বাল্যবিবাহ নয়, পড়াশোনা করবে মেয়েরা – ১১২ বছর আগে ভেবেছিল বেগম রোকেয়ার স্কুল

লেখাপড়া শেখা, খোলা মনে দেখা/ যেভাবে আপনি দেখেছেন/ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন…

“সোনার পিঞ্জরে ধরে রেখো না আমায়

আমারে উড়িতে দাও দূর নীলিমায়”

এই কবিতা যখন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখছেন তখন সমাজে মেয়েদের বাল্য বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু রোকেয়া চেয়েছিলেন, বিবাহ তথা বাল্য বিবাহ নামক সামাজিক এই প্রথা থেকে মুসলিম সমাজের মেয়েদের বার করে এনে শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে জারিত করতে। শেষ পর্যন্ত তিনি পেরেওছিলেন মুসলিম মেয়েদের নবজীবনের মুক্তির দূত হতে। কোনও সামাজিক প্রথা এক লহমায় যেমন ছিনভিন্ন করে ফেলা যায় না, তার জন্য ধারাবাহিক, বিকল্প সংস্কৃতি প্রয়োজন হয়, যেটা সময় সাপেক্ষ, সেই সময় নিয়েই রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারী মুক্তির জন্য লড়েছিলেন, আর সফলও হয়েছিলেন। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালি ও কলমই ছিল রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অস্ত্র। তিনি পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান মেয়েদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সেই সাধ পূর্ণ হয়েছে।

আপনি জানতেন অবরোধ হয়
মেয়েদের জন্য অবরোধ নয়,
অবরোধ খোলা, প্রতিরোধ তোলা
লেখাপড়া শেখা, খোলা মনে দেখা
যেভাবে আপনি দেখেছেন
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

শালীনতা থাক, অবরোধ যাক
গ্রামের মেয়েটা, সাহস পাক
বই তুলে নেয়া, স্কুলে নাম দেয়া
বিজ্ঞানে যাওয়া, এগোতেই চাওয়া
যেভাবে আপনি এগিয়েছেন
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

আজ কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে উর্দু বিভাগে পড়ছে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মুসলিম মেয়েরা। বাংলা, ইংরেজি, উর্দু তিনটি বিভাগ মিলিয়ে মোট ছাত্রী সংখ্যার ৫০ শতাংশ মুসলিম। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া নাগের সঙ্গে কথা হচ্ছিল স্কুলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। তিনি বললেন, “রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। এখন তাঁর তৈরি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শুধু পিছিয়ে পড়া মুসলমান মেয়েদের নয়, অন্যান্য সমস্ত সম্প্রদায়ের মেয়েরাই পড়তে আসে।”

১৮৮০, জন্মের সাল
রংপুর এ হলো নতুন সকাল
কলমের কালি পাতালো মিতালী
গদ্য আর পদ্য লিখেছেন
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

রোকেয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময়কালের মুসলমান সমাজের নারী শিক্ষার অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দের “বামাবোধিনী” পত্রিকার জানুয়ারি সংখ্যার লোক গণনার একটি রিপোর্টে কলকাতার নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্পাদকীয় প্রকাশ পেয়েছিল। তাতে দেখা যাচ্ছে কলকাতায় স্ত্রী শিক্ষায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল পার্সি সমাজের মেয়েরা এবং সবচেয়ে পিছিয়ে মুসলিম সমাজের মেয়েরা। ১৮৮১-’৮২ খ্রীস্টাব্দে বাংলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মুসলমান পরিবারের মেয়েদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগন্ন। এর পর ১৯০৩ সালে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীশিক্ষায় শতকরা হার জনগণনা অনুসারে ছিল: মুসলমান – ৩ শতাংশ, হিন্দু- ৯ শতাংশ, বৌদ্ধ- ১৬ শতাংশ, ইহুদী- ৪৫ শতাংয়, ব্রাহ্ম- ৫৩ শতাংশ এবং খ্রীস্টান ৭০ শতাংশ। মুসলমান মেয়েদের যখন এমন সংকটপূর্ণ অবস্থা তখন জন্মালেন রোকেয়া।

প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া নাগের মতে, “রোকেয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী সর্বস্তরের মেয়েরা এই স্কুলে পড়তে পারায় তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নারীশিক্ষা নিয়ে সেটা পরিপূর্ণ হয়েছে।”

মুসলমান মেয়েরা যখন শিক্ষায় এতটা পিছিয়ে তখন রোকেয়া অনুধাবন করলেন, মেয়েদের এই জড়ত্ব থেকে বার করে আনতে নারীজাতিকে শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করতে হবে। একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমে মেয়েদের আত্মশক্তির বিকাশ ঘটালেই প্রকৃত অর্থে নারীজাতির মুক্তি সম্ভব হবে।

স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রথমে রোকেয়ার পাশে ছিলেন তাঁর দাদা ইব্রাহিম এবং বিয়ের পর তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেন। নারী শিক্ষায় রোকেয়াকে তাঁর স্বামী অকুন্ঠ সহযোগিতা করলেও রোকেয়ার দাম্পত্য জীবন ছিল ক্ষণস্থায়ী। মাত্র তেরো বছরের দাম্পত্য জীবন ছিল রোকেয়ার। মাত্র ২৯ বছর বয়সে স্বামীকে হারান। রোকেয়া তখন দু’টি শিশু সন্তানের মা। অকাল বৈধব্যই তাঁর একলা চলার পথকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল। এই বৈধব্য-জীবনের অনুসঙ্গ আমরা পাই তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘পদ্মরাগ’ (১৯২৪)-এ। কিছু দিনের মধ্যেই ১৯১১ খ্রীস্টাব্দের ১৬ মার্চ, মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে নিজের প্রাণশক্তি উজাড় করে রোকেয়া তাঁর প্রয়াত স্বামীর নামে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করলেন।

মেয়েদের স্কুল ডুমুরের ফুল
সে ফুলের টানে বাতাস আকুল
কাহিনি লেখিকা, প্রবন্ধটাও
যুক্তি তর্কে কলমখানাও, আপনি শানিয়েছেন
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

রোকেয়া তাঁর ‘মতিচূর’ গ্রন্থে লিখলেন, “….আমরা পশু নই, আমরা আসবাব নই, আমরা জড়ায়ু অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল, আমরা মানুষ”, এই ছিল নারীজাতির উন্মেষে রোকেয়ার ঘোষণা। রোকেয়া লিখলেন, “জীবনে প্রধান প্রয়োজনীয় বস্তু অন্নবস্ত্র; সুতরাং রন্ধন ও সেলাই অবশ্য শিক্ষণীয়। কিন্তু তাই বলিয়া জীবনটাকে শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নহে।” ‘শিশুপালন’ প্রবন্ধে রোকেয়া লিখলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ বংশরক্ষার জন্য দুইটি বিষয় দরকারী হয়ে পড়েছে দেখছি। প্রথমত স্ত্রী শিক্ষার বহুল প্রচার দ্বিতীয়ত বাল্য বিবাহ রহিত করা।” তিনি বুঝেছিলেন, শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষা করতে হলে আগে মা’কে সুস্থ থাকতে হবে।

রোকেয়ার সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। আজ বাঙালি মুসলমান মেয়েরা শিক্ষার আঙিনায় পৌঁছেছে। প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া নাগের কথায়, কলকাতার লর্ড সিনহা রোডের সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলই সেটা প্রমাণ করছে। তিনি বলছিলেন, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ এখন মুসলিম ছাত্রীতে পরিপূর্ণ। এমনকী বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু মাধ্যম মিলিয়ে এই স্কুলে বর্তমানে ৫০ শতাংশ ছাত্রীই মুসলমান। তবে সমস্যা যেটা, সেটা হচ্ছে দরিদ্র পরিবার থেকে মুসলমান মেয়েরা এখানে পড়তে আসে। তাঁদের বাড়িতে তেমন নজরদারি করার কেউ নেই। তাই এই পড়ুয়াদের প্রতি স্কুল থেকেই বাড়তি নজরদারি চালাতে হয়। ২০২০-তে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিল আমাদের স্কুলেরই এক ছাত্রী। এছাড়া সবাই প্রথম বিভাগে পাশ করে। তবে করোনার জন্য দু’ই বছর সেভাবে মূল্যায়ন হয়নি। তবে উর্দু বিভাগের মেয়েদের মধ্যে ৫০ শতাংশ নম্বর সবাই পায়।

সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের মোট দুটো বিভাগ। একটা প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। অন্যটা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ইংরেজি মাধ্যমেও পড়ানো হয়। সেখানে বর্তমানে  ৫জন মুসলিম ছাত্রী পড়ছে। তবে শিক্ষিকার অভাবে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে উর্দু মাধ্যমে পড়ানোর ব্যবস্থা নেই।

১৯৩২, বিদায় হঠাৎ ,
কাঁদছিলো দিন কাঁদছিলো রাত
বাঙালি কি সেদিন কেঁদেছেন?
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

সৈয়দপুরে তার শেষ এর মাটি
বাঙালি মেয়ের দুর্গ ঘাটি,
সে ঘাটিতে থাকা, তাকে মনে রাখা,
মনে রাখা পথ, পথের শপথ
যেভাবে তিনি শিখিয়েছেন,
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া নাগ একটু অতীতে চলে গিয়ে অনেক কথাই বলছিলেন। বলছিলেন, রোকেয়ার লক্ষ্য ছিল পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েরা পড়াশোনা করবে। মূলত পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্যই রোকেয়া ভেবেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়ে গেল। এখানকার সমস্ত মুসলিম শিক্ষিকারা ওপার বাংলায় চলে গেলেন, ছাত্রীরা চলে গেল। ১৯৩৫ সালে সরকার যেহেতু স্কুলটা অধিগ্রহণ করেছিল, তাই ১৯৫০ সালে অর্থাৎ বলা যায় ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর স্কুলটা পুনর্গঠিত হয়। ১৯৪৭-এর আগে বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের মেয়েরাও সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলে পড়ত। পরবর্তীকালে সকলের জন্য এই স্কুলের দরজা খুলে দেওয়া হয়। রোকেয়ার ইচ্ছে ছিল একটা বাংলা মাধ্যম এই স্কুলে চালু করার। ১৯১৭ সালে তিনি চেষ্টাও করেছিলেন। তখন বাংলা পড়াবার শিক্ষিকা ও ছাত্রীর অভাবে তাঁর সেই ইচ্ছে সফল হয়নি, পরে হয়েছে।  বাঙালি মুসলিম পড়ুয়ার সংখ্যা তখনও কম ছিল, বর্তমানেও উর্দু বিভাগে বাঙালি মুসলিম মেয়েদের সংখ্যা কমই। সেই ধারা বলতে গেলে আজও বর্তমান। তবে বাংলা বিভাগে বাঙালি মুসলিম মেয়েরা পড়ছে। রোকেয়ার লক্ষ্য ছিল, সমাজের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে এসে মেয়েদের জরায়ুসর্বস্ব সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ভাবনা থেকে বাইরে নিয়ে আসাই রোকেয়ার লক্ষ্য ছিল। প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া নাগের মতে, “রোকেয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী সর্বস্তরের মেয়েরা এই স্কুলে পড়তে পারায় তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নারীশিক্ষা নিয়ে সেটা পরিপূর্ণ হয়েছে।” বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আগামী ১৬ মার্চ ১১২ বছরে পা রাখতে চলেছে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল।

___________________

লেখাটির মধ্যে ব্যবহৃত পংক্তিগুলি কবীর সুমনের লেখা ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ গানটি থেকে নেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

পাপিয়া নাগ, প্রধান শিক্ষিকা, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়

রোকেয়া রচনা সমগ্র, বিশ্বকোষ পরিষদ কর্তৃক প্রকদশিত

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: তাহমিনা আলম

Developed by DXDasia