নগ্নতায় কেন ছুঁতমার্গ?

খুব ছোটোবেলার একটা কথা মনে পড়ে। মামারবাড়ির লাইব্রেরিতে বইয়ের আলমারির পাশে দুটো হাতে-আঁকা জলছবি টাঙানো ছিল, দুই অজন্তাসুন্দরী। নগ্নিকা, নীবিবন্ধ থেকে শ্রোণীদেশ বেয়ে উল্লম্ব ঝুলছে রত্নখচিত মালিকা, হাতে, মাথায়, পায়ে, কানে অজস্র অলংকার। কিন্তু উন্মুক্ত নিটোল দুই স্তন, তার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে বক্ষবিভাজিকা বেয়ে ঝুলতে থাকা মণিমালা, নিখুঁত ত্রিভুজে। আমার শিল্পরসিক দাদুর সংগ্রহ। কিন্তু একদিন কোন দুষ্ট সরস্বতী ভর করল মাথায়, সোজা গিয়ে দিদাকে প্রশ্ন করেছিলাম, আচ্ছা ওরা কাপড় পরেনি কেন? পরের দিন থেকে লাইব্রেরি ঘরের সেই ছবি উধাও হয়ে গেল, শূন্য পেরেক দুটোর চারপাশে শুধু অনেকদিন ধরে দেখা গেল ফ্রেমবাঁধাই ছবির চৌকোণা সীমানারেখাগুলো। তারপর কালের নিয়মে একদিন অদৃশ্য হল তাও। অথচ, যতদিন এই দুই ভদ্রমহিলা দেয়াল আলো করে ছিলেন, তাঁদের থাকাটা এত স্পষ্ট করে জানান দেয়নি কখনও। কিন্তু যেদিন থেকে ছবি দুটোর অস্তিত্বের সব চিহ্ন এসে ঠেকল ওই শূন্য চৌখুপিতে, সেদিন থেকেই আমার মনে ভর করেছিল নিষিদ্ধতার আভাস। যেন ওদের থাকার কথা ছিল না এখানে, যেন কোন অবৈধ অনুপ্রবেশ শেষপর্যন্ত ঠেকিয়ে দিল কড়া নিয়মের অদৃশ্য হাত। আমি আর কোনোদিন প্রশ্ন করিনি।

চার দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরে পর্যন্ত এই যে অজস্র শুদ্ধতাবাদী নিষেধ সারাক্ষণ ঘিরে রয়েছে আমাদের দেখার চোখ, এর কারণ হিসেবে যদি কেউ বলেন ‘অনভ্যাস’, সেখানেই আসলে ঘটবে সবচেয়ে বড়ো ভুল।

নগ্নতা বিষয়ে সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। পরে ভেবে দেখেছি, এই যে নগ্নিকাদেহের অজস্র সম্ভার ছড়িয়ে আছে আমাদের চিরন্তন ভাস্কর্যরীতিতে, মন্দিরশিল্পে, স্থাপত্যের আনাচেকানাচে, এই ‘দেখার অভ্যেস’-এও আমাদের চোখ তো পাল্টাল না? একটিমাত্র নিরীহ প্রশ্নের উত্তরের মোকাবিলা করতে না পেরে ওই অপরূপ সৌন্দর্যকেও হার মানতে হল সেদিন। কারণ, নগ্নতার আভাস কোথায় কীভাবে থাকা উচিত, সে বিষয়েও একেবারে চরমপন্থী ক্ষেত্রবিভাজন একেবারে সামাজিক বন্ধনের গোড়া থেকে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে আমাদের মাথায়। ঠিক যে যুক্তিতে আমি সেদিন জানলাম, এই নগ্নতা ‘স্বাভাবিক’ নয়, এই নগ্নতা মন্দিরশোভার পরিচায়ক হতে পারে, কিন্তু গৃহশোভার উপযুক্ত নয়, এই নগ্নতার মধ্যে সর্বোপরি ‘নিষিদ্ধতা’ আছে।

কেরালার মালমপুঝা উদ্যানের যক্ষী মূর্তি

১৯৬৯ সালে কেরালার মালমপুঝা শিল্পোদ্যানে ভাস্কর্যশিল্পী কানায়ি কুনিরামণ একটি অপরূপা যক্ষীমূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। আজ থেকে ঠিক ৫৫ বছর আগে তৈরি এই ত্রিশ ফুট উচ্চতার মূর্তিটি আজও ভারতের উচ্চতম নগ্নিকাভাস্কর্য। যক্ষিণী এখানে অপরূপা, অসামান্য তার দেহসৌষ্ঠব। গাছ আর পাহাড়ের নীলচে সবুজ দৃশ্যপটের মধ্যে বসে আছে পাথরে গড়া নারীমূর্তিটি, দুই পা হাঁটু ভেঙে দু-দিকে ছড়ানো। আর দুই হাত ভাঁজ হয়ে উঠে এসেছে খোলা চুলে ঢাকা দুই কানের দু-পাশে, যেন কিছু শোনার প্রতীক্ষায় আকুল। যক্ষিণীর কোমর থেকে দেহকাণ্ড সামান্য এগিয়ে এসেছে যেন, আর তাতেই আরও আবেদনময়ী হয়ে উঠেছে শরীরের রহস্য। চারপাশে পাথর মাটি আর গাছের বুকে হঠাৎ জেগে-থাকা পর্বতমালার প্রেক্ষাপটের এক আশ্চর্য প্রতিফলন যেন দেখা যাচ্ছে যক্ষিণীদেহেও। অথচ এই অলোকসামান্য মূর্তিটিকে নিয়ে শুদ্ধতাবাদীদের কম ফরমান সইতে হয়নি। বারবার এ মূর্তি সরিয়ে ফেলার, নষ্ট করে দেওয়ার নিদান এসেছে। তবু রয়ে গেছে, নিজের সমস্ত অস্তিত্বের বিশাল প্রকাশ প্রতিনিয়ত আকাশপানে ছুঁড়ে দিতে দিতে, অন্তত এখনও অবধি রয়ে গেছে।

দুটো ঘটনা, একটা ঘরের, অন্যটা বৃহত্তর পরিসরের। চার দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরে পর্যন্ত এই যে অজস্র শুদ্ধতাবাদী নিষেধ সারাক্ষণ ঘিরে রয়েছে আমাদের দেখার চোখ, এর কারণ হিসেবে যদি কেউ বলেন ‘অনভ্যাস’, সেখানেই আসলে ঘটবে সবচেয়ে বড়ো ভুল। নগ্নতা দেখার অনভ্যাস থেকে কিন্তু কেউ নগ্নতার বিপক্ষে সওয়াল করেন না। আমি যে বয়সে প্রশ্ন করেছিলাম, যথেষ্ট আচ্ছাদনের অভাব বিষয়ে, তখন আমার ওই তিনবছুরে অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে নগ্নতা নেই ঠিকই, কিন্তু সে প্রশ্নে কোথাও অস্বাভাবিকতা ছিল না। এমনকি, নগ্নতাকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে এতটুকু সওয়ালও নয়। নতুন দেখতে শেখা চোখে ঠিক যে কৌতূহল নিয়ে আমি প্রথম পেঙ্গুইনের ছবি দেখেছি, রেড রোডের ধারের ময়দানে প্রথম তাঁবু খাটানো দেখেছি, কিংবা প্রথমবার সমুদ্র দেখেছি, সেই একই অজানা আগ্রহ সেদিন ভরপুর ছিল আমার প্রশ্নে। তাতে প্রথম দেখার রহস্যজনিত আগ্রহ ছিল, কিন্তু কোনো অশ্লীলতা ছিল না। কিন্তু এই যে আর পাঁচটা স্বাভাবিক ‘দেখে চিনতে শেখা’-র অভ্যেস থেকে একেবারে গোড়াতেই আলাদা করে দেওয়া হল ওই নগ্নচিত্র দুটিকে, সেই প্রথম আমি বুঝলাম, এ দ্রব্য হয়তো খোলা চোখে দেখার নয়, এ প্রশ্নে একটা অপরাধ আছে। সেই অপরাধ আসলে আমার প্রশ্নে ছিল না, ছিল প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাওয়ার অস্বস্তির মধ্যে।

বস্তুত এই অস্বস্তি, এই নিষিদ্ধতার বোধ আসে নগ্নতা দেখার ‘অনভ্যাস’ থেকে নয়, নগ্নতা দেখার ‘অভ্যাস’ থেকে। মানুষ নিজেকে নগ্ন দেখে একান্তে, পরম আশ্লেষে নগ্ন দেখতে চায় তার প্রেমাস্পদকে, সেও একান্ত মুহূর্তে। নগ্নতা দেখার সঙ্গে এই নির্জনতা আর একান্তের বোধ লেগে আছে সামাজিক মনস্তত্ত্বের যৌথ নির্মাণের ভেতরে। তাই দৃশ্যমান জগতের ভেতরে, অনেক চোখের সামনে সেই নগ্নতার সৌন্দর্য উপভোগ করার অনুশীলন যাদের হয় না, নগ্নতা তাদের কাছেই হয়ে ওঠে বিড়ম্বনার বস্তু। শিল্পে আধারিত নগ্নতার মধ্যে শিল্পবোধ খুঁজে পাওয়ার অনেক আগেই সে চেনা নগ্নতার দৃশ্য দিয়ে সহজ ‘শর্টকাট’-এ পড়ে ফেলতে চায় ওই শিল্পরূপটিকে। প্রতিটি নগ্নিকারূপকে আসলে জীবন্ত নারীদেহের নগ্নরূপ দিয়ে মনে মনে প্রতিস্থাপন করে অ-রসজ্ঞ চোখগুলি। আর তাতেই এত আপত্তি, এত বারণ।

প্রতিটি নগ্নিকারূপকে আসলে জীবন্ত নারীদেহের নগ্নরূপ দিয়ে মনে মনে প্রতিস্থাপন করে অ-রসজ্ঞ চোখগুলি। আর তাতেই এত আপত্তি, এত বারণ।

নগ্নতার সঙ্গে ক্ষমতার রসায়নটিও এ প্রসঙ্গে একটু ভেবে দেখার। নগ্ন পুরুষদেহ যখন শিল্পসফল হয়, তখন তা সৌষ্ঠবের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে আসে পৌরুষের বিপুল দাপট। আর শিল্পিত নারীদেহ কমনীয়, পেলব, ভোগ্য। পাশাপাশি যদি দাঁড় করাই পৃথিবী বিখ্যাত দুটি ভাস্কর্য— মিকেলেঞ্জেলো-র ডেভিড আর ভেনাস ডি মিলো-কে, তাহলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কাকে বলছি শরীরী পুরুষত্বের দৃপ্ত আভাস, আর দেবী হওয়া সত্ত্বেও কেন অ্যাফ্রোদিতির দেহভঙ্গিমায় কোথাও সেই শক্তিময়ীর শাসন নেই। আরাধ্যা নগ্নিকামূর্তির মধ্যে অবশ্য কালী আছেন, যিনি এ বিষয়ে ব্যতিক্রমী। কিন্তু সে ভয়ংকর করালগ্রাসী রূপের ভেতরে যে সংহারমূর্তি আছে, তার ভয়াবহতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া গেছে নারীদেহজ পেলবতা। তিনি আকাঙ্ক্ষিত নন, কামনার বস্তু নন, কারণ তাঁর কল্পনায় সাধারণ নারীদেহের স্বাভাবিকতা নেই। রক্তমাখা মুখ আর বেরিয়ে-থাকা লোল জিভ তাঁর অবয়বকে মনুষ্যোচিত রাখেনি আর, যাঁর মূর্তি দেখলে সহজে অন্য কোনো নারীদেহ দিয়ে কল্পনার প্রতিস্থাপন ঘটানো সম্ভব।

এলিফ্যান্টা গুহায় গঙ্গাধর শিবের পাশে পার্বতীর মূর্তি

অথচ, ভারতীয় মন্দিরশিল্পে বহু দেবীই মন্দিরগাত্রে দাঁড়িয়ে আছেন নগ্নিকা হয়ে। তাঁদের সবার মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য মোটেই নেই। হরগৌরীর যে যুগনদ্ধ মূর্তিরূপ ইলোরার কৈলাস গুহার প্রায় সর্বত্র, এমনকি ইলোরার অন্য গুহাগুলিতেও দেখতে পাওয়া যায়, তার প্রায় প্রতিটিতেই গৌরী শিবভোগ্যা, দৈবী যৌনতার অনুষঙ্গে চিত্রিতা। প্রায় প্রতিটিতে শিবের বাম হাত পার্বতীর স্তনস্পর্শ করে আছে, কিংবা বেড় দিয়ে ধরে আছে তাঁর ক্ষীণকটি। মহিষাসুরমর্দিনী, কিংবা গজলক্ষ্মীর মূর্তিগুলি দেখলে তো স্পষ্ট বোঝা যায়, কীভাবে প্রথাগত সৌন্দর্যের প্রতিটি সূক্ষ্মতা দিয়ে তিলে তিলে নির্মাণ করা হয়েছে নারী অবয়বগুলিকে। প্রাচীন কাব্যে নারীদেহের যে ধ্রুপদী রূপবর্ণনার ছড়াছড়ি, তার মধ্যে নিবিড়কৃষ্ণ লোচনতারাটি ছাড়া বাকি সবই মিলে যাবে এ মূর্তিগুলির দেহভঙ্গিমার সঙ্গে। কী বলব একে? পুরুষের কামনার মূর্ত প্রতিচ্ছবি, নাকি চরম সৌন্দর্যের চোখ-ধাঁধানো নির্মাণ? আমার মনে পড়ে এলিফ্যান্টা-র গুহায় গঙ্গাধর শিবের পাশে ঈষৎ বঙ্কিম ঠামে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্নিকা পার্বতীমূর্তিটির কথা। মূর্তিটি এমনিতেই বিশাল, তায় দীর্ঘ উরু পার্বতীর দেহখানিকে অসম্ভব উচ্চতা এনে দিয়েছে, আমি মাথা উঁচু করে চেয়ে ছিলাম। আর নীচ থেকে দেখছিলাম বলেই আরও অসম্ভব সুন্দর লাগছিল বক্ষসৌন্দর্য, আর তার পাশাপাশি, আশ্চর্য একটুকরো রোদ এসে ঢুকেছিল গুহার দেয়াল বেয়ে। নীচ থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম অল্প ফোলানো অধরোষ্ঠের ছায়া পড়েছে পার্বতীর চিবুকের ওপর। এই অপরূপার সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের জ্ঞান ছিল না আমার, একে কি শুধুই কাম্য-রম্যের সীমানায় ফেলা যায়?

নগ্ন নারীদেহ কি অশ্লীল? এ প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী নিজের আঁকা নগ্নিকার ছবিটি সামনে রেখে বলেছিলেন, না। পরমুহূর্তেই সেই ছবির হাতে ঘড়ি আর পায়ে মোজা পরিয়ে দিয়ে শিল্পী বলবেন, এবারে অশ্লীল। অর্থাৎ, আমি যা ঢাকতে পারতাম, তা ঢাকিনি। এই প্রদর্শনকামিতাই অশ্লীলতা।

ইলোরার ৩২ নং গুহা

নগ্নমূর্তির সৌন্দর্য আসলে এই চির-আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই। এই আকাঙ্ক্ষা যতক্ষণ সুন্দর, এই নগ্নতাও ততই অপূর্ব। এ দুয়ের তার-ছড় না মিললেই বেসুর বেজে ওঠে। এই প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে ইলোরার ৩২তম গুহায় দেখা যক্ষী সিদ্ধায়িকা মূর্তিটির কথা। ফলভারাবনত পত্রপ্রাচুর্যময় আমগাছের নীচে ললিতাসনে বসে আছেন তিনি, নগ্নিকা, কটিমাত্র বস্ত্রাবৃতা। প্রথম দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। না, সৌন্দর্যের অমন সাংঘাতিক চোখধাঁধানো রূপ দেখে নয়। সেই রূপের ওপরে আছড়ে-পড়া বিকৃতির কদর্যতা দেখে। দেখেছিলাম, পাথরে-গড়া যক্ষীদেহের সর্বাঙ্গে প্রাচীনতার ধুলো, শুধু বুক দুটি সুমসৃণ, পরিচ্ছন্ন, পালিশ-করা যেন, তার রং বাকি দেহের পাথরের রঙের চেয়ে অনেক আলাদা, অনেকটা গাঢ় কালো। আমি মুহূর্তে বুঝেছিলাম এ প্রচুর এবং অগণিত নিত্যস্পর্শের ফল। গুহাটি একটু একটেরে, নির্জন, অন্ধকারময়। সেই অন্তরালে যক্ষী সিদ্ধায়িকা প্রতিদিন কত না অবাঞ্ছিত হস্তসুখের শিকার! শিউরে উঠেছিলাম সেদিন। ঠিক এই কারণেই নগ্নতা মানুষের কাছে অসহ্য। সে এই অন্তরালের সুযোগটুকু নিয়ে যাকে প্রতিদিন প্রতিরোধহীন যৌন পীড়ন করার সাহস দেখায়, সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে সেই নগ্নতার মুখোমুখি চোখ তুলে তাকানোর সাহস তার নেই। কারণ, এই নগ্নতাকে দৈনন্দিনতার থেকে বিযুক্ত করে তার সৌন্দর্য দু-চোখ ভরে দেখার শিক্ষা আমাদের হয়নি। আমরা তাকে অচিরেই কল্পনা করে নিই একটি জাগতিক নির্বস্ত্র মেয়ে শরীরের সঙ্গে, আর তারপর, অশ্লীলতার দায়ে তাকে তুলে দিই কাঠগড়ায়।

হেমেন মজুমদারের তৈলচিত্র

বাংলার শিল্পীদের মধ্যে সিক্ত অথবা প্রায়-উন্মুক্ত নারীদেহে নগ্নতার আভাস এঁকে ভয়ানক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন হেমেন মজুমদার। একটা ছবিমাত্র দিয়ে এই তৎকাল তোলপাড় করা ‘কালচারাল শক’-কে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এই ছবির ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে ছবির বস্তুর শৈল্পিক দূরত্বকে ঘুচিয়ে তাকে রোজের চেনা জগতে টেনে এনে সীমায়িত করে ফেলার সেই রসবোধজনিত অপারগতা। শৈল্পিক নগ্নতা বা নান্দনিক নগ্নতা নিয়ে সেই বিখ্যাত গল্পটার কথা এখানে একবার মনে করাই। নগ্ন নারীদেহ কি অশ্লীল? এ প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী নিজের আঁকা নগ্নিকার ছবিটি সামনে রেখে বলেছিলেন, না। পরমুহূর্তেই সেই ছবির হাতে ঘড়ি আর পায়ে মোজা পরিয়ে দিয়ে শিল্পী বলবেন, এবারে অশ্লীল। অর্থাৎ, আমি যা ঢাকতে পারতাম, তা ঢাকিনি। এই প্রদর্শনকামিতাই অশ্লীলতা। আমি কিন্তু বলব, ছবির এই দ্বিতীয় সংস্করণটিও অশ্লীল নয়। কামনাময়ী হতে পারে, যাকে আবেদনের ভাষায় বলে ‘সেনসুয়াস’, কিন্তু অশ্লীল নয়। যৌন সুড়সুড়ি থাকলেই তা অশ্লীল হয় না, যতক্ষণ না যৌনতার মধ্যে বলপ্রয়োগ হচ্ছে, কিংবা যতক্ষণ না যৌনতা একপাক্ষিক। যৌন আবেদনের মধ্যেও আসলে আছে নিজের সঙ্গে ‘অপর’কে যুক্ত করতে চাওয়ার চিরন্তন ইচ্ছা, নগ্নতার মধ্যেও যে আবেদন থাকে, তা-ও দুই মানুষী শরীরের পারস্পরিক রসায়নের সৌন্দর্যের কথা। দর্শকামের চরিতার্থতায় তার মানহানি হয় না, কিন্তু ধর্ষকামের প্রকাশে তার চেহারাটি সত্যিকারের নগ্ন হয়ে পড়ে, হাজার আচ্ছাদনেও যার মুক্তি নেই।

Written by