প্রথম বাঙালি হিসেবে ‘বাষ্পীয় শকট’ রেলের সওয়ারি হয়েছিলেন রামমোহন

এমনকি তিনি ট্রেনে চড়েছিলেন এ দেশে যাত্রীবাহী রেল চালুর আগেই

রামমোহন রায় ‘রাজা’ ছিলেন তাঁর বিদ্যে-বুদ্ধি-কাজের জন্য। সারাজীবনই একের পর এক নিদর্শনমূলক কাজ করে এ দেশের নবজাগরণের পথ মুক্ত করেছিলেন। তেমনই তিনি নিদর্শন রেখেছেন তাঁর রেল-সফরের ব্যাপারেও। ভারতে যাত্রীবাহী রেল চালুর আগেই ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। তাঁকে ভারতের ‘প্রথম আধুনিক মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম বাঙালি হিসেবে রেলে চড়ার মতো আধুনিকতার আস্বাদ নিয়ে সেই প্রশস্তিকে সার্থক প্রমাণ করেছিলেন রামমোহন।

লোহার পাত সাজানো পথে কলকাতা থেকে কলের গাড়ি চলাচল শুরু হয় ১৮৫৫ সালে। তার আগে ‘কু-ঝিক-ঝিক’ নিয়ে বাঙালি সংবাদদাতা লিখেছিলেন:

“বাষ্পীয় শকট এ পর্যন্ত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় নাই। বাহন ব্যতীত শকটের গমন আমরা কখন দেখি নাই। যে প্রকার শুনিয়াছি তাহাতে চমৎকার বোধ হয় বটে। বিশ্বাস্য লোকের মুখে না শুনিলে এ বিষয়ে আমাদের প্রত্যয় হইত না, কেন না আপাতত ইহা অলীক বোধ হয়। কালিদাসের মেঘদূতের মধ্যে যদ্রূপ বিস্ময় প্রকাশ করেন যে ধূম জ্যোতি জল মরুতের সন্নিপাতে উৎপন্ন মেঘদ্বারা কি রূপে বার্তা প্রেরণ হইবে, আমাদেরও তদ্রূপ বিস্ময় বোধ হইত যে জল বিকারে উৎপন্ন বাষ্প দ্বারা কি প্রকারে শকট চালন হইতে পারে।”

বাঙালিদের মধ্যে কে প্রথম ‘বাষ্পীয় রথ’-এ চড়েছিলেন? রাধাপ্রসাদ গুপ্ত লিখেছিলেন যে, তাঁর সাহেব-বন্ধু ইয়ান জ্যাকের একটি চিঠির সূত্রে তিনি জানতে পেরেছিলেন, রামমোহন রায় বাঙালিদের মধ্যে প্রথম রেলগাড়ি চড়েন। এবং তিনি রেল-সফর করেছিলেন ভারতে রেল চলাচল শুরুর প্রায় বাইশ বছর আগে।

১৮৩১ সালে বিলেত সফরে যান রামমোহন। সে কথার উল্লেখ পাওয়া যায় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’ নামে সংকলন গ্রন্থে। ১৮৩১-এর ১৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে প্রকাশিত এক সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, ম্যানচেস্টার শহরে রেললাইন দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন রামমোহন। লোহার পাত কেটে বানানো একটি রাস্তা। তার উপর দিয়ে ছুটে চলেছে বাষ্পচালিত গাড়ি। সেই দৃশ্যই ‘রাজা’কে উত্সুক করে তুলেছিল। তারপর সেই গাড়ি যখন ঘণ্টায় ১৫ ক্রোশ বেগে চলতে শুরু করে, তখন যাত্রী রামমোহন অত্যন্ত মুগ্ধ হন। খবরে সেকথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

রামমোহন যখন বিলেতে রেলে ভ্রমণ করছেন, এদেশে তখন সবে লাইন পাতার কাজ শুরু হয়েছে। ভারতীয়দের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রথম রেলপথ স্থাপনের জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন। ১৮৪৩-এ একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন যে, স্টিমারে করে এলাহাবাদের পথে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু পৌঁছেছিলেন ভাগলপুর পর্যন্ত। চিঠিতে রসিকতা করে তিনি লিখেছিলেন, আমাদের মহান পবিত্র গঙ্গা তো আর তোমাদের দেশের ছোট্ট রাইন নদী নয়—স্রোত এত তীব্র ছিল যে আমায় কলকাতায় ফিরে আসতে হয়।” আর চিঠি শেষ করেছিলেন এইভাবে, “দুর্ভাগ্যবশত ভারতে আমাদের রেলপথ নেই এবং এখানে ভ্রমণ করা সামান্য ব্যাপার নয়, সহজসাধ্যও নয়…”। 

১৮৫৩ সালে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হয় ভারতে। আধুনিকতার নিরিখে বিলেতের মাটিতে প্রথম বাঙালি হিসেবে রামমোহনের এই রেলযাত্রার অভিজ্ঞতা অনন্য এক নজির হয়ে থেকে গেছে।

 

তথ্যসূত্রঃ

কলের শহর কলকাতা, সিদ্ধার্থ ঘোষ

Developed by DXDasia