
প্রতীকী ছবি
রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প সবসময় সম্ভাবনাময়। সেই সময় এবং আজও। ছোটো ছোটো দুঃখব্যথার হদিশ দেয় যে গল্প তার চরিত্রগুলো এমনিতেই পাঠকের মনের স্ক্রিনে চলমান। ফলে তারা যে চলচ্চিত্রের পৃথিবীতে নিজেদের সপ্রতিভ প্রকাশ ঘটাবে একথা বলাই বাহুল্য। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) সমসময়ে চলচ্চিত্র শিল্পটি সবেমাত্র সেজে উঠছে। রবীন্দ্রনাথের গান ও গল্প এখনকার মতো তখনও চলচ্চিত্রের অন্যতম মূল আকর ছিল। কিছু ছোটোগল্পে রবীন্দ্রনাথের অজান্তেই ছিল চিত্রনাট্যের বীজ। রবীন্দ্রনাথ যেকোনো শিল্পেই অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ এবং সর্বকালের সেরা আধুনিক। কলমের ম্যাজিক স্পর্শে যে জটিল মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন গল্পের চরিত্রগুলির নির্মাণে, তাকে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা বেশ কঠিন। তাও আবার নির্বাক চলচ্চিত্রের (Silent Film) সময়। তবু সেই সময়কার নবীন পরিচালকরা চেষ্টা করে গিয়েছেন এবং আজও চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্যবহার অভিজাত প্রকাশ বলেই গণ্য হয়। ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন চলচ্চিত্র নামের শিল্পমাধ্যমটির সঙ্গে। উদ্যোগটি নিয়েছিলেন নীতিন বসু (Nitin Bose)। ১৯১৭ সালে শান্তিনিকেতনে (Shantiniketan) গিয়ে উত্তরায়ণে রবীন্দ্রনাথের গানের উপর ভিত্তিকরে গড়ে ওঠা নৃত্যনাট্যের ছবি তুলে, সেগুলিকে প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রশান্ত মহলানবীশের ল্যাবরেটরিতে গিয়ে প্রজেক্ট হিসেবে তৈরি করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়েছিলেন। ১৭ মিনিটের ছবি, ১৬টি ফ্রেম। বারবার দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নীতিন বসুর চোখে আনন্দাশ্রু দেখে রথীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন তাঁর চোখ মুছিয়ে দিতে।
রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’ (Manbhanjan) ছোটোগল্পটি ‘সাধনা’ পত্রিকার বৈশাখ, ১৩০২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটির আরেকটি তাৎপর্য আছে। ১৯২৩ সালে এই গল্পটির চলচ্চিত্র রূপ দিয়েছিলেন নরেশচন্দ্র মিত্র। তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি থেকে নির্বাক চলচ্চিত্র হিসেবে গল্পটির নবরূপে প্রকাশ ঘটেছিল। সাদা কালো নির্বাক ছবিটি ছিল আটটি রিলের। গোপীনাথ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নরেশ মিত্র নিজে। সোনা নামের এক অভিনেত্রী হয়েছিলেন গিরিবালা। ১৯৩০ সালে ‘মানভঞ্জন’ গল্প নিয়ে আবার চলচ্চিত্র হয়। চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন মধু বসু। প্রযোজনা করেছিলেন ম্যাডন থিয়েটার্স। এই সিনেমায় গিরিবালা হয়েছিলেন ললিতাদেবী। ধীরাজ ভট্টাচার্য ছিলেন গোপীনাথের ভূমিকায়। ১৯৪৭ সালে প্রথম সবাক হিন্দি চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পায় ‘মানভঞ্জন’ গল্পটির চলচ্চিত্র রূপ, এবার তার নাম হয় ‘গিরিবালা’। পরিচালনায় আবার মধু বসু এবং প্রযোজনায় ছিল মধু বসু প্রোডাকশন। অভিনয় করেছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী, ধীরাজ ভট্টাচার্য, হীরালাল, রাজলক্ষ্মী,পূর্ণিমা, তুলসী লাহিড়ী প্রমুখ। নায়িকা গিরিবালার ভূমিকায় ছিলেন তখনকার নবাগতা ইন্দ্রাণী।
১৯২৩ সালে এই গল্পটির চলচ্চিত্র রূপ দিয়েছিলেন নরেশচন্দ্র মিত্র। তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি থেকে নির্বাক চলচ্চিত্র হিসেবে গল্পটির নবরূপে প্রকাশ ঘটেছিল। সাদা কালো নির্বাক ছবিটি ছিল আটটি রিলের।
১৯২৩ সালেই ‘মানভঞ্জন’ সিনেমার একটি রিভিউ প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকায়। লিখেছিলেন সুধীরচন্দ্র সরকার। সিনেমাটি তাঁর মোটের উপর ভালো লাগেনি। কারণ রবীন্দ্রনাথের বিয়োগান্ত গল্পটি সিনেমার দর্শকদের জন্য হয়েছে মিলনান্তক। গোপীনাথ চরিত্রটিকে শুধু মাতাল হিসেবে দেখানো হয়েছিল। অথচ চরিত্রটির শেড বোঝার জন্য শুধু মাতালের অভিনয় যথেষ্ট নয়। গিরিবালার মনখারাপ বোঝাতে টেবিলের উপর রাখা একটি হারমনিয়াম বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল মাত্র। অথচ গিরিবালার চরিত্রটি আশ্চর্য জটিল। তার মধ্যে সিনেমার গিরিবালা ‘কথা ও কাহিনি’ বইটি খুলে ‘সোনার তরী’ কবিতা পড়েছিলেন। আদতে ‘কথা ও কাহিনি’-তে ‘সোনার তরী’ কবিতাটিই নেই। এছাড়াও পোশাক, মেকআপ কোনোটাই পছন্দ হয়নি সুধীর সরকারের। পরে হরেন্দ্রনাথ দত্ত ছবিটি নিয়ে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। চলচ্চিত্রের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু সুধীরচন্দ্র সরকারের কথাটি উপেক্ষা করার মতো নয়। ‘নাচঘর’ পত্রিকাতেও ছবিটির বিরূপ সমালোচনাই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই তুলনায় মধু বসুবেশ দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। চিত্রনাট্য লেখার পর মধু বসু রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হন। রবীন্দ্রনাথ পরম যত্নে গিরিবালার সিনারিওটি আদ্যোপান্ত পরিবর্তিত করে দেন। ক্রাউন সিনেমাহলে ছবিটি প্রকাশের দিনে রবীন্দ্রনাথ নিজে উপস্থিত ছিলেন এবং মধু বসুকে খুশি হয়ে আশীর্বাদও করেন। এই ছবিতে প্রথম রিফ্লেক্ট ব্যবহার করা হয়। সাংবাদিকদের জন্য প্রেস শো আয়োজন করা হয়। ছবিটি যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। ১৯৩০ সালে ‘বায়োস্কোপ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘আমাদের দেশে যথেষ্ট অসুবিধা সত্ত্বেও আলোকচিত্র যে এত সুন্দর হতে পারে এর পূর্বে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’
রবীন্দ্রনাথ পরম যত্নে গিরিবালার সিনারিওটি আদ্যোপান্ত পরিবর্তিত করে দেন। ক্রাউন সিনেমাহলে ছবিটি প্রকাশের দিনে রবীন্দ্রনাথ নিজে উপস্থিত ছিলেন এবং মধু বসুকে খুশি হয়ে আশীর্বাদও করেন। এই ছবিতে প্রথম রিফ্লেক্ট ব্যবহার করা হয়।
‘মানভঞ্জন’ ছিল রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রভাব রয়েছে গল্পের কথকতায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রাধা, কৃষ্ণ, বড়াই — এই তিনি মূল চরিত্র। ‘মানভঞ্জন’-এ গিরিবালা, গোপীনাথ এবং সুধামুখী— এই তিনটি চরিত্র। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বড়াই যেমন রাধার রূপ বর্ণনা করে, সুধাও তাই। কিন্তু এই গল্পে গোপীনাথ কোনোভাবেই গিরিবালার প্রতি অনুরক্ত নয়। অনুরক্ত যে হবে না গোপীনাথ, তার ইঙ্গিত আছে গল্পের চরিত্রদুটির নামে। গোপীনাথ নামের মানে কৃষ্ণ এবং গিরিবালা পার্বতী, দুর্গা। পরিণতি বিয়োগান্তই হবে। গিরিবালা গল্পটিতে একটি একলা সৃষ্টিশীল মেয়ের জীবনযাপন এবং আধুনিক মন গুরুত্ব পেয়েছে। মেয়েটি অসম্ভব সুন্দরী, আত্মসচেতন অথচ দিনের পর দিন স্বামীসঙ্গ বঞ্চিত। মেয়েটি নার্সিসাস। নিজের রূপে নিজে মুগ্ধ। সুধার বচন অমৃতের মতো গ্রহণ করে নিজের বিষাক্ত বাস্তব থেকে নিজেকে আড়াল করে। গোপীনাথের অবহেলা চরম হলে গিরিবালা গৃহত্যাগ করে এবং ফিরে আসে থিয়েটারের মনোরমা হয়ে। থিয়েটারে দুখিনী মেয়ে ধনী হয়, উদাসীন স্বামীর অনুরাগ পায়। গল্পের ভিতর গল্প বুনেছেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ বাস্তবে? গোপীনাথ গিরিবালাকে স্টেজে দেখে নিষ্ফল ক্রোধে আস্ফালন করে। পাগলের মতো বলে, ‘আমি ওকে খুন করব, ওকে খুন করব।’ পুলিশ এসে টেনে নিয়ে যায় গোপীনাথকে। গিরিবালা দেখেও দেখে না। তারপর?
তারপর ‘সমস্ত কলিকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না।’ মানভঞ্জন হল একরকমভাবে। তবে এক্ষেত্রে নায়কের প্রয়োজন হল না। নায়িকা নিজেই নিজের অভিমান অতিক্রম করে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করল। একটি মানুষের জন্য তার মনের দরজা সপাটে বন্ধ করে। এই অত্যন্ত আধুনিক প্লট ও মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি করা সেকাল কেন একালের পুরুষের পক্ষেও বোঝা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ অনায়াসে নারীমনের নিভৃত মনের অনুভূতির প্রকাশ করলেন। চলচ্চিত্রে তা প্রকাশ করা বেশ কঠিন। চলচ্চিত্রে গিরিবালার উপর সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে গল্পের সেই শব্দগুলির দিকে ঝোঁক যাওয়া প্রয়োজন ছিল— ‘—স্বামীর প্রতি তাহার মনে প্রবল অবজ্ঞার উদয় হইল। সে জর্জরিতচিত্তে মনে করিল, যদি কখনো এমন দিন আসে যে স্বামী তাহার রূপে আকৃষ্ট হইয়া দগ্ধপক্ষ পতঙ্গের মতো তাহার পদতলে আসিয়া পড়ে এবং সে আপন চরণনখরের প্রান্ত হইতে উপেক্ষা বিকীর্ণ করিয়া দিয়া অভিমানভরে চলিয়া যাইতে পারে, তবেই তাহার এই ব্যর্থ রূপ, ব্যর্থ যৌবন সার্থকতা লাভ করিবে।’
‘মানভঞ্জন’ প্রতিশোধের গল্প। তার চলচ্চিত্রায়নেও পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার এমনকি মানও নয়, গিরিবালার প্রতিশোধ নেওয়ার ভঙ্গিটাই ক্যামেরা সাউন্ড ও অ্যাকশনের মূল ফোকাস হওয়া উচিত।
সহায়ক গ্রন্থঃ
গল্পগুচ্ছ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ, প্রথম খণ্ড, শর্মিলা ঘোষ সেন (সম্পাদনা)

