দুই ভাষাসৈনিকের স্মৃতিচারণ

মৃত্যু তুচ্ছ মাতৃভাষার জন্য। ভাষা আন্দোলনের দুই স্বেচ্ছাসেবকের স্মৃতিতে ১৯ মে

আমি গালে হাত দিয়ে বুঝলাম গুলি লেগেছে
মনোরঞ্জন সরকার

আসামের রাজ্যভাষা একমাত্র অসমীয়া করার কথা ঘোষণা করার পর সমস্ত কাছাড় জেলা( বর্তমান বরাক উপত্যকা) সহ সারা আসামের অনসমীয়া জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তখন আমার বয়স ১৮। বুঝলাম বাংলাকে আসামের দ্বিতীয় রাজ্যভাষা করা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে উপত্যকার জননেতারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে কমিটি গঠন করে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন। আমরা ছিলাম স্বেচ্ছাসেবক। নেতারা সব আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতেন, সেই আন্দোলনে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম। ইতিমধ্যে মেট্রিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ক’দিন ধরে আন্দোলন স্থগিত ছিল। ১৮ মে মেট্রিক পরীক্ষার শেষ দিন। সে দিকে দৃষ্টি রেখে সংগ্রাম পরিষদ ১৯ মে সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেয়। তখন বনধকে হরতাল বলা হত।

১৮ মে রাত থেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনীর তালিকা তৈরি। কে কোথায়, কোন সরকারি কার্যালয়ে পিকেটিং-এ যাবে তা নিশ্চিত করে দেওয়া হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় ব্যাজ। ১৯ মে ভোর পাঁচটা নাগাদ আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কার্যালয়ে টেলিফোন/ টেলিগ্রাম অফিসে আসার প্রস্তুতি নেই। ছ’টার মধ্যে চলে আসি জানিগঞ্জ সদরঘাট রোডে অবস্থিত ওই অফিসে। সঙ্গে আরও কয়েকজন যুবক ও মেয়েরা। মেয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা ছিল অধিকাংশ জানিগঞ্জের। অনেকের নাম আজও আর মনে নেই। তবে আমরা প্রায় আট-দশ জন স্বেচ্ছাসেবক-সেবিকা ছিলাম একসঙ্গে ওই অফিসে। আমাদের মধ্যে ছিল আন্তরিকতা ও সংগ্রামী চেতনা। মনে পড়ে জানিগঞ্জের চম্পালাল ও নাজিরপট্টির নরেশ পাল সহ অনেকে আমাদের বিস্কুট, কলা, চকলেট দিয়ে যেতেন। তখন সারা বরাক উপত্যাকা স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। কোথাও সরকারি কার্যালয়, আদালত খোলা সম্ভব হয়নি প্রশাসনের। রেল-বিমান চলাচল বন্ধ। সারা শিলচর শহরে পুলিশ-প্যারামিলিটারিতে ছয়লাপ। শিলচর যেন যুদ্ধক্ষেত্র। রেল-স্টেশনে যাওয়ার কথা। সে সময় যে কোনও সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল রেলওয়ে স্টেশন। তাই আমরা ছেলেমেয়েরা সবাই একসঙ্গে ছুটি তারাপুরের দিকে। প্রখর রৌদ্রতাপ মাথায় নিয়ে হাঁটতে থাকি। দুটো পনেরো মিনিট নাগাদ স্টেশনে পৌঁছে সেখানে পিকেটিংরত অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে আমরা সবাই বসে পড়ি রেল লাইনের উপর। সেখানে যাওয়ার পর শুনেছি কয়েকবার লাঠি চার্জ করেছে পুলিশ-প্যারামিলিটারিরা। স্বেচ্ছাসেবক-সেবিকারা দৌড়োদৌড়ি করছে। কিন্তু কাউকে রেললাইন থেকে হঠাতে পারেনি। অনেককে গ্রেফতার করে দফায় দফায় নিয়ে গিয়েছে। তবু সেই স্থান সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীরা পূরণ করে নিয়েছে। রেলের চাকা ঘুরতে দেয়নি।

হঠাৎ শুনি তারাপুর মেনরোডে একটি ট্রাকে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করে এনেছে। উত্তেজিত জনতা ট্রাকটিকে আটক করে। কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীদের মুক্ত করে নিয়ে গেছে। এসব দেখিনি, তবে স্টেশনেই সব শুনেছি। এমন সময় হঠাৎ পুলিশ মিলিটারির বন্দুক গর্জে ওঠে এবং শুরু হয় গুলিবর্ষণ। তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে গুলি চলছে। ভাবছি ইঁট-পাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ি হচ্ছে। এমন সময় আমার বাম গালে কি যেন এসে আঘাত করল, দেখি রক্ত ঝরছে। তখন বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে। আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েছি। কিছু জায়গা কোনওক্রমে যাওয়ার পর স্টেশনের মধ্যেই আমার রক্তালুপ্ত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে জানতে পারি যে সেখান থেকে আমাকে সতীন্দ্র মোহন দেবের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শিলচর সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ১৫-২০দিন আমি শিলচর সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। হাসপাতালে থাকাকালীন আহতের খোঁজখবর নিতে প্রায়ই আসতেন সতীন্দ্র মোহন দেব, গাভরুমিয়া। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আমাদের খবরাখবর নিতেন শংকর সিং, কালী পাটোয়া ও অন্যান্যরা।

কাঁধে গুলি লেগেছে, প্রথমে বুঝতেই পারলাম না
ভূপেন্দ্র কুমার পাল

তখন আমি ২৭-২৮ বছরের যুবক। ১৯শে মে শুক্রবার কাছাড় (বরাক) বন্‌ধ। তখন বলা হতো হরতাল। আগের দিন থেকেই প্রস্তুত পুরোদমে চলছে হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ হরতালকে সফল করে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা ক’জন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে নাম লিখিয়াছি। এদের মধ্যে সবার কথা মনে নেই তবে।

আমার বড়ভাই রবীন্দ্র পাল সহ মনোরঞ্জন সরকার, বাচ্চু দাস, নৃপেন্দ্র নাগ ছিলেন আমাদের সঙ্গে। ১৯শে সকালেই শিলচর আদালতে পিকিটিং করার দায়িত্ব আমাদের উপর দেওয়া হয়েছিল। আমরা সবাই যথাস্থানে ১৯শে মে পিকেটিং শুরু করি। দুপুর বারোটা/সাড়ে বারোটা পর্যন্ত আদালত প্রাঙ্গণে পিকেটিং করার সময় সবার প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠল তারাপুর রেলস্টেশনে যাবার জন্য। তখন রেলস্টেশন ছিল আনোলনের কেন্দ্রবিন্দু। দফায় দফায় লাঠিচার্জ, গ্রেফতার চলছে। চলছে টিয়ার গ্যাস ফাটানো। আমরা সবাই মিলে রওয়ানা হই রেলস্টেশন। গিয়ে দেখি কাঁদানে গ্যাস শেল ফাটানোর ফলে স্বেচ্ছাসেবক/ সেবিকারা ছুটাছুটি করছে। আমরা বালতি করে জল এনে চোখ ধুতে দেই। সারা স্টেশনে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত পুলিশ-প্যারামিলিটারি। আমরাও অন্যান্যদের সঙ্গে বসে পড়ি রেল লাইনের উপর। হঠাৎ দুপুরে শুনি ভয়ঙ্কর চিৎকার চেঁচামেচি। কিছু বুঝার আগেই ডান হাতের উপর কাঁধের নীচে পিপঁড়ার কড়া কামড়। পরমুহূর্তে দেখি রক্ত ঝরছে। বাম হাত দিয়ে ওই স্থানে ধরে রাখি। বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে গুলি লেগেছে। হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। শুনেছি দশ পনেরো মিনিট পড়ে থাকার পর অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকরা আমাকে কোলে নিয়ে যায় সতীন্দ্র মোহন দেবের বাড়িতে। সেখানে পূর্বেই মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত ছিল। আমার ক্ষতস্থান ব্যান্ডেজ করা হল। ইনজেকশন দেওয়ায় তার কিছুক্ষণ পর একটা অ্যাম্বুলেন্স করে সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। স্টেশন থেকে সতীন্দ্র মোহন দেবের বাড়ি এবং পরবর্তীতে হাসপাতাল পর্যন্ত দেখেছি অনেক মানুষ আহত বা নিহত। শুধু রক্ত আর রক্ত। জীবিতরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। অনেকে জ্ঞান হারিয়েছে বা মৃত। তখন কিছু বোঝার উপায় নেই। হাসপাতালের অপারেশন টেবিলে তোলা হল আমাকে এতটুকু শুধু মনে পড়েছে। দীর্ঘ উনত্রিশ দিন শিলচর সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরি। কিন্তু তবুও কাজ করতে পারিনি বহু বছর।

হাসপাতালে থাকাকালীন মহীতোষ পুরকায়স্থ, পলু বিশ্বাস সহ অনেক জননেতারা আমাদের দেখতে যেতেন এবং চিকিৎসা সহ অন্যান্য সুবিধা অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করতেন। এছাড়া আমাদেরকে এঁরা অন্যান্য সাহায্যও করেছেন।

ঋণ- শান্তনু গঙ্গারিডি সম্পাদিত ‘১৯ মে’ পত্রিকা এবং দেবাশিস চন্দ

Developed by DXDasia