঝায়, তেমনি কোদাল, শাবলকে বোঝালেও বোঝাতে পারে। অন্যদিকে, উল্লিখিত আরেকটি ভাষা যখন ‘মার দে/দো হথৌড়া’ কথাটি বলছে, তার মানে বুঝে নিতে হচ্ছে সেটি প্রস্তুত তখনও হয়নি, বরং প্রস্তুত করা চলছে কামারশালায়। এরকম ভাবা হচ্ছে কেননা, যদি ধরে নেওয়া হয় একটি জিনিস প্রস্তুত হয়েই আছে বা গেছে, তার পরেও তার ওপর অকারণ আঘাত কেমন একটা পাগলামির মতো হয়ে যায়, তাই না? এই সুযোগে আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো – হিন্দির ক্ষেত্রে কিন্তু ‘হথৌড়া’ কথাটা যেহেতু ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে ভারি কিছু বানানোর ক্ষেত্রেই এই নির্দেশ, কেননা, যদিওবা ‘হথৌড়ি’ বলেও আরেকটি শব্দ পাওয়া যায় এই ভাষায় (যেখান থেকে বাংলায় ‘হাতুড়ি’ কথাটা এসেছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে), সেটি কিন্তু আকার-আকৃতিতে তুলনায় অনেকটা ছোটো এবং পেরেক জাতীয় হালকা কোনও কিছুকে আঘাত করার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। এর ইংরেজি এরকম – ‘As the wind blows, you must set your sail’. – এখন ‘chance’ বা ‘need of the hour’ বা ‘clarion call’ ধরনের বিষয়গুলি তো একই থাকছেই, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে কোথায়? না যখন দেখা যাচ্ছে একটি ভূখণ্ডের একাধিক ভাষায় একটি পরিস্থিতি বোঝাতে যখন ধাতব বস্তু বা তাকে কেন্দ্র করে ব্যবহৃত শব্দের প্রয়োগ, তখন অন্য একটি মহাদেশের অন্য একটি ভাষা সম্পূর্ণ বিপরীত শব্দ ও ভাবনা দিয়ে একই বিষয় ব্যক্ত করছে; মানে wind (বাতাস), sail (পাল – যা নৌকা বা সমুদ্রযাত্রার নির্দেশক) ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার।

‘ইঙ্গিতে পণ্ডিত বোঝে, মূর্খ বোঝে কিলে/ আর বাকি সব বোঝে চোখে আঙুল দিলে’; এ-প্রবাদ বাংলায় প্রায়শই ব্যবহৃত হয় পরিস্থিতি অনুযায়ী; অন্যদিকে, এর হিন্দিরূপটিকেও উল্লেখ করা হচ্ছে – ‘সমঝদার কো ইশারা কাফি হ্যায়’ বা ইংরেজিতে ‘A nod is as good as a wink’ – খুব মজার এই বিভিন্ন ভাষায় এমন প্রবাদের ব্যবহার। আমরা হিন্দি বা বাংলা ভাষাতে যখন দেখছি, তখন ‘সমঝদার’ বা ‘পণ্ডিত’ শব্দের দ্বারা বাক্যে কর্তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অন্যদিকে ইংরেজিতে কোনও কর্তার সরাসরি উল্লেখ নেই, কেবল ‘nod’ বা ‘wink’ জাতীয় শব্দের দ্বারা ‘ইঙ্গিত’ বা ‘ইশারা’-র মতো শব্দের অনুরূপ হয়ে gesture-কে বুঝিয়ে দিচ্ছে। যদিও, বাংলা ভাষা ‘পণ্ডিত’-‘মূর্খ’-‘আর বাকি সব’ কথাগুলি ব্যবহার করে মেধারও একটা শ্রেণীবিভাগ করে দিল। পণ্ডিত – উচ্চমেধার; কেননা, তিনি ইঙ্গিতমাত্র ভুল-ঠিক বুঝে যান; মূর্খ – নিম্নমেধার; এর কারণ হল যে এদের কিল-চড় না-দিলে এরা বুঝতে তো পারেই না, সঙ্গে মনেও রাখতে পারে না উক্ত বিষয়। অর্থাৎ, physical আর mental ability-র তুলনামূলক জায়গাটি কিন্তু চলে এল। ‘আর বাকি সব’ হল মধ্যমেধার পরিচায়ক, কেননা, তাদের বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা তো আছেই, কিন্তু সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরেই সম্ভব; মানে – না ওরা ‘পণ্ডিত’-এর মতো বুঝতে পারবে, না ওদের আবার বললেও ওদের বুঝতে পারবে না ‘মূর্খ’দের মতো তেমনটাও নয়, মাঝামাঝি আরকি। সেইসঙ্গে এই পঙ্ক্তিগুলিতে যে কী চমৎকার কাব্যিকতা এবং লিরিসিজম রয়েছে, সেটি কোনওভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

এমনই আরও বেশ কিছু প্রবাদ নিয়ে কিছু কথা, কিছু আলোচনা নিয়ে আলোচনা হবে পরের পর্বে।

Developed by DXDasia