
তাঁর ছবির মায়ার কাছে ফিরে আসতেই হবে আবহমান শিল্প শিক্ষার্থী ও শিল্পরসিকদের
“… তুলি আমাকে কোলে তুলে নিয়েছে। এই তুলি দিয়ে প্রথম বয়সে ফুলের কুঁড়ি আঁকতে শিখি। এ শিক্ষার পেছনে ছিল পিতৃদেবের প্রেরণা। তিনিই আমায় ঠেলে দিয়েছেন বাল্যবয়সে ছবি আঁকার ঝোঁক লক্ষ্য করে, ঠেলে দিয়েছেন এই শ্রেষ্ঠ আদর্শের পথে। অবশ্য এ পথের পুরষ্কার কী, কোনও পুরষ্কার আছে কিনা, আজও আমার বোধের বাইরে। কাজ করে যাই, শিল্পের সঙ্গে লেগে আছি— এটাই আমার পুরষ্কার। আমি এর সহজ নাম দিয়েছি ‘আনন্দ’। আর্ট মানে আনন্দ কিংবা আনন্দ মানে আর্ট। তবে এ আজব দেশের অচল সমাজে আর্ট হেজে গেছে। আর্টের না আছে আদর না আছে আর্টকে কাছে টেনে নেওয়ার স্বভাব। দেখতে পাই গাল ভরা বাণী আর ছোটাছুটি, চিৎকার, চারপাইয়ে বসে কাজ করার স্বভাব নেই। এখানেই মস্ত বড়ো প্রশ্ন ওঠে— আছাড় খাবে আর চিৎকারে চারদিক চিবিয়ে খাবে। বলবে, বাপু আর্ট তো করো, আনন্দ তো পাও, কথা হচ্ছে অর্থাগম কেমন করে হয়? অর্থই হল আদি অনাদিকালের স্বয়ং দেবতা। এ দেবতার দেখা কী করে পাও? এ দেবতাকে দেখতে চাইনি, দেবদারু গাছ দেখতে বেরিয়ে পড়েছি। আমার মুখ বুজে যায়, উত্তর আসে না। কেননা আর্টের অর্থ— যার বাজারে চলতি নাম টাকা— এ কেমন করে আনব তা নিয়ে আঁকার গোড়ায় মাতামাতি করিনি। আর্ট নিয়ে জীবন আরম্ভ করেছি— আর্টেই নিজেকে শেষ করব— এই একব্রহ্ম প্রতিজ্ঞা বা ব্রত নিয়ে আছি। এতেই আমাকে রাখনেওয়ালা রেখেছেন— রাসকেল হতে দেননি। রোদ ভালো লাগে, রোদ উঠলে আরাম লাগে— এই রোদের মধ্যে দেখতে পাই বাণী লেখা আছে— এ বাণী বুকে বিঁধে গেলে তার জীবন ধন্য হয়। পাকা ধানের রং দেখে তাই পাগল হয়ে যাই।”
(আত্মকথা, গোপাল ঘোষ)
চিত্র – ১
চিত্র – ২
রোদের হলুদ আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর; আবার কখনও নিঃসঙ্গ নৌকো নীল জোৎস্নাকে বুকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে নদী ও মাটির সীমানায়। তাঁর রঙে-রেখায় প্রকৃতির কোলে নারী স্থির হয়ে আছে আবহমানকাল। আবার কোনো চিত্রপটে দৃপ্ত তুলির টানে নীল পাহাড়ের গায়ে লাল সূর্যের ক্ষতবিক্ষত দৃশ্য— যেন জলরঙে, রেখায়, প্যাস্টেলে শাশ্বত প্রকৃতির সঙ্গে এক প্রেমিকের সংলাপ; চিরায়ত প্রকৃতির রূপকে ছবির মাধ্যমে বন্দনা। যা আজও বিমোহিত করে শিল্প-রসিকদের, ছবির রং চুঁইয়ে পড়ে সিঞ্চিত করে রসিকের মন।
চিত্র – ৩
চিত্র – ৪
চিত্র – ৫
শিল্পী-সাধক শ্রী গোপাল ঘোষের জন্ম কলকাতার সিমলা অঞ্চলে (৫ ডিসেম্বর, ১৯১৩)। শৈশবে তাঁর পিতার উৎসাহে ছবি আঁকার সূচনা, যা তিনি আমৃত্যু বুকে ধরে লালন করে গেছেন। ১৯৩১ সালে মহারাজা স্কুল অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট, জয়পুরে ভর্তি হন শিল্পশিক্ষার জন্য। ১৯৩৫ সালে ডিপ্লোমা নিয়ে পাশ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে মাদ্রাজ আর্ট স্কুলে (১৯৩৬) প্রখ্যাত ভাস্কর শ্রী দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে পাঠ নেন উচ্চশিক্ষার। তারপর যত পথ এগিয়েছেন এই মরমী সাধকের ছবির রঙে-রেখায় প্রকৃতি, মানুষ ধরা দিয়েছে নব নব রূপে। গভীর ধ্যানে তিনি তাঁর চারপাশকে ধরেছেন নিজস্ব আঙ্গিকে যেখানে বাস্তব রূপ বদলে গেছে তাঁর ক্যানভাসে; পরিচিত দৃশ্য পেরিয়ে তাঁর আত্মাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন রেখার ছন্দে, রঙের উদ্ভাসে ও দৃঢ়তায়।
চিত্র – ৬
চিত্র – ৭
১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টে। পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে যোগ দিয়েছিলেন কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। তাঁর শিক্ষকতা-পর্বের সময়ও এক অন্যতর ইতিহাসকে বুকে ধরে রেখেছে। তাঁর বহু কৃতি ছাত্র পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্প জগতের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। কলকাতা পেইন্টার্সের অন্যতম মুখ্য সদস্য এই শিল্পী ওয়াশিংটনের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টের উদ্যোগে এশিয়ার শিল্পীদের নিয়ে যে মহাপ্রদর্শনী (১৯৫৬) হয়েছিল তার অংশ হিসেবে ছিলেন। বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
চিত্র – ৮
চিত্র – ৯
গতকাল, অর্থাৎ ৩০ জুলাই (১৯৮০) শিল্পী গোপাল ঘোষ আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যে শ্যামলিমা, পাকা ধানের গন্ধ, মানুষ ও প্রকৃতিকে তিনি রেখে গিয়েছিলেন আমাদের সামনে, সেই স্তব্ধতার কাছে, সেই মায়ার কাছে ফিরে আসতেই হবে আবহমান শিল্প শিক্ষার্থী ও শিল্পরসিকদের — আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখব এক মগ্ন প্রেমিক শিল্পী ও প্রকৃতির নিঃশব্দ কথোপকথন।
চিত্রশিল্পী — গোপাল ঘোষ
ছবি সৌজন্যেঃ গৌরব কেতন লাহিড়ী
