ডাইনিং টেবিলের যুগে এখনও পাল্টায়নি গ্রাম-বাংলার ‘সাধের আসন’

বাঙালির মাটিতে আসন পেতে কাঁসার থালায় খেতে বসার চল কি আজ বিলুপ্তির পথে?

আসন বোনা, নকশি কাঁথা এইসব হস্তশিল্পগুলি মূলত বাঙালি মহিলাদের নিজস্ব অবদান। আগেকার দিনে আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধবদের সুন্দর আসন বুনে উপহার দেওয়ার চল বাংলায় ছিল। সাহিত্যেও এর উদহারণ মেলে। ভোরের পাখি বিহারীলাল চক্রবর্তীর শেষ সৃষ্টি ‘সাধের আসন’। জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরীদেবী বিহারীলাল চক্রবর্তী রচিত  সারদা মঙ্গলের একনিষ্ঠ পাঠিকা ছিলেন। তিনি বিহারীলালকে একটি পশমের আসন উপহার দেন। সারদা মঙ্গল-এর কবিতাংশ লেখা ছিলঃ

“হে যোগেন্দ্র যোগাসনে,
ঢুলু ঢুলু দু নয়নে
বিভোর বিহ্বল মনে কাহারে ধোয়াও?”

তারপর কাদম্বরীদেবীর মৃত্যু ঘটেছে। বিহারীলাল তাঁর কথা স্মরণ করে 'সাধের আসন ' লিখেন এই বলেঃ “কাহারে ধেয়াই দেবী নিজে আমি জানি নে”। যাই হোক, আরও অনেক রচনাতেও বঙ্গ নারীদের হাতে বোনা এই আসনের ভূমিকার কথা পাওয়া যায়।

রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’-তে আসন শব্দের অর্থ খুঁজলে পাওয়া যায় বসিবার ছোটো গালিচা। যোগসাধনের জন্য উপবেশন বিভিন্ন প্রণালী (পদ্মাসন)। এই দুটি আসন শব্দের অর্থের মধ্যে বসবার জন্য ব্যবহৃত আসন নিয়েই আমার এই লেখাটি।

বর্তমানে প্রতিটি বাড়িতে ডাইনিং টেবিলের ব্যবহারের ফলে বাঙালির মাটিতে আসন পেতে কাঁসার থালায় খেতে বসার চল আজ বিলুপ্তির পথে। তাই গ্রাম বাংলায় মা-কাকিমাদের আসন বোনার চলও অনেকটাই কমে গিয়েছে। একসময় এই আসন, কাঁথা, সোয়েটার বোনা ছিলো তাঁদের অবসর যাপনের সৃষ্টি। এখনও অনেক গ্রাম-বাংলায় রকমারি আসন বুনতে দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন রকমের  আসন আমরা দেখতে পাই, যেমন – চটের উপর রঙিন উল দিয়ে বোনা আসন, কুশাসন (কুশ এক প্রকার তৃণ দ্বারা নির্মিত আসন), পাটের আসন, কম্বলের আসন, তালপাতার বা খেজুর পাতায় বোনা আসন (গ্রাম বাংলায় একে ছোটো চাটাই বলে)। 

ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়

চটের উপর উল দিয়ে বোনা আসনঃ পাটের চটের উপর নানা রঙের উল দিয়ে রকমারি কারুকার্য করে আসন বোনা  বাংলার মহিলাদের হস্তশিল্পের এক অন্যতম উদহারণ। আলুর বীজ রাখবার জন্য ব্যবহৃত ঘন পাটের বস্তা বা চা রাখার জন্য ব্যবহৃত পাটের বস্তা আসন বোনার জন্য ব্যবহার করা হত। বর্তমানে এখন বাজারেও ভালো পাটের চট কিনতে পাওয়া যায়। এই পাটের বস্তার বা চটের উপর রকমারি ডিজাইন বা মোটিফ গ্রাফে তুলে নানা রঙের উল দিয়ে সূচের সাহায্যে আসন বোনা হয়। আগেকার দিনে যখন এতো রঙের উল বাজারে পাওয়া যেত না, তখন গ্রাম-বাংলার মহিলারা পুরোনো শাড়ির পার থেকে রঙিন সুতো বের করে সেই সরু সুতো পাঁচ-ছয়টিকে একত্রিত করে পেঁচিয়ে একটু পুরু করে নিয়ে সেই দিয়ে আসন বুনতেন। এই আসন বোনার পদ্ধতির বা স্টিচেরও আবার ভিন্ন ভাগ আছে যেমন – মাছি ফোঁড়, ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়, ছাটা ফুলের আসন প্রভৃতি। মাছি ফোঁড় অর্থাৎ মাছির আকৃতির ন্যায় ছোটো ছোটো করে ঘর গুনে বুনে গ্রাফ তুলে একটি সম্পূর্ণ ডিজাইনের রূপ দেওয়া হয়। এই মাছি ফোঁড় আবার দুরকম হয় 'ছোট মাছি ফোঁড়'-এর ক্ষেত্রে দুটি ঘর থাকে, আরেকটি হল 'বড় মাছি ফোঁড়'-এর ক্ষেত্রে চারটি ঘর থাকে। খুবই নৈপুণ্যের সঙ্গে সূক্ষভাবে  মহিলারা আসন বুনে থাকেন। একটি ভুল হলে বা ছোটো-বড়ো হলেই সমগ্র নকশা বা ডিজাইনটি গ্রাফ  মিলতে চাইনা। আর ভাসা ফোঁড় বা এলো ফোঁড়ের ক্ষেত্রে কাঁথা স্টিচ যে ভাবে বোনা হয়ে থাকে অনেকেটা সেই ভাবে উল দিয়ে বুনে একটি নক্সা বা ডিসাইন কে ভরাট করা হয়। আবার ছাটা ফুলের ক্ষেত্রে প্রথমে মাছি ফোঁড়ের সাহায্যে ঘর গুনে গ্রাফ তৈরী করে তারপর তার উপর ভাসা ফোঁড় দিয়ে উপর উপর চাপিয়ে পুরু করে বোনা হয়। 

এরপর সেই বুনুনের ভিতর কাঁইছি ঢুকিয়ে কেটে ও ছেঁটে দিলে সুন্দর ফুলের আকৃতি নেয়, এটিই হল ছাটা ফুল। এই রকম বিভিন্ন ফোঁড় বা স্টিচের সাহায্যে পাটের চোটের উপর রঙিন উল দিয়ে রকমারি ডিজাইন, মোটিফ, জ্যামিতিক নকশা তোলা হয়ে থাকে। এইসব গ্রাম বাংলার আসনে  সুন্দর রকমারি মোটিফ ও ডিজাইন দেখতে পাওয়া যায় যেমন- ময়ূর, প্রজাপতি, শঙ্খ, মঙ্গল ঘট, টিয়া পাখি, পুতুল, কুকুর, বিড়াল, বিভিন্ন ফল-ফুল, এমনকি গ্রামের বাড়ি, মন্দির ইত্যাদি চিত্রও বাংলার এই আসনে উঠে এসেছে।

মাছি ফোঁড়

এই আসনের আবার ডিজাইন ভেদে অনেক নাম আছে। যেমন – খাসগ্লাস (আসনের চার কোন থেকে চারটি ফুল দানি সমেত ফুলের ঝড়ের মতো নকশা), হোলি প্রিন্ট (বিভিন্ন রঙের সমাহার, উল দিয়ে এলো ফোঁড় এর সাহায্যে বোনা হয়), আনারসের চোখ, তেঁতুল পাতা, ধানের শিষ, ব্লেড প্রিন্ট, কদম ছাট, ময়ূর পুচ্ছ, মণিপুরী প্রভৃতি কত রকমের আসনের নকশার নাম গ্রাম-বাংলায় প্রচলিত আছে। বাংলা কবিতা বা ছড়ার বিভিন্ন লাইনও এই আসনে দেখতে পাওয়া যায়।

চিত্রশিল্পীরা যেমন নিজেদের আঁকা ছবির নিচে স্বাক্ষর করেন, তেমনি এই আসন যিনি বোনেন তাঁর  নামও গ্রাফের সাহায্যে তুলে উল দিয়ে বুনে আসনের এক কোনে লিখতে দেখা যায়। শঙ্খ, মঙ্গল ঘট, গোপাল ঠাকুর, গণেশ, প্রদীপ এইসব মোটিফের  যে আসনগুলি বোনা হয় সেগুলি বসবার জন্য ব্যবহৃত হয় না। কারণ এইগুলো হিন্দু ধর্মে শুভ হিসাবে বিবেচিত হয়, তাই এই আসনগুলি দেবতাকে ভোগ নিবেদনের সময় পাতা হয়। 

আবার আগেকার দিনে বিয়ের সময় নতুন বরকে বসানোর জন্য এইভাবে বড়ো আকৃতির আসন তৈরি করতেন গ্রাম বাংলার মহিলারা। একে বলা হতো 'বর আসন'। এইরকম বড়ো আসন তৈরি করে মেয়ের  বিবাহের দানের সামগ্রীর সঙ্গেও দেওয়া হতো। বাংলার এই হাতে বোনা আসনের চারিদিকে লাল কাপড় অথবা নকশা ভেদে বিভিন্ন রকমের রঙিন কাপড়ের কুচি করা ঝালোর দেওয়া হয়। এই কুচি করা ঝালোরের ব্যবহার যে শুধু বাংলার আসনের চারিদিকেই দেখতে পাওয়া যায় তাই নয় গ্রাম বাংলার হাত পাখার চারিদিকে, আগেকার  মশারি, বালিশেও, দেবতার পূজায় ব্যবহৃত শামিয়ানাতেও এই ঝালোরের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এই ঝালোর ব্যবহারের ফলে আসনের মধ্যে নকশাটির সঙ্গে সমগ্র আসনটি আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে।

কুশাসনঃ এই আসন কুশ (একরকম তৃণ জাতীয় উদ্ভিদ)-এর সাহায্যে বোনা হয়। এই আসন অনেকেটা মাদুরের মতো করে বোনা হয়।

কম্বলের আসনঃ এই আসন সাধারণত ভেড়ার মোটা লোমের হয়ে থাকে। সাদা বা ঘিয়ে রঙের এই আসন পুজোর কাজে, অথবা অসৌচের সময় ব্যবহার করা হয়।

পাটের আসনঃ এই আসন পাট দিয়ে তৈরি হয়। পাটকে পাকিয়ে দড়ি তৈরি করে তা দিয়ে এই আসন বোনা হয়। সাধারণত পুজোর কাজেই ব্যবহৃত হয়। 

তালপাতা বা খেজুর পাতা দিয়ে বোনা আসনঃ তালপাতা ও খেজুর পাতা দিয়ে ছোটো 'চাটাই'-এর মতো করে বোনা আসন গ্রাম বাংলায় অনেক জায়গায় বসবার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন গালিচা ও মকমলের বা ভেলভেটের আধুনিক আসন বাজারে এখন কিনতে পাওয়া যায়।

 
গ্রন্থঋণঃ
১. বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদা মঙ্গল –  সম্পাদনা ড: মিহির চৌধুরী কামিল্যা।
২. চলন্তিকা – রাজশেখর বসু।
 
ছবিঃ
পৃথা মুখার্জি।

 

Developed by DXDasia