May 7, 2017 | 12:00 PM

আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ

আদিগন্ত সবুজ, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। অথবা গ্রাম, উঠোনে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে ছাগল-মুরগি; দাওয়ার এককোণে হাতপাখা দিয়ে মাটির উনুন উসকে দিচ্ছে গৃহিণী। এসব দৃশ্যে বড় মায়া নেমে আসে। আমরা যারা শহরে থাকি অথচ প্রাণ খুঁজতে মন রাখি গ্রামে; কখনও পৌঁছতে না পারলে, ছুঁয়ে দেখব কী করে? ইন্দ্রিয় ভরসা। কখনও বইয়ের পাতা, কখনও ছবি, কখনও বা সিনেমার হাত ধরে ঘুরে বেড়াই গ্রামের পথে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘোর আনে কে? তর্কে যাব না। প্রতিটা মাধ্যমই নিজের মত সুন্দর। তবে, বইয়ের পাতা যে-গ্রামের কল্পনা বুনে দেয়, ছবি যার মুহূর্ত ধারণ করে, সিনেমা তাতেই চলমানতার পালক বসায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে আলপথ, আর একটা দীর্ঘশ্বাস দানা বাঁধে শহুরে হাওয়ায় – যদি হাঁটা যেত একবার…

আমি পশ্চিমবঙ্গের এখনকার সিনেমায় খুব কম খুঁজে পেয়েছি গ্রামের সেই সুর। ‘এখনকার’ বলতে একুশ শতক। বাণিজ্যিক সিনেমার কথা বাদই দিচ্ছি, কেননা সেখানে নির্মাতাদের প্রাণ ছোঁওয়ার থেকে বেশি তাগিদ থাকে মানুষকে মোটা দাগের বিনোদন সরবরাহের। কিন্তু যাদের সেই তাগিদ নেই, যারা সিনেমাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, ভাবাতে চান মানুষকে, তাঁদের ছবিতেও তেমন দেখতে পেলাম কই! এই মুহূর্তে অনেক ভেবেও ‘আমি আদু’, ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘পাকারাম’ আর ‘বিসর্জন’ ছাড়া আর কোনও ভালো সিনেমার কথা মনে করতে পারছি না। পশ্চিমবঙ্গের অন্যধারার ছবিগুলির অধিকাংশই কলকাতাকেন্দ্রিক – কোনও কোনও ছবিতে মফঃস্বলের ছোঁয়া পাওয়া যায় অবশ্য। হ্যাঁ, অল্প হলেও, মফঃস্বলের কাছে কিছুটা হলেও পৌঁছোতে পেরেছেন নির্মাতারা। নইলে প্রায় সবাই কলকাতার কথাই বলেন – এসি রুম, মদের গ্লাস আর শহুরে যাপন না-দেখালে তাঁরা বোধহয় স্মার্টনেস খুঁজে পান না। কয়েকজন পরিচালক কিছু সিনেমায় বাঙালির অভ্যন্তরকে ছুঁতে চেয়েছিলেন – তবে সেখানে সম্পর্কের টানাপড়েনই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। অথচ আমার মধ্যে যে-দর্শক বাস করে, খুব সামান্য চাহিদা নিয়ে মাঝেমধ্যে মায়ার পায়েও মাথা রাখতে চায় যে, কোথায় খুঁজবে আশ্রয়? ‘এখনও সেই বৃন্দাবনে বাঁশি বাজে রে’ – ভবা পাগলার গান মনসুর ফকিরের গলায় যে আবেশ এনেছিল ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-য়, অন্য কোথায় পাব তারে?

আমি শ্বাস নিই বাংলাদেশের সিনেমায়। সেখানকার মাঠ-নদী-গাছপালা-মানুষজন আমাকে নিয়ে যায় না-দেখা কোনও এক জমানায়। কোন জমানা? খোঁজার বদলে ডুব দিই গভীরে। উঠে আসে নৌকো, ভেসে যেতে যেতে বাঁক নেয় আমার যাপনে। ‘মাটির ময়না’, ‘লালসালু’, ‘পিতা’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘টেলিভিশন’, ‘জালালের গল্প’, ‘মনের মানুষ’, ‘রানওয়ে’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘দর্পণ বিসর্জন’, ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’, ‘মনপুরা’, ‘গেরিলা’, ‘গাড়িওয়ালা’, ‘একাত্তরের নিশান’, ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ – এর বাইরেও আরও কত! সব নাম মনেও নেই। কিন্তু জানি, চোখ আরাম পেতে চাইলে আমি ঠাঁই খুঁজব ওই সিনেমাগুলিতেই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অভিনয় হয়তো তত ভালো নয়, কিন্তু কাহিনীর বুনন ও দৃশ্যসৌন্দর্য সেই অভাব ঢেকে দেয় অনেকটাই। বাংলাদেশ এখনও গ্রামকে ভুলে যায়নি। কাহিনী আলাদা, আলাদা মানুষজনও – কিন্তু তার মধ্যেও পরিচালকরা ঠিকই অটুট রাখেন গ্রামের স্পন্দনটুকু। শুধু সিনেমাই নয়, টেলিভিশনের জন্য বানানো নাটকেও গ্রামের আদর পাওয়া যায় অনেকসময়। তার কারণ বোধহয় প্রকৃতি এখনও বাংলাদেশের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। সারল্য এখনও লেগে আছে আবহে। পরিচালকরাও, মানুষের কথা বলতে চেয়ে শহরেই আটকে থাকেন না শুধু, নিজেদের প্রসারিত করেন দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিতে। যা শহরের থেকে অনেকটাই আলাদা। আর সেখানেই টান লাগে। উড়ে যাই। নেমে আসি লাটাইয়ের কথা শুনে। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ।

 ‘মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে / তোমারে পুষিলাম কত আদরে’ – যে-দেশে বসে এমন গান লিখে গেছেন শাহ্‌ আবদুল করিম, সেই দেশের মাটির কাছে আশ্রয় চাইতে সংকোচ কী! যতদিন সাক্ষাৎ না হয়, সিনেমাই হোক মাধ্যম। পশ্চিমবঙ্গের সিনেমায় যা খুঁজে পাইনি, বাংলাদেশ তা দিয়েছে আমায়। হৃদমাঝারে রাখিব, ছেড়ে দিব না…