কাদম্বরীর মৃত্যু এবং কয়েকটি প্রশ্ন

‘মাতঙ্গিনী’ থেকে ‘কাদম্বরী’ হওয়ার যে যাত্রা…

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার পিরালী ব্রাহ্মণ হওয়ার কারণে অনেক রক্ষণশীল পরিবার তাদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক জুড়তে সাহস পেতেন না। সেহেতু বাংলাদেশে যশোরের দিকে, যেখানে ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ছিল, তার আশেপাশের গ্রামের সাধারণ ঘরের মেয়েদের দেখেশুনে বউ বানিয়ে আনার রেওয়াজ ছিল ঠাকুরবাড়িতে। কিন্তু কাদম্বরী যশোরের মেয়ে ছিলেন না, ছিলেন খাস কলকাতার মেয়ে।

যদিও কাদম্বরীর পরিবারের সাথে আগে থেকেই ঠাকুরবাড়ির সম্পর্ক ছিল। শুধু জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িই নয়, কাদম্বরীর পরিবারের পরিচয় ছিল পাথুরিয়াঘাটার জমিদার বাড়ির সাথেও। ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা অনুসারে সে সম্পর্কটি ছিল 'কর্মচারী ও মনিবের'!

কাদম্বরীর সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়েতে যে কারণে দাদা সত্যেন্দ্রনাথের তীব্র আপত্তি ছিল বলে জানা যায়। সত্যেন্দ্রনাথ এ বিয়েতে কিছুতেই রাজি ছিলেন না। কারণ, তাঁদেরই বাড়ির কাজের লোকের মেয়ে কিনা বউ হয়ে তাঁদেরই বাড়িতে আসবে! শোনা যায়, কাদম্বরীর দাদা একসময় কাদম্বরীর বাবা ও কাকার সাথে ঠাকুরবাড়ির আশ্রিত ছিলেন।

দেবেন্দ্রনাথের ইচ্ছায় সব সমস্যাকে দূরে সরিয়ে রেখে আট বছরের মাতঙ্গিনীর সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ে হল। মাতঙ্গিনী ছিল কাদম্বরীর পূর্বনাম। ঠাকুরবাড়িতে বউদের পূর্বনাম বদলে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল দীর্ঘদিনের। ধীরে ধীরে 'মাতঙ্গিনী' হারিয়ে গেল 'কাদম্বরীর' মধ্যে।

কাদম্বরী বউ হয়ে ঠাকুরবাড়িতে যে বছর প্রবেশ করেন, ঠাকুরবাড়ির সে বছরের হিসেবের খাতা থেকে জানা যায়, কাদম্বরীর জন্য বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ কেনা হয়েছিল, কাদম্বরীর পড়াশোনার জন্য।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোঁড়া ও রক্ষণশীল ছিলেন। পরে দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও বৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে প্রাচীনপন্থী সংস্কার ত্যাগ করেন, হয়ে ওঠেন কলকাতার আধুনিক বাবু।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কাদম্বরীকে ঘোড়ায় চড়া শেখালেন। গঙ্গার ধারে নির্জনে চলত তালিম। শিক্ষা শেষ হলে প্রতিদিন তাঁরা স্বামী-স্ত্রীতে দুজন মিলে গড়ের মাঠে ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খেতে বের হতেন। সে সময় কাদম্বরীর ঘোড়ায় চড়ে স্বামীর সাথে হাওয়া খেতে বের হওয়া রীতিমতো আলোড়ন জাগিয়েছিল কলকাতার রক্ষণশীল সমাজে।

কাদম্বরীর মধ্যে ছিল এক চিরন্তন মাতৃহৃদয়। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে দেখাশোনা করতেন। কারো জ্বর হলে শিয়রে কাদম্বরী, বাচ্চাদের কিছু সমস্যা হলে সাথে সাথে ছুটলেন কাদম্বরী। যেখানে 'ঠাকুরবাড়িতে আদর ছিল নিছক বিনোদনমাত্র'। সদ্য মাতৃহারা দেবর ছোট্ট বালক রবিকেও তিনি পরম স্নেহে তাঁর কাছে টেনে নিয়েছিলেন, অথচ কতই বা বয়স তখন কাদম্বরীর! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বড়জোর এক কি দেড় বছরের বড়।

রবি ঠাকুর ও তাঁর নতুন বৌঠানের যে সম্পর্ক ছিল স্নেহের-মায়ার, সেই সম্পর্ক অনেক গবেষকের কল্পনায় সমবয়সি হওয়ার কারণে হয়ে উঠল পরকীয়ার। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ তো এই পরকীয়াকে পরোক্ষভাবে কাদম্বরীর আত্মহত্যার কারণ বলে প্রতিষ্ঠা অবধি করে দিলেন।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু সুন্দর, তার সব কিছুর সাথে জড়িয়ে রয়েছেন কাদম্বরী। তিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এসে তিনতলার ছাদে গড়ে তুললেন “নন্দন কানন”। পিল্পের উপর বসানো হল সারি সারি পাম গাছ। আশেপাশে  চামেলী, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাঁপা ফুলের গাছ। তার সাথে এল হরেক রকম পাখি। ঘর সাজানোর দিকে প্রথম থেকেই কাদম্বরীর দৃষ্টি ছিল প্রখর। দেখতে দেখতে ঠাকুরবাড়ির চেহারা তিনি পালটে দিলেন।

ঠাকুরবাড়ির ছাদে কাদম্বরীর সাজানো বাগানে সন্ধ্যাবেলায় বসত গানের আসর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বাজাতেন বেহালা, রবীন্দ্রনাথ ধরতেন গান। কাদম্বরী নিজেও ভালো গায়িকা ছিলেন। বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী তিনি, গান ছিল তাঁর রক্তে। কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ি আসার পর তিনতলায় এল পিয়ানো। শুধু তাই নয়, কাদম্বরীর উৎসাহে ঠাকুরবাড়ির ছাদে বসত সাহিত্যপাঠের আসর। যে আসরে যোগ দিতেন বাড়ির অনেকেই। আর বাইরে থেকে আসতেন সাহিত্যিক অক্ষয় চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী শরৎকুমারী। আর মাঝে মাঝে আসতেন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারী ছিলেন এই সভার স্থায়ী সদস্য। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী’র কবিতা কাদম্বরী খুব ভালোবাসতেন। এই বিহারীলাল ছিলেন রবিঠাকুরের কাব্যগুরু, 'ভোরের পাখি'। কাদম্বরী বিহারীলালের কবিতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে একখানি আসনও বুনে উপহার দিয়েছিলেন।

কাদম্বরীর ছিল বইয়ের নেশা। তবে নিছক সময় কাটাবার জন্য তিনি বই পড়তেন না। বই পড়ে সেগুলোকে উপভোগ করতেন। ভাবতেন। তবে নিজে পড়ার চেয়ে শুনতে ভালোবাসতেন বেশি। দুপুরে রবীন্দ্রনাথ বই পড়ে শোনাতেন তাঁর নতুন বৌঠানকে, হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করতেন কাদম্বরী।

কাদম্বরী একজন ভালো অভিনেত্রীও ছিলেন। নাট্যরসিক জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মন আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল কাদম্বরীর মতো গুণবতী স্ত্রীকে পেয়ে। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে মাটির উঠোনে জ্যোতিরিন্দ্রের লেখা প্রহসন “এমন কর্ম আর করব না”তে প্রথম অভিনয় করলেন কাদম্বরী। যে নাটকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নায়কের ভূমিকায়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিলেত যাত্রার আগে এই প্রহসনটি সফলভাবে অভিনীত হয়। এরপরে 'বসন্ত উৎসব' এবং 'মানময়ী' নাটকেও কাদম্বরী বেশ ভাল অভিনয় করেন।

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখার ব্যপারে কাদম্বরীর উৎসাহ ছিল সকলের চোখে পড়ার মতো। কিন্তু তারপর আকস্মিকভাবে কাদম্বরী চুপ করে যান। যার কারন জানা যায় না। কারো মতে বৌঠানের হয়ত অভিমান হয়েছিল, রবি তাঁর থেকে দূরে চলে যাবে এই ভাবনা কাদম্বরীকে ভাবিয়ে তুলেছিল।

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই কাদম্বরীর অকালমৃত্যু হয়। ঘটনাটি ঘটে আকস্মিক। কারো মতে, কাদম্বরীর মৃত্যু আকস্মিক হতে পারে কিন্তু অপ্রত্যাশিত একেবারেই নয়। কারণ গবেষকদের মতে- "কাদম্বরী ছিলেন প্রচণ্ড ইন্ট্রোভার্ট, সেন্টিমেন্টাল ও স্কিজোফ্রেনিক।" একবার ছাদ থেকে প্রায় পড়তে পড়তে বেঁচে যান। আর বাঁচিয়ে ছিলেন রবি ঠাকুরই।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে -“কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিণাম”। সম্ভবত জ্ঞানদানন্দিনীর সাথেই ছিল তাঁর প্রবল মতান্তর।

রবি ঠাকুরের দিদি স্বর্ণকুমারী বেশিরভাগ সময় লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর ছোট্ট মেয়ে ঊর্মিলা সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত। ঊর্মিলার খুব কাছের একজন ছিলেন কাদম্বরী। যে তাকে খাইয়ে দিত, স্নান করিয়ে দিত কিন্তু ঊর্মিলা একদিন সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা গেল। সবার রাগ গিয়ে পড়ল কাদম্বরীর ওপর। আড়ালে কাদম্বরীকে নিয়ে নানান আলোচনা চলতে লাগল। এমনকি ছোট বাচ্চা ঊর্মিলার মৃত্যুর জন্য কাদম্বরীকেই দায়ী করা হল। কাদম্বরীর ঘরের মধ্যে লুকিয়ে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর উপায় ছিল না।

ঠাকুরবাড়ির অনেকেই নানান কারণে কাদম্বরীকে অপমান করা শুরু করেছিল। খোঁটা দেওয়া চলছিল নিয়মিত। কেউ কেউ মেনে নিতে পারেনি এক কর্মচারীর মেয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা থেকে জানা যায়, কাদম্বরীর পিতা ছিলেন ঠাকুরবাড়ির এক সামান্য কর্মচারী এবং দাদু ছিলেন দারোয়ান!

কাদম্বরীর মতো সুরসিকা, রুচিশীলা, প্রতিভাময়ী নারীর জীবনে শান্তির অভাব ঘটতে থাকল। সন্তানহীনতার ব্যথা তাঁর অভিমানকে আরো তীব্র করে তুলেল। সেকালে বন্ধ্যা নারী ছিলেন সমাজে উপেক্ষার পাত্রী। সমাজে সংসারে কোথাও তাঁর তেমন কোনো কদর ছিল না, কাদম্বরীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। একাকিত্ব ভুলতে কাদম্বরী আফিম নেওয়া শুরু করলেন। কাছের বলতে ছিলেন রবি। তিনিও বিয়ের পর নিজের স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটক নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো দিন রাতে বাড়ি ফেরেন, না হলে রাত কাটান থিয়েটারের লোকজনদের সাথেই। স্বামীর সাথে কথা প্রায় বন্ধ। অনেক সমালোচকের মতে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অবহেলা অনেকখানি দায়ী কাদম্বরীর মৃত্যুর জন্য। অথচ কাদম্বরীর মৃত্যুর পর রূপবান গুণবান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কিন্তু দ্বিতীয় বিবাহ করেননি!

কাদম্বরীর প্রতি সবার অবহেলার সীমা ছাড়াল। কাদম্বরী আর সহ্য করতে পারছিলেন না। শোনা যায় এর মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জোব্বার পকেট থেকে কাদম্বরী একদিন উদ্ধার করেন নটীর চিঠি। অনেক গবেষক এই চিঠিকে মৃত্যুর কারণ বলে মনে করেন। সেদিন কাদম্বরী দেরাজ থেকে শিশি খুলে নিয়ম মাফিক আফিমের চেয়ে অনেক বেশি আফিমের গুলি খেলেন।

আর উঠলেন না ঠাকুরবাড়ির আধুনিকা। চোখ বুজলেন রবি ঠাকুরের প্রাণপ্রিয় বৌঠান। মহর্ষি এলেন। দেখলেন বৌমার মৃতদেহ। কাদম্বরীর শেষ চিহ্ন ছিল যে লেখাটি, তা দেবেন্দ্রনাথ দেখলেন। একটু চুপ থাকলেন। তারপর সেটিও আগুনে পুড়িয়ে দিলেন।

ঋণ : ১|রবিজীবনী (১খণ্ড- ৯ম খণ্ড)- প্রশান্ত কুমার পাল ২|ঠাকুরবাড়ির কথা- হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় ৩|ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল- চিত্রা দেব ৪|প্রথম আলো- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ৫|আমার জীবনস্মৃতি- জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ৬|রবীন্দ্রজীবনকথা – প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ৭|বিশ্বভারতী প্রকাশনা ৮|রবীন্দ্র লাইব্রেরী ৯| শান্তিনিকেতন

Developed by DXDasia