August 7, 2017 | 12:00 PM

১৩ বাঙালিকে ‘বিনা বিচারে’ আটকে রেখেছে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ

নয়ডায় কাজ করতে গিয়ে জেলবন্দী ১৩ বাঙালি জামিন পাচ্ছেন না। জামিনের অন্যতম শর্ত, অস্থাবর সম্পত্তির নথি জমা করতে হবে (যেমন মোটর বাইকের রেজিস্ট্রেশন নথি)। অথচ এই মানুষগুলো এতই গরিব যে তাদের কাছে এমন কাগজ পত্র কিছুই নেই। এরা কেউ আমাদের রাজ্যের ছিট মহলের বাসিন্দা। কেউ উত্তর দিনাজপুর, কারও বাড়ি মালদায়। নয়ডার বিভিন্ন আবাসনে পরিচারিকার কাজ করতেন এরা, কেউ ভ্যান চালান, কেউ কাজ করেন ইট ভাটায়। এদেরকে প্রথমে স্থানীয় পুলিশ বাংলাদেশি বলে গ্রেফতার করে। পরে ভোটার আই ডি ইত্যাদি দেখে পুলিশ বুঝতে পারে এরা ভারতীয় এবং পশ্চিমবঙ্গবাসী। কিন্তু জামিনের এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে যে সে সব নথি তাদের কাছে নেই। ফলে তারা জামিন পাচ্ছেন না। সাবেক ছিট মহলের নেতা (বর্তমানে বিজেপির কর্মকর্তা) দীপ্তিমান সেনগুপ্ত ছিট মহলের মানুষ বন্দি আছেন শুনে ছুটে গিয়েছিলেন নয়দা। দীপ্তিমান টেলিফোনে বললেন, ‘বলতে বাধ্য হচ্ছি উত্তরপ্রদেশ সরকার কিছু করছে না। আমি এখানে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকদের বলেছি। তাঁরা বলেছেন স্বরাষ্ট্রসচিবকে জানাবেন। কিন্তু এখনও কাজ কিছু হয়নি। সরকারি স্তরে কথা না হলে ওদের জামিন পাওয়া যাবে না’।

রুটি–রুজির তাগিদেই ভিন্‌রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন ওঁরা। পেটের খিদে মেটাতে কারও পরিচয় ‘পরিচারিকা’, কেউ ‘সবজিওয়ালা’। কেউ বা ইটভাটার শ্রমিক, ভ্যানচালক, দিনমজুরও।

যেমন জোহরা বিবি।সাবেক ‘ছিট’–এর বাসিন্দা— পোয়াতুরকুঠির। পরিচারিকার কাজ করছেন নয়ডায়। শুধু ‘ছিটমহল’ নয়, কয়েক হাজার মানুষ, কারও বাড়ি দিনহাটা, নাজিরহাট, মেখলিগঞ্জ, হলদিবাড়ি, কারও বা মালদা।  জোহরা বিবি এখনও নিখোঁজ। ১২ জুলাই থেকে তাঁর খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। আর তাঁকে ঘিরেই সম্প্রতি ‌উত্তাল হয়েছিল নয়ডার সেক্টর ৭৮ নম্বরের শারফাবাদ আবাসন এলাকা। ওই আবাসিকদের অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৩ জনকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করেছে নয়ডা থানার পুলিস। গ্রেটার নয়ডার দাসনা জেলে তাঁরা বন্দি। দীপ্তিমান সেনগুপ্ত নয়ডা থেকে ফিরে সংবাদ মাধ্যমকে বললেন, ‘মিথ্যা অভিযোগে ওদের জেলবন্দি করেছে পুলিস। বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে।’

উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডার গা–ঘেঁষে শারফাবাদে অভিজাত আবাসন ‘মাহাগুন মডার্ন সোসাইটি’।ওই বহুতল আবাসনের উল্টোদিকে ও তার আশপাশে ঝুপড়ি, টিনের চালের বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা অসংখ্য গরিব মানুষ। ভিনদেশে কাজের সন্ধানে চলে এসেছেন এঁরা গত কয়েক বছরে। সংখ্যাটা অন্তত ৬০ হাজার তো হবেই। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে ছিটমহলেরই সাড়ে তিন হাজার বাসিন্দা রয়েছেন। সংগঠনের তরফে এই হিসেব দীপ্তিমানদের। মাহাগুন মডার্ন সোসাইটি আবাসনে ফ্ল্যাটের সংখ্যা দু’হাজারেরও বেশি। গৃহস্থালির কাজে বাংলার খেটেখাওয়া এই সব মানুষের ওপরই নির্ভরশীল এই গোটা আবাসন।

শারফাবাদের ওই আবাসনের কাছেই ৫০ নম্বর সেক্টরে থাকেন রফিকুলরা। তাঁরও বাড়ি সাবেক ছিটমহলের পোয়াতুরকুঠিতে। তিনি ও তাঁর প্রতিবেশী আতিকুর রহমান এখন জেলবন্দী। রফিকুলের ভাই জামশের। খবর পেয়ে চলে এসেছেন নয়ডায়। জামশের বলেন, আদালতে তোলার কথা হলেও পুলিস পেশ করছে না কাউকে।

কী হয়েছিল?

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ছিটের বাসিন্দা জোহরা বিবি পরিচারিকার কাজ করতেন ওই আবাসনেরই একটি ফ্ল্যাটে। চুরির অপবাদ দিয়ে তাঁকে আটকে রাখা হয় গোটা রাত। জোহরার প্রতিবেশীরা অবশ্য মালিকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, জোহরার শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। সেই অপরাধ ধামাচাপা দিতে ভয় দেখায় ফ্ল্যাটের মালিক। চুরির অপবাদ দিয়ে আটকে রাখে। বাড়ি না ফেরায় সবাই জোহরাকে খুঁজতে যান ওই আবাসনে। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীরা আটকে দেয় তাঁদের। স্থানীয় পুলিসের অভিযোগ এর পরই ঝুপড়িবাসীরা চড়াও হন। আবাসনের বাইরে জড়ো হয়ে ইট‌পাথর ছুঁড়তে থাকেন। এই ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবাসিকদের অভিযোগ ইতিমধ্যেই অন্তত ৬০টি ঝুপড়ি ভেঙে দিয়েছে নয়ডা কর্তৃপক্ষ। তাদের মত জবরদখল করে সরকারের জমিতে ঝুপড়ি গড়ে তোলা হয়েছিল।

দীপ্তিমান সেনগুপ্তর বললেন, ‘উত্তরপ্রদেশ সরকারের সঙ্গে অবিলম্বে রাজ্য সরকারের কথা বলা দরকার। যাতে মুক্তি পান ওঁরা’। তিনি বলেন, ‘ছিটমহল হস্তান্তর হল। কিন্তু  এখনও জমি রেজিস্ট্রি করা যাচ্ছে না। পরচা–দলিলে নাম ওঠেনি। ছিট–অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে স্কুল–কলেজ, হাসপাতাল  হচ্ছে না। কাজ নেই কারও। সে জন্যই ভিন্‌রাজ্যে চলে যাচ্ছেন এঁরা।’