June 14, 2017 | 12:00 PM

বাংলার অন্ন-কথা ৫

এ-রাজ্যে এখনও ৫০ জাতের পুরনো ধান চাষ করেন কৃষক, যা উচ্চফলনশীল। বহুরূপী, বউরানি, কেরালা সুন্দরী, তুলসীভোগ, অসিতবর্মা। সাদাঝুমুর বিঘে প্রতি ফলন দেয় ১৮ থেকে ২০ বস্তা। স্বর্ণ, আইআর-৩৬, মাসুরি ধানের চেয়ে উৎপাদন কোনো অংশে কম নয়। এ ধানের চাষ করতে গেলে রাসায়নিক সার দিতে হয় না জমিতে। গোবরসার দিলেই হয়, কীটনাশক লাগে না। পোকা মারতে কৃষক দেশজ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। আশ্বিন মাসের শেষে ধান গাছে থোড় আসত, তখন ধানের শিস নষ্ট করে দিত পোকায়, আশ্বিন মাসের শেষ দিনে সন্ধে নামলে পাড়ায় পাড়ায়, মাঠে মাঠে জ্বলে উঠত মশাল। হিন্দু-মুসলমান আবালবৃদ্ধবনিতা হাতে মশাল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরতেন আর গাইতেন “আশ্বিন যায় কার্ত্তিক আসে মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে”। পোকা মরত সেই আগুনে। আর তাতেই উচ্চ ফলন হত। রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃষক এই ধান চাষ করে দেখেছেন, ফলন ভাল হয় না।

আমাদের রাজ্যে একসময় ৫ হাজার ৫৫৬ জাতের ধান ছিল। এর মধ্যে সুগন্ধি ধান ছিল ৩০০ জাতের। পুজোতে দেওয়া হত সীতাভোগ, জগন্নাথভোগ, লক্ষ্মীভোগ, কমলভোগ, সাদাভোগ, গোবিন্দভোগ, দেউলাভোগ। বাড়ির নতুন বৌয়ের জন্য চাষ হত বৌভোগ, জামাই নতুন হোক বা পুরনো, বাড়িতে এলে রান্না হত জামাইশাল বা বাদশাভোগ। তখন বর্ধমানের সীতাভোগ তৈরি হত খাসকামিনী অথবা সীতাভোগ চাল দিয়ে। আর এখন সীতাভোগ হয় অন্য চাল দিয়ে। জয়নগরের মোয়া তৈরি হত কনকচূড় চাল দিয়ে, এখন তৈরি হয় স্বর্ণ বা আইআর-৩৬ চাল দিয়ে। ফলে সেই স্বাদ আর নেই। তবে এখনও অনেকে বাড়ির জন্য গন্ধকচু, বেনামূলি, রাধাতিলক, লড়ুই ধানের চাষ করেন, শীতে খেজুরগাছে রস এলে তা দিয়ে তৈরি হয় পিঠে আর পায়েস। সুগন্ধি ধান আবার জমির চরিত্র আর আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। বর্ধমানের আবহাওয়ায় গোবিন্দভোগ চাষ করলে প্রকৃত স্বাদ আর গন্ধ পাওয়া যায়, কিন্তু মাটি বদলে দিলে চালের গন্ধ আলাদা হয়ে যাবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় চাষ হয় লীলাবতী, অলি, দুই দিনাজপুরে চাষ হয় তুলাইপঞ্জী, কালোনুনিয়া চাষ হয় জলপাইগুড়িতে, বাঁকুড়ায় চাষ হয় বাদশাভোগ। দেখা যায় জেলা পাল্টে গেলে এইসব সুগন্ধি ধানের ভাল উৎপাদন হয় না, প্রকৃত গন্ধও পাওয়া যায় না। বাসমতি যেমন আমাদের রাজ্যে ভাল হয় না, যত বরফ পড়বে তত ভাল হবে উচ্চফলনশীল তারাদি বাসমতি।

বহুজাতিক সংস্থাগুলো মাঝেমাঝে গ্রামে গিয়ে সেমিনার করে কৃষককে বোঝানোর চেষ্টা করে, পুরনো ধান এখনকার আবহাওয়ার অনুকূল নয়, ঝড়ে গাছ পড়ে যাওয়ার  সম্ভাবনা, বেশি বৃষ্টি হলে গাছ পচে যাওয়ার ভয় থাকে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় যেখানে বহুজাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এখনও ব্যবসায়িক সাফল্য পাননি, সেখানে চাষ হচ্ছে পুরনো ধান। সুন্দরবনের জয়গোপালপুর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের দীনবন্ধু দাসের কাছে এমন ৫০ জাতের ধান রয়েছে, বসুধার দেবদুলাল বলছিলেন ‘হলদেবাটালি’ বেশি জলে জন্মায়,
জলে যত ঢেউ হবে তত ফলন ভাল হবে, ‘হোগলা’ তিন ফুট জলে খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘হ্যামিল্টন’ ঝড়ে পড়ে গেলে ফের উঠে দাঁড়ায়, ‘ন্যাতো’ জমিতে জল যত বাড়ে তত লম্বা হয়। ‘সাদামোটা’ ২৪ ঘণ্টা জলের তলায় থাকলেও পাতা পচে যায় না।এসব চাল খেতেও মিষ্টি। ১৪/১৫ বছর ধরে পুরনো ধান চাষের দিকে কৃষক ঝু্ঁকছেন ঠিকই কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থে উৎসাহ দেওয়ার মত উদ্যোগ সরকারি তরফ থেকে এখনও নেওয়া হয়নি। বাঁকুড়ার সোনামুখির ভৈরব সাহানি বলছিলেন, ‘সরকারি উৎসাহ পেলে বিষমুক্ত চাল পেতেন কৃষক।’