
৭ অগাস্ট ‘জাতীয় হস্তচালিত তাঁত দিবস’ ঘোষণার এক দশক পূর্ণ হল এই বছর। ২০১৫ সাল থেকে দেশব্যাপী সাড়ম্বরে, খানিকটা উৎসবের মেজাজেই পালিত হয়ে আসছে দিনটি। রাজ্য তথা কেন্দ্রীয় স্তরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তাঁত নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলির কাছে এই দিনটি যেন বার্ষিক কর্মতৎপরতা প্রদর্শনের দিন। এই পালনের এক দশক পরেও প্রশ্ন জাগে, দেশজোড়া এই বিপুল আয়োজন ও কর্মতৎপরতার পরেও কেন ফুলিয়া বা শান্তিপুরের মতো পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হস্তচালিত তাঁত বয়নকেন্দ্রগুলিতে হাতের তাঁত বন্ধ হতে হতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে? হাতের তাঁতকে উৎসাহিত করার জন্য কেন্দ্র-রাজ্যস্তরে নানাবিধ পরিকল্পনা রচিত হয়। অথচ ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হস্ত-তাঁতশিল্প ক্রমশ যেন কোমায় চলে যাচ্ছে! কিন্তু কেন? এই ‘কেন’-এর উত্তর কি আমরা বাস্তবের মাটিতে পা দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছি?
হ্যান্ডলুম ডে মানেই কিছু প্রদর্শনী, তাত্ত্বিক আলোচনা, সম্বর্ধনা, পুরস্কার ঘোষণা ও প্রদান, তাঁত নিয়ে সরকারি পরিকল্পনা ও কাজের খতিয়ান, ঠাণ্ডা ঘরে বসে ঘর-গরম করা তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁতশিল্প নিয়ে যাঁরা একটু-আধটু নাড়াচাড়া করেন, তাঁরা জানেন, কৃষিপ্রধান দেশ ভারতের অর্থনীতির আঙিনায় দ্বিতীয় বৃহৎ ক্ষেত্র হল তাঁতশিল্প। অথচ পরিসংখ্যান বলছে ১৯৭০ সালে যেখানে সারা ভারতবর্ষে ১২৪ লক্ষ পরিবার হস্তচালিত তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, ১৯৯৫-এ সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬৪ লক্ষ, ২০১০ সালে ৪৪ লক্ষ এবং ২০২০ সালে ৩১.৪৫ লক্ষ।
আর এসবের মধ্যে থেকে কীভাবে যেন সর্বস্তরের, বিশেষ করে সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবহারের আটপৌরে শাড়ি ‘হ্যান্ডলুম’ তকমা নিয়ে ‘এলিট’ হয়ে গেছে! আজকাল বাজারে একটা কথা খুব প্রচলিত- ‘হাতের তাঁতের শাড়ির দাম বেশি, সাধারণের নাগালের বাইরে।’
> কিছুদিন আগেই কাজের সূত্রে যেতে হয়েছিল কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জে। প্রশাসনিক সীমানার দিক থেকে তুফানগঞ্জ ১ ও ২ নং ব্লক তাঁতসমৃদ্ধ অঞ্চল। এই অঞ্চলটি একসময় পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম তাঁতশিল্প কেন্দ্র হিসাবে পরিগণিত হতো। প্রধান উৎপাদিত পণ্য ছিল শাড়ি। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ অঞ্চলেই তাঁত বন্ধ। যেসব জায়গায় তাঁত আছে সেখানে শাড়ি প্রায় উৎপাদিত হয় না বললেই চলে। এই অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্যের পুরোটাই প্রায় মেখলা, চাদর, গামছা ইত্যাদি যার প্রধান বাজার আসাম। মাসখানেক আগে আসাম থেকে হাতের তাঁত নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার কর্ণধার ফুলিয়া এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, আসামে হস্তচালিত তাঁতের যথেষ্ট প্রসার রয়েছে এবং সেখানে হ্যান্ডলুমের জন্য নির্ধারিত পণ্য পাওয়ারলুমে উৎপাদন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এখনও কঠোরভাবে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে। এই কারণেই হয়তো আসাম হস্তচালিত তাঁতশিল্পের ক্ষেত্রে সারা দেশের মধ্যে অগ্রণী রাজ্য।

হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বুনছেন তাঁতশিল্পী গৌরাঙ্গ বসাক
তুফানগঞ্জের তাঁতিরা না হয় পার্শ্ববর্তী আসামের বাজারের ভরসায় এখনও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু গঙ্গারামপুরের তাঁতিদের সে উপায় নেই। গঙ্গারামপুর-এর কথা নিয়ে এলাম কেন? দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এই অঞ্চলটিও একদা তাঁতসমৃদ্ধ অঞ্চল বলেই পরিগণিত হতো। কিন্তু সেখানকার বিস্তীর্ণ তাঁতিপাড়াগুলি ঘুরে ধ্বংসের ছবিই চাক্ষুষ হল। সারি সারি বন্ধ হয়ে থাকা তাঁতঘর, ধুলো জমে থাকা চরকা, ভেঙে পড়া তাঁত— এ যেন গঙ্গারামপুরের তাঁতপল্লীগুলির সাধারণ ছবি। বোরডাঙ্গি এলাকায় যে গুটিকয়েক তাঁত চলছে, তাদের যোগসূত্র ফুলিয়ার সঙ্গে। সেখানকার তাঁতঘরে গিয়ে কথা বলতেই উঠে এল একটি কথা— ‘সাগর যদি শুকিয়ে যায়, নদী কি আর বাঁচে?’ তাঁতশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ফুলিয়াকে তারা সাগরের সঙ্গে তুলনা করছেন। কি তুফানগঞ্জ, কি গঙ্গারামপুর— একদা ফুলিয়ার যোগসূত্রেই সাফল্য পেয়েছিল এই তাঁতকেন্দ্রগুলি।

বন্ধ হয়ে যাওয়া হস্তচালিত তাঁতকেন্দ্র, কাদিঘাট বসাকপাড়া, গঙ্গারামপুর
প্রকৃত অর্থেই ফুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের হস্ততাঁত শিল্পকেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। আজও যারা গবেষণার খাতিরে বা তথ্যচিত্র তৈরির সূত্রে ফুলিয়ায় আসেন, তাঁরা ফুলিয়ার তাঁত দেখে অবাক হন এবং বলেন, “অনেক তাঁত চলছে তো!” আসলে তাঁরা যেটা দেখছেন, সেটা তার বার্ধক্যের কঙ্কালসার চেহারা। ফুলিয়ায় একসময় যত সংখ্যক তাঁত চলত, জন্মসূত্রে এখানকার মানুষ হওয়ায় সেই সোনালি দিনগুলোর শেষের দিকের কিছু প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝি, এখন যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা তার শতকরা ১০ ভাগ! ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাঁতশিল্পের ক্ষেত্রে এক সময় কোন উচ্চতায় উঠেছিল ফুলিয়া! বর্তমানে ফুলিয়ায় তাঁতিপাড়াগুলো ঘুরলে দেখা যাবে, তাঁতের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাঁরাই যাঁদের অন্য কোনও পেশা গ্রহণের সুযোগ নেই, যাঁদের বয়স ষাট বছরের অধিক, ছেলেমেয়েরা চাকরি বা অন্য কোনও পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিবারে মোটামুটি আর্থিক নিরাপত্তা এসেছে— তেমন মানুষরাই। তবে, এমতাবস্থাতেও কেউ কেউ (গবেষক, বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠী, শাড়ি ব্যবসায়ী বা ডিজাইনার) হাতের তাঁত নিয়ে কাজ করছেন এবং তা বাঁচানোর সাধু উদ্যোগে সামিল হচ্ছেন; যদিও সেটা ‘সিন্ধুতে বিন্দু’।
আর এসবের মধ্যে থেকে কীভাবে যেন সর্বস্তরের, বিশেষ করে সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবহারের আটপৌরে শাড়ি ‘হ্যান্ডলুম’ তকমা নিয়ে ‘এলিট’ হয়ে গেছে! আজকাল বাজারে একটা কথা খুব প্রচলিত- ‘হাতের তাঁতের শাড়ির দাম বেশি, সাধারণের নাগালের বাইরে।’ বিগত ৩০-৪০ বছর আগেও যে শাড়ি সর্বস্তরের ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল, আজ হঠাৎ কীভাবে তা দামি হয়ে গেল? এর উত্তর খোঁজার প্রয়োজন কি নেই?

এ দৃশ্য আজ বিরল
এযাবৎ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি দফতর মারফত প্রাপ্ত অনুদানের ভিত্তিতে সমবায়গুলি যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল সমগ্র হস্তচালিত তাঁতশিল্পে। কিন্তু ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মন্দা, করোনা অতিমারি, জিএসটি ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সমবায়গুলি বসে যেতে শুরু করেছে; বর্তমানে আবার বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে হস্ততাঁত শিল্পের পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। সমবায়গুলি যেখানে মরণাপন্ন, সেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে হস্ততাঁত শিল্পের পুনরুজ্জীবন নিয়ে এই শিল্পে ও সমবায়ের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা যথেষ্ট সন্দিহান। এদিকে আবার বিদ্যুৎচালিত তাঁতশিল্পের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে ঋণ, বিদ্যুৎ মাশুল, স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ভরতুকি প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলার বাইরে থেকে বস্ত্র আমদানি হ্রাসের লক্ষ্যেই এই নীতির পরিকল্পনা বলে দফতর সূত্রের দাবি।
হস্তচালিত তাঁতে বোনা টাঙ্গাইল
তবে পাওয়ারলুম কি শুধুমাত্র স্কুল-ড্রেস সহ নানা ধরনের থান কাপড় তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে? শান্তিপুর-ফুলিয়া সহ সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে প্রকাশ্য দিবালোকে পাওয়ারলুম ও র্যাপিয়ার মেশিন লক্ষ লক্ষ শাড়ি তৈরি করে চলেছে। অথচ হ্যান্ডলুম ডাইরেক্টরেটের ওয়েবসাইট খুললেই দেখা যাবে সেখানে রয়েছে ১৯৮৫ সালের ‘হ্যান্ডলুম রিজার্ভেশন অ্যাক্ট’ যেখানে পাওয়ারলুম কোনওভাবেই হস্তচালিত তাঁতশিল্পের জন্য সংরক্ষিত ১১টি পণ্য উৎপাদন করতে পারে না।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বাংলার বিভিন্ন হস্ততাঁত পণ্যের জিআই প্রদান। শান্তিপুরি, ধনেখালি ইতিপূর্বে জিআই পেলেও এবছর টাঙ্গাইল, কড়িয়াল, গরদ, মসলিন জিআই পেয়েছে। আবার ‘টাঙ্গাইল’ স্থানটি বাংলাদেশে হওয়ায় টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। কিন্তু হাতের তাঁত যেখানে মরছে সেখানে জিআই দিয়ে কি হবে? তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা জানেন—হাতের তাঁত মরছে, তাঁতি মরছে। এমতাবস্থায়, ফুলিয়ার একটি তাঁতঘরে গিয়ে এক প্রবীণ তাঁতির কাছে যখন বলি, “আগামী ৭ তারিখে ন্যাশনাল হ্যান্ডলুম ডে, মানে জাতীয় হস্ততাঁত দিবস”; অম্লান বদনে তিনি বলেন, “তাতে আমাগো কি?”
___________________________
একটি বাদে সব ছবি লেখকের থেকে সংগৃহীত | মতামত লেখকের নিজস্ব


