
এই বিষয়ে এখন আলাদা করে বলতে হয়, আলোচনা করতে হয়, সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক বোধহয় সেটাই। শিরোনামটিই বলে দেয় যে এক্ষেত্রে নয় নারীর অধিকার ছিল না এবং এখনও নেই অথবা এক্ষেত্রে নারীর অধিকার থাকার কথাই নয়। এবার যদি ধর্মীয় আচার দিয়ে বলতে শুরু করি, তাহলে প্রথমেই আসবে ধর্ম কী এবং কবে থেকে এর পালনের আরম্ভ। সংক্ষেপে বললে, মানুষের সভ্যতার আরম্ভ যেদিন থেকে, সেইদিন থেকেই ধর্মের আরম্ভ। ধর্মের মূল ভাগটি হল মানবধর্ম। যার আচার বা নিয়ম হল পাশে থাকা। আমার না ভেবে আমাদের ভাবতে শেখা। আর গৌণ ভাগটি হল প্রকৃতির শক্তিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার বা বুঝে উঠতে পারার ক্ষমতা না থাকার জন্য এক ধরণের ভয় আর সেই ভয় থেকে ভক্তির জন্ম আর সেই ভক্তি থেকে ধর্মীয় আচারের সৃষ্টি হওয়া।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় ধর্মের গৌণ অর্থটা মুছে যাবে, তা নয়, বরং সেটাই আরও বেশি করে ধর্মের অর্থ হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে তা পালনের নিয়ম আর আচার জটিলতর হয়ে উঠতে লাগল। শুধু তাই নয়, ধর্ম পালনের অধিকার আস্তে আস্তে সবার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হল। একমাত্র ব্রাহ্মণ পুরুষ বলে দেবে কীভাবে ধর্মের নিয়মকানুন পালন করতে হয়। এবং সেই কাজটাও সেই ব্রাহ্মণই করে দেবে। ব্রাহ্মণ এবং পুরুষ।
মেয়েদের হাতে রইল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। আর পুরুষ, বিশেষত ব্রাহ্মণ পুরুষের হাতে রইল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। এবং এইটাই যেন নিয়ম হয়ে গেল। যে মেয়েরা এক সময় বৈদিক সূক্ত রচনা করেছেন, প্রতিদিন যজ্ঞ করেছেন, বিতর্কসভায় অংশগ্রহণ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থেকেছেন, চিকিৎসাবিদ্যা শিখেছেন, শাস্ত্রবিদ হয়েছেন; সেই মেয়েদের স্থান হল অন্তঃপুরে।
বাংলার প্রথম মহিলা পুরোহিত গৌরী ধর্মপাল
স্বাভাবিক ভাবেই ধর্ম পালনের যে সহজ ভাবটি ছিল, সেটিও ক্রমশ কমতে কমতে পুরোটাই আচারসর্বস্ব হয়ে উঠল। জাঁকজমক এতটাই বাড়ল যে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ঈশ্বর ভজনা ক্রমশ দূরে সরতে থাকল। ধর্মের সত্যিকারের অর্থ ঢাকা পড়ে গেল বাইরের ফাঁপা ঢক্কানিনাদে।
একইসঙ্গে মেয়েদের থেকে ধর্ম পালনের অধিকার অদ্ভুত ভাবে কেড়ে নেওয়া হল। অদ্ভুত এই জন্য, যে আচার পালনের যত কঠিন কর্তব্য, ব্রত, উপবাস, পুজোর যাবতীয় যোগাড়, এইসব পড়ল মেয়েদের উপর। অথচ বলা হল ওঁ উচ্চারণ করা, বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করা, পুজো করার অধিকার মেয়েদের নেই। আসলে ইতিহাস বারবার দ্বৈতশাসনের উদাহরণ তৈরি করেছে। এই ধর্ম পালনের ক্ষেত্রেও তাই। মেয়েদের হাতে রইল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। আর পুরুষ, বিশেষত ব্রাহ্মণ পুরুষের হাতে রইল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। এবং এইটাই যেন নিয়ম হয়ে গেল। যে মেয়েরা এক সময় বৈদিক সূক্ত রচনা করেছেন, প্রতিদিন যজ্ঞ করেছেন, বিতর্কসভায় অংশগ্রহণ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থেকেছেন, চিকিৎসাবিদ্যা শিখেছেন, শাস্ত্রবিদ হয়েছেন; সেই মেয়েদের স্থান হল অন্তঃপুরে। কর্তব্য হল শুধুই বিবাহ করে স্বামীর সংসার প্রতিপালন, সন্তানের জন্ম দেওয়া আর চার দেওয়ালের অন্ধকারে মাথা কুটতে কুটতে একসময় সেই অন্ধকারেই নীরবে বিলীন হয়ে যাওয়া।
পুরোহিত শব্দটির লিঙ্গ কী? শব্দটির অর্থ কী? পুর অর্থাৎ আগে থেকে যিনি মঙ্গল কামনা করেন। এখানে যিনি মঙ্গল কামনা করছেন, বা যার জন্য করছেন, কারুরই তো কোনও লিঙ্গ নির্দিষ্ট করা নেই! প্রত্যেক মা-ও তো তার সন্তানের হিত কামনা করেন। বিপদ থেকে আগলান। নিজে সামনে থেকে। তাহলে পুরোহিত শব্দটির অর্থে গেলে প্রত্যেক মা-ই তো একজন আদর্শ পুরোহিত। আর যদি যাগযজ্ঞের কথাও ভাবি, কোথায় বলা আছে যে একজন মেয়ে এই ধরনের কাজ করতে পারবে না? আসলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে এই ছাপ ফেলে দিয়েছে। একজন পুরোহিতকে চিন্তা করলেই আমাদের মনে পৈতেধারী একজন পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে। তাই শুধু পুরোহিত শব্দটিকে আক্রমণ করে তো লাভ নেই! বরং অপছন্দ হলে এর সমার্থক কোনও শব্দ ব্যবহার করো। যে শব্দে তথাকথিত এলিটিজম নেই। যে শব্দে তুমি অপরকে হেয় করছ না। যেমন ধরা যাক, অনুষ্ঠান পরিচালক। বা সঞ্চালক। এমন একজন, যিনি উপস্থিত সকলের মঙ্গল কামনা করে সমগ্র কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মূল কথা হল কাজটি কী। এবং সঞ্চালক বা পরিচালক সেই কাজটি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন কিনা। যেমন ঘুরতে বেরোলে নতুন জায়গা সম্পর্কে জানার জন্য আমরা গাইড খুঁজি। যিনি ওই অঞ্চলের খুঁটিনাটি রাস্তা চিনবেন, ইতিহাস জানবেন। এই গাইড, তিনিও কিন্তু পুরোহিত। আসলে বহু যুগের অভ্যাস আর নিজেদের ভাবনাচিন্তার অভিমুখীতা একজন গাইডকে পুরোহিত ভাবতে মস্তিষ্কে বাধা সৃষ্টি করে। আর আমরা শব্দটিকে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিনিধি করে নয় শিরোধার্য করি অথবা পদতলে ফেলে রাখি।
অপর্ণা সেনের কন্যার বিবাহে পৌরহিত্যে গৌরী ধর্মপাল
এইবারে আসি সেই মেয়েদের অধিকারের কথায়। বেশিদিন আগের কথা নয় কিন্তু। বছর তিরিশেক হবে। আন্দোলনের তো অনেক প্রকার হয়। আজকাল দেখি ভাঙচুর, গালিগালাজ, মারদাঙ্গা—এসবই যেন আন্দোলনের ধরণ হয়ে গেছে । আর উচ্চ শ্রেণীর ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিসরে বসে কথা বলা বা বড়ো জোর মোমবাতি মিছিল! “আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়”। শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত কবিতার লাইন। কিন্তু যাঁরা কাজের মানুষ, সত্যি মানুষ, তাঁদের আন্দোলন হয় নীরবে, প্রয়োগের মাধ্যমে; অথচ তার ফলটা হয় সুদূরপ্রসারী।
নব্বইয়ের দশক চলছে তখন। বেশ আধুনিক হয়ে উঠেছি ততদিনে। হোপ 86 হয়ে গেছে (অনেকেরই মনে আছে নিশ্চয়ই সেই নাচাগানার আসরটির কথা), ইংরেজি বুলি কপচাচ্ছি, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা বাড়ছে। এমন সময় কলকাতা এলেন মহামহিম পুরীর শঙ্করাচার্য। বিরাট সম্মানীয় অতিথি, তাঁর সম্বর্ধনার ব্যবস্থা হল তেমনই। সেই অনুষ্ঠানে বেদপাঠ করতে উঠলেন বিখ্যাত শিল্পী, সবার প্রিয় অরুন্ধতী রায় চৌধুরী। প্রখ্যাত কবি যশোধরা রায়চৌধুরীর মা। শুরু করলেন বেদগান। সবাইকে চমকে স্তব্ধ করে মাঝপথে কর্কশ স্বরে তাঁকে থামিয়ে দিলেন শঙ্করাচার্য। বললেন সেই বহু যুগ ধরে ব্যবহৃত ক্লিশে বাক্যটি, “বেদপাঠে মেয়েদের অধিকার নেই।” অপমান হজম করতে বাধ্য হলেন শিল্পী। উপস্থিত কেউ প্রতিবাদ করলেন না। এত বড়ো আধ্যাত্মিক পুরুষ বলে কথা! আর এই বিষয়ে মানুষ তো এটাই জানেন। কারণ এটাই জানানো হয়। সুতরাং মঞ্চ থেকে মুখ বুজে নেমে আস্তে হল শিল্পীকে।
কিন্তু হল প্রতিবাদ। শান্তভাবে। এই কলকাতাতেই পরপর দুটি বিয়ে হল। এখনকার ভাষায় হাই প্রোফাইল বিয়ে। প্রখ্যাত লেখিকা বাণী বসুর মেয়ের এবং অপর্ণা সেনের বড়ো মেয়ে কমলিনীর বিয়ে। বিয়ে হল সম্পূর্ণ বৈদিক পদ্ধতিতে। এই বিয়ে দুটিতে পৌরোহিত্য করলেন এক মহিলা। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের সংস্কৃতের খ্যাতনামা অধ্যাপিকা শ্রীমতী গৌরী ধর্মপাল। বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিজের করা বাংলা অনুবাদসহ।
এই বিবাহ-সূক্ত, যা আমাদের বিয়ের আদি ও আদর্শ রূপ, যেখানে পরবর্তী কালে অনেক বেনোজল ঢুকেছে, বহু অবমাননাকর দেশাচার ঢুকেছে; তা কিন্তু এক মেয়ের রচনা। ঋষিকা বা ঋষি সূর্যা। যে বেদে একের পর এক মেয়ে ঋষির সূক্ত আছে, সেই বেদ মন্ত্র মেয়েরা উচ্চারণ করতে পারবে না! ঝুটো ব্রাহ্মণত্ব আর পিতৃতান্ত্রিকতার মূর্খামি! আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এই অচলায়তনে নিঃশব্দে ঘা দিলেন গৌরী ধর্মপাল। এটা অবশ্য প্রথম ধাক্কা। আরও আছে।
সত্যি বলতে কী, মনে হয় দ্বিতীয় ধাক্কাটি আরও বড়ো। বিশেষ করে এখন যে হারে ধর্মীয় উন্মাদনাকে বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে, সেই প্রেক্ষাপটে এই ধাক্কাটি সত্যিই বৈপ্লবিক। কারণ যেখানে সাধারণ প্রার্থনা মন্ত্রের শব্দ পরিবর্তনে সবাই ক্ষেপে ওঠে, অবশ্য এই সাধারণ শব্দটির ব্যবহারেও ধর্মের ধ্বজাধারীরা ক্ষেপেই উঠবেন। গৌরী কিন্তু বেদের মন্ত্রে পরিবর্তন করলেন। শুভ দৃষ্টি আর মালাবদলের মন্ত্রের শুরুতে। গৌরী যেমন তাঁর ভাবনা অনুযায়ী শব্দ বদলালেন, আমরাও আমাদের সময়ে আমাদের মতো করে বহু শব্দ বদলালাম। আচারে পরিবর্তন আনলাম। এমন যে কোনও আচার বা শব্দ, যা বরবধূ, দুজনের একজনকেও ছোটো করবে, তার কিছুই নেই আমাদের পুরোনোতুন বৈদিক বিবাহে।
এই কলকাতাতেই পরপর দুটি বিয়ে হল। এখনকার ভাষায় হাই প্রোফাইল বিয়ে। প্রখ্যাত লেখিকা বাণী বসুর মেয়ের এবং অপর্ণা সেনের বড়ো মেয়ে কমলিনীর বিয়ে। বিয়ে হল সম্পূর্ণ বৈদিক পদ্ধতিতে। এই বিয়ে দুটিতে পৌরোহিত্য করলেন এক মহিলা। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের সংস্কৃতের খ্যাতনামা অধ্যাপিকা শ্রীমতী গৌরী ধর্মপাল।
বিবানুষ্ঠানে পৌরহিত্য করছেন রোহিণী ধর্মপাল ও অন্যান্যরা
একইভাবে গৌরীর দেখানো পথেই আমরা শ্রাদ্ধ কাজও শুরু করেছি। শ্রাদ্ধ শব্দটিতে হৃদয় যুক্ত আছে। তাই শ্রাদ্ধ শুধু নিয়ম আর বিরাট একটি ফর্দমাত্র নয়। এই কাজটিও ব্রাহ্মণদের অসাধারণ অবদান। মৃত্যুর পরের জগতের কথা বলে ভয় পাইয়ে দেওয়া। মানুষ ভয়ে তথাকথিত দেশাচার মেনে শ্রাদ্ধ করে। যেখানে প্রতি পদে আচারসর্বস্বতা ছাড়া কিছুই নেই!
ধর্মীয় আচার বলতে আমি বুঝি এমন পরিবেশ তৈরি করা, এমন আচরণ করা যেখানে সবাই সমান হবেন। সবাই সহজ হবেন। কোথাও কোনও আড়াল থাকবে না। ধর্ম বলতে যদি ঈশ্বর ভক্তিও বুঝি, তাহলেও যিনি সেই পথে চলতে চান, একাই পারবেন। একই সঙ্গে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ধর্মের আসল অর্থ বুঝতে হবে। বোঝাতে হবে। ধর্মের কুপ্রভাবের শিকল ছিঁড়ে ফেলে আগে মেয়েদের নিজেদের বুঝতে হবে ধর্ম পালন মানে কী। কোন ধরনের আচরণ সমাজের পক্ষে সত্যিই হিতকর। আমার মতে, সেইটাই হবে আদর্শ ধর্মপালন। আদর্শ পৌরোহিত্য।
__________________
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

