বরাক উপত্যকায় প্রাণ দিয়েছিলেন কমলা ভট্টাচার্য
১৯৫২’র ভাষা শহিদদের আমরা ভুলিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ যে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিল, সেই রক্তের স্মৃতি তখনও স্তিমিত হয়ে যায়নি। নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বাঙালি তরুণ-তরুণীরা বারবার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দুকের নলের সামনে। সেটা কখনো বাংলাদেশ, কখনো বা বরাক উপত্যকা (Barak Valley)। একুশের স্মৃতি বাঙালির স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। কিন্তু ভাষার জন্য আত্মবলিদান তখনো বাকি ছিল।
বাংলাদেশের (Bangladesh) ভাষা আন্দোলনের ঠিক ৯ বছর পর। ১৯৬১ সালের ১৯ মে। বরাক উপত্যকার উপর বলপূর্বক অসমিয়া ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা তথা সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিবাদে বরাক উপত্যকার সর্বত্র শুরু হয় সত্যাগ্রহ আন্দোলন। তার আগের বছরই ১৯৬০ সালে আসাম বিধানসভায় বিল পাশ হয়ে গেছে। বরাক উপত্যকায় যেখানে সর্বাধিক মানুষ বাংলাভাষী, সেখানে জোর করে অসমিয়াকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
বাংলা ভাষার (Bengali Language) স্বাধিকার ফিরিয়ে আনতে বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, শিলচর জুড়ে ১৮ মে থেকেই হরতাল শুরু হয়, শুরু হয় নীরব জমায়েত এবং পিকেটিং। শিলচর স্টেশনেও ট্রেন অবরোধের মধ্য দিয়ে হরতাল সফল করার চেষ্টায় সামিল হয় অজস্র বাঙালি তরুণ-তরুণী। যদিও এই সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল দেশভাগের পর থেকেই – আসামের অসমিয়া জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বাঙালিদের একটা মানসিক সংঘাত দানা বাঁধছিল, ক্রমে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙা খেদা’ প্রচারাভিযান শুরু হলে অসংখ্য বাঙালি আসাম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) চলে আসেন এবং বাকি আরো সহস্র বাঙালি চলে এসেছিলেন এই বরাক উপত্যকায়। তারপরেই ১৯৬০ সালে আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী (Chief Minister) বিমলা প্রসাদ চালিহার সিদ্ধান্তে এবং মন্ত্রীসভায় অসমিয়া জনপ্রতিনিধির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে অসমিয়া ভাষাকে বরাক উপত্যকা সহ সমগ্র আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পাশ হয় ‘Assam Official (Language) Act, 1960’।
শচীন্দ্রমোহন পাল, কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাস, তরণী দেবনাথ, হীতেশ বিশ্বাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং সত্যেন্দ্রকুমার দেবের সঙ্গে সবার প্রথমে বরাকের ভাষা শহিদ হিসেবে উচ্চারিত হয় কমলা ভট্টাচার্যের নাম।
বাঙালিদের হরতাল দমন করতে সমগ্র বরাক উপত্যকা জুড়ে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে আসাম সরকার, শুরু হয় একের পর এক গ্রেপ্তার। এই জমায়েতেই সামিল হয়েছিলেন ষোড়শী বাঙালি কন্যা কমলা – কমলা ভট্টাচার্য। আগের দিনই সদ্য তাঁর ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে, চোখে তার স্বপ্ন জড়িয়ে – আরো পড়াশোনা করবে সে, টাইপ শিখবে, গ্র্যাজুয়েট হবে আর অভাবের সংসারে একটু সুখ এনে দেবে। কমলার মেজদি প্রতিভা স্কুল শিক্ষিকা আর বড়দি বেণু নার্সিং-এর প্রশিক্ষণরতা। শিলচরে পাবলিক স্কুল রোডে তাদের সেই ভাড়াবাড়ি থেকেই ধোয়া নিপাট শাড়ির পাট ভেঙে পরে কমলা এসেছিল সেদিনের জমায়েতে। সে একা নয়, সঙ্গে ছিল তাঁরই বয়সী আরো ২২ জন কিশোর-কিশোরী। আন্দোলনকারী কাছাড় জেলা জুড়েও হরতাল জারি রেখেছিল। সকলের মুখে একই স্লোগান ‘জান দেবো, তবু জবান দেবো না’, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে পারে সেই আশঙ্কায় কমলার মা সুপ্রবাসিনী দেবী হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন এক টুকরো কাপড়। কমলার সঙ্গে এসেছিলেন তারই বোন মঙ্গলাও। ইতিমধ্যে পুলিশকে গ্রেপ্তার করতে দেখে উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা একটা ট্রাকে আগুন জ্বালিয়ে দেয় আর এই আগুন দেখেই আসাম রাইফেলসের সেনারা শুরু করে গুলি চালানো। সতেরো রাউন্ড গুলি চলে। একইসঙ্গে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। বন্দুকের বাঁটের আঘাতে মঙ্গলা মাটিতে পড়ে যায় আর ঠিক তখনই কমলার স্বপ্নিল চোখ ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় পুলিশের গুলি। ভাষার জন্য লড়াইয়ে একদিনে ১১ জন বাঙালি শহিদ (Martyr) হয়েছিলেন সেদিন যাদের মধ্যে সর্বাগ্রে উঠে আসে কমলা ভট্টাচার্যের নাম। বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহিদ তিনি।
আরও পড়ুন: দুই ভাষাসৈনিকের স্মৃতিচারণ
১৯৪৫ সালে শ্রীহট্ট জেলায় জন্ম হয়েছিল কমলা ভট্টাচার্যের। তাঁর বাবা রামরমণ ভট্টাচার্য আর মা সুপ্রবাসিনী দেবী। আরো চার বোন ও তিন ভাইয়ের সঙ্গেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড়ো হয়েছিলেন তিনি। দেশভাগের পর ১৯৫০ সাল নাগাদ পূর্ববঙ্গ জুড়ে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, প্রাণ বাঁচাতে তার পরিবার চলে আসে শিলচরের এই পাবলিক স্কুল রোডের বাড়িতে। তারপর এখানেই ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউট থেকে পড়াশোনার শুরু কমলার। বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, ধার করে বই এনে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলেন কমলা। তবু হাল ছাড়েননি। স্বপ্ন দেখতেন গ্র্যাজুয়েট হবেন, টাইপিং শিখবেন, সংসার প্রতিপালনে দিদির পাশাপাশি সাহায্য করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে বরাক উপত্যকার আন্দোলনে প্রাণ দিল কিশোরী কমলা। শচীন্দ্রমোহন পাল, কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাস, তরণী দেবনাথ, হীতেশ বিশ্বাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং সত্যেন্দ্রকুমার দেবের সঙ্গে সবার প্রথমে বরাকের ভাষা শহিদ হিসেবে উচ্চারিত হয় কমলা ভট্টাচার্যের নাম। আজও সেই শিলচর পাবলিক স্কুল রোডে গেলে দেখা যাবে সেই রাস্তার নাম পালটে করা হয়েছে কমলা ভট্টাচার্য রোড। কমলার সেই স্কুল ছোটেলাল শেঠ ইন্সটিটিউটে বসেছে তাঁর আবক্ষ মূর্তি। কিন্তু হয়তো আজও ১৯৫২’র ভাষা শহিদদের থেকে তাঁর নাম খানিক আঁধারে।
তথ্যসূত্রঃ
অরিজিৎ চৌধুরী, ‘বরাকের রক্তঝরা প্রতিরোধ’, উত্তর সম্পাদকীয়, সংবাদ প্রতিদিন, ১৯ মে ২০২০
কমলা ভট্টাচার্য, সববাংলায়.কম