June 28, 2017 | 12:00 PM

বাংলার অন্নকথা-৭

যে কালো চাল আমাদের রাজ্যে এখনও কয়েকজন কৃষক চাষ করেন, একসময় চিনে সাধারণ মানুষের খাওয়ার জন্য তা চাষ হত না। কেবল রাজপরিবারের জন্য কালো চালের ধান চাষ হত ঘেরা জায়গায়। চিনে একে বলা হত রাজার চাল। ২০১০ সালে গবেষণায় দেখা যায়, রঙিন চালে অ্যান্থোসায়ানিন থাকে। তবে কালো চালে থাকে সবচেয়ে বেশি। কালো ভাত ক্যানসার প্রতিরোধ করে। স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মারাত্মক। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। লিভার ভালো রাখে। রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলও নিয়ন্ত্রণে রাখে। আফ্রিকার দেশগুলোতে এই চাল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের দেশের অসম, মনিপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় চাষ হয় ঠিকই, তবে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সেই চাল কিনে নিয়ে বিক্রি করে দেন বিদেশে। বহুজাতিক সংস্থার বিজ্ঞাপন আর বাজারজাত করার কায়দায় আমাদের দেশের কালো চাল বিদেশ হয়ে কখনও কখনওআমাদের কাছে ফিরে আসছে চড়া দামে।

অ্যান্থোসায়ানিন আছে লাল, বাদামী, হালকা বাদামী, হালকা বেগুনি, গোলাপী, হালকা সোনালি রঙের চালে। আমাদের রাজ্যের ঝিঙেশাল, বুড়ি শাল, কেয়াকেলাস, ভাদুই হল লাল চাল। বাদামী চাল হল বাঁশপাতি, অসিতকলমা। সাদাজিরা, সোনাপুরী হল হালকা বেগুনি। হালকা বাদামী রঙের চাল হল ভুতমুড়ি, অগ্নিবীনা, গীতাঞ্জলি। সোনালি চাল অন্নপূর্ণা, লালকামিনী, মালাবতী লাল দশাভোগ, বৈদদুলহা। গোলাপী চাল হল পরমাইশাল, গীতাশ্রী, লালঝুমুর, বাঁশপাতা পারমিতা, রাজলক্ষ্মী, বাঁশতারা। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে,এদের মধ্যে লাল চালে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে সবচেয়ে বেশি। লাল চালে আয়রন থাকে ৬৮.৭ শতাংশ, জিঙ্ক থাকে ৩০ শতাংশ। টাইপ টু ডায়াবেটিসের রোগীকে খেতে বলেন চিকিৎসক, হাড়ের শক্তি বৃদ্ধি করে, ওবেসিটি কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর রয়েছে রানীকাজল। এই চালে সাদার ওপর কালো ছোপ রয়েছে। ড. দেবল দেব ওড়িশায় তাঁর বসুধা ধান্য সংরক্ষণ কেন্দ্রে, আর ড. অনুপম পাল নদিয়ার ফুলিয়ার ধান্য সংরক্ষণ ও গবেষণাগারে এ নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। পুরানো পদ্ধতিতে গোবর সার দিয়ে এ রাজ্যের বহু কৃষক এই ধান চাষ করছেন। কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গনা, তামিলনাড়ু, কর্নাটকে আমাদের রাজ্যের পুরানো চালের চাহিদা বাড়ছে। খেজুরছড়ি আর নারকেলছড়ি নামের দু’ধরনের ধান এখনও চাষ হয় এরাজ্যে। ধানের শিস থোকাথোকা। ভাত খেতে খুব মিষ্টি। আর গভীর জলে হয় সমুদ্র ফেন ধান। বসুধার দেবদুলাল বলছিলেন এই ধান নিয়েও তাঁরা গবেষণা করছেন।

উত্তরাধিকার সূত্রে এরাজ্যের বহু কৃষক পুরানো ধানের চাষ করছেন ঠিকই, তবে সাবেকি কৃষক জানতেন কোন ধানের কী গুণ। এখন বৃষ্টি হলে ধান গাছের গোড়া পচে যায়। বৃষ্টি কম হলে চাষ হয় না। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জমিতে ধান নষ্ট হয়। ঝড় হলে ধানের গাছ পড়ে যায়। তারপর ক্ষতি পূরণ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সরকার। বিমা সংস্থা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাবেকি চালের বিপণন ব্যবস্থার উদ্যোগ নিলে, আর সরকারের উৎসাহ পেলে ফসল মার যেত না। উৎপাদন আরও বাড়ত। মানুষ এখনও খাঁটি খেতেন, বহু রোগের হাত থেকে মুক্তি পেতেন। বলছিলেন বাদুড়িয়ার লবঙ্গের ৮৫ বছরের কৃষক আজিজার গাজী।