এলজিবিটিকিউএ+ নিয়ে সামাজিক অন্ধত্ব ঘুচবে কবে, কীভাবে?

লেসবো হলেও সে লেখে ভালো। অমুক ট্রান্স হলেও শিক্ষিত। ছক্কা হলেও ঋতুপর্ণ তুখোড় পরিচালক। গে হলেও তমুক কিন্তু প্রফেসর, হুঁ হুঁ বাওয়া!

‘সহিষ্ণুতার’ এই ধরনটির চেয়ে অসংবেদনশীল আর কিছু নেই। ছোটোবেলায় আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় পাতা-জোড়া তসলিমা নাসরিনের একটা লেখা বেরিয়েছিল: ‘ফেবারিট’। আমারই কৈশোরবেলার কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গিয়েছিল তাতে। গার্লস স্কুলে বড়ো ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে ছোটো ক্লাসের মেয়েদের গোপন প্রেম শুধু আমাদের স্কুলে নয়, যত্রতত্র যে ঘটত, তা জানা গিয়েছিল সেই লেখায়। এমন এক ঘটনা জানাজানি হওয়ায় আমাকে একবার ডাকা হয়েছিল ‘ভালো মেয়ে’ হিসেবে সাক্ষ্য দিতে। কারও নাম বলিনি, এলজিবিটিকিউএ+ কমিউনিটির ‘অ্যালাই’ হিসেবে নয়। ‘এলজিবিটিকিউএ+’ (LGBTQA+) শব্দবন্ধ, বা ‘অ্যালাই’ শব্দ—কোনোটাই তখন জানতাম না। স্রেফ বন্ধুদের প্রতি বন্ধুত্বের দায়ে বলা যায়নি, কারণ শিক্ষিকারা সংবেদনা নয়, ঘৃণা নিয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন। সেই বন্ধুদের বেশিরভাগেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ক্রমে। তারা গার্লস স্কুলে খেলা-খেলা প্রেম করেছিল কিনা, জানা হয়নি। একজন শুধু আজীবন অবিবাহিত রইল—সেই যার বৃষ্টি হলেই ফুটবল খেলতে ইচ্ছা করত। আমরা তার ফুটবল ভালবাসতাম, বব ছাঁট চুলও। কিন্তু তার কামনা-বাসনা নিয়ে কখনও আলোচনা করিনি স্কুল-কলেজবেলায়। কেন করিনি? ‘অন্যরকম’ হলেও সে বন্ধু, তাই বন্ধুত্বকে মর্যাদা দিয়েছি। কিন্তু তার ‘অন্য’ রকমটিকে, অন্য পছন্দটিকে, কামনার ভাষাকে গভীরে বোঝার চেষ্টা করিনি বলে এখন আফশোস হয়। তাকে ফিরে পেলে নিশ্চয় ভুল শুধরে নেব৷ এ লেখা তার জন্য।

এই লেখা সেই মেয়েটির জন্যও, যাকে সচেতনবেলায় চিনেছি। যে পুজোয় জামা পায়নি সারা কৈশোর, ছেলেদের মতো জামা পরতে চাওয়ার অপরাধে। কামিজ-সালোয়ার কিনতে বাবা-মা রাজি ছিলেন, প্যান্ট-শার্ট কখনোই না। দাদার প্যান্ট-শার্ট তাকে দিয়ে কেনানো হত, কষ্ট হত তার। এই লেখা সেই রূপান্তরিত মেয়ের জন্যও, যে এক্স-রে ঘরে নার্সকে বলছে, ‘আমি একাই ব্রা খুলতে পারব,’ কিন্তু নার্স মমত্বের ভেক ধরে খুলে দিচ্ছে কারণ আসলে সে দেখতে চায়, বুকখানা নকল না আসল? এ লেখা সেই ছেলের জন্যও বটে, যে ভাবছে, কোমলতা কি এমন এক পাপ, পিষে দিতেই হবে যাকে?

গোপনীয়তার দায় কি শুধু এলজিবিটিকিউএ+ মানুষদেরই? আমাদের অন্ধত্বের কারণেই তাঁদের থাকতে হয় সুপ্ত। আর আমরা ভাবি, পৃথিবী বুঝি কেবলই নারী-পুরুষময়। ‘ম্যাসকুলাইন’ আর ‘ফেমিনাইন’ নামক দুই বদ্ধ কলাম টেনে সন্তানকে গ্রামার মুখস্থ করাই।

জুন মাস গোটা পৃথিবীতে প্রাইড মাস হিসেবে উদযাপিত হয়

আমরা, যারা লেসবিয়ান বা গে নই, ট্রান্সজেন্ডার, ট্রান্সসেক্সুয়াল, ইন্টারসেক্স, প্যানসেক্সুয়াল কিছু নই, নিতান্ত বিষমকামী সিস মানুষ, তাদের ‘অন্য’-দের জানাবোঝার অনাগ্রহ একরকম সুবিধাজীবীতা নয় কি? তথ্য তো এখন হাতের মুঠোয় নিত্য বিরাজ করে, সার্চ বাটন টেপার অপেক্ষায়! এই অনাগ্রহের কারণ কি হতে পারে কামনা বিষয়ক আলোচনায় ছুৎমার্গ? ঋতুপর্ণ বলেছিলেন, ‘সমকামী’-র চেয়ে ‘সমপ্রেমী’ তাঁর পছন্দের শব্দ। কামনা অস্তিত্বের একরকম প্রকাশ হলেও, একমাত্র নয়। সঙ্গীর থেকে তো বটেই, যে কোনো সহমানুষের থেকে, এঁরা চান স্নেহ, সান্নিধ্য, বিশ্বাসও।

নাকি আমাদের মনে হয় উৎপাদনশীল যৌনতাই মান্য যৌনতা? যে জরায়ুবতীটি ছেলে হতে চাইছে, যে যোনি চাইছে না পৌরুষের প্রবেশ, যে ছেলের নিজ লিঙ্গটি ঘিরে অহমিকা নয় বিবমিষা জাগে, তারা সবাই যৌনতার সামাজিক উপযোগিতার শর্ত উপেক্ষা করছে বলে কি আমরা তাদের উপেক্ষা করছি? বিষমকামী মানুষ কি যৌনতায় সন্তান পায় শুধু, আনন্দ নয়? প্রকৃতির প্রতিটি উপকরণের উপযোগিতা কষতে কষতে, সভ্যতার চাহিদাপূরণের খাতে তাদের নিত্য ঠেলে দিতে দিতে, এদিকে আমরা পৃথিবীরই আয়ু কমিয়েছি দিন দিন।

এছাড়া আছে আরেক রকম উপেক্ষা— ‘এ বৈষম্য ঠিক তত গুরুতর নয়, যতটা শ্রেণিগত বৈষম্য।’ অথচ, লেসবিয়ান, গে, ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুইয়ার মানুষরা লিঙ্গ পরিচিতি ও যৌন পছন্দের কারণে আবশ্যিক বড়োলোক হয়ে যান না। একজন ট্রান্স ম্যান অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকে জানি, যাঁর মেয়ে পরিচয়েই চাকরি। দ্বিবিধ যাপন তার যন্ত্রণা। কিন্তু অত্যল্প আয়ের চাকরিটি ছাড়েন কী করে তিনি? যে লেসবিয়ান শিক্ষিকা স্টাফ রুমে তাঁর যৌন পছন্দ চেপে রাখতে বাধ্য হন, তাঁরও কষ্টের গুজরান। যে গে পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ি ফিরলে বাধ্য হবেন বিষমকামী বৈবাহিক সম্পর্ক মেনে নিতে, তিনি পেটের জ্বালা ছাড়াও ভোগেন আরেক সংকটে। গোপনীয়তার দায় কি তাঁদের শুধু? আমাদের অন্ধত্বের কারণেই তাঁদের থাকতে হয় সুপ্ত। আর আমরা ভাবি, পৃথিবী বুঝি কেবলই নারী-পুরুষময়। ‘ম্যাসকুলাইন’ আর ‘ফেমিনাইন’ নামক দুই বদ্ধ কলাম টেনে সন্তানকে গ্রামার মুখস্থ করাই। 

একজন সিস (মানে, জন্মগত লিঙ্গে যাঁর অস্বস্তি হয় না) এবং হেটেরোসেক্সুয়াল (মানে, যিনি বিষমকামী) মানুষ যদি শুধু নিজেকেও সামান্য খোঁড়েন, তাহলে দেখবেন, ‘ম্যাসকুলাইন’ বা ‘ফেমিনাইন’, যা হয়ে ওঠা তাঁর অভীষ্ট ছিল, তার সব শর্ত হয়তো পূরণ হয়নি। কঠোরভাবে সিস-হেটেরো পুরুষও যখন নিজসন্তানের মুখ দেখে বিগলিত হন, কুলকুল স্নেহধারা বয়, তখন তিনি কি সামাজিক সংজ্ঞা মতে পুরুষালি হলেন? লিঙ্গগত দোষগুণ ভাগাভাগির সময় স্নেহ, মমত্ব— এসব তো মেয়েদের কোঁচড়ে পড়েছিল!

সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতায় প্রাইড ওয়াক

তাহলে লিঙ্গের ধারণা কেবল জৈবিক নয়, সামাজিকও। লিঙ্গচর্চা বিষয়টাকে এভাবে ভাবে: জন্মগত লিঙ্গকে ‘সেক্স’ বা ‘জৈবিক লিঙ্গ’ বলে ডাকা হয়, আর সেই লিঙ্গ ঘিরে সামাজিক প্রত্যাশাকে বলা হয় ‘জেন্ডার’ বা ‘সামাজিক লিঙ্গ।’ জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে আমরা প্রায়শই ‘জেন্ডার স্টিরিওটাইপ’ ভেঙে ফেলি, আসলে তা এতই ঠুনকো। তারপর সামাজিক চোখরাঙানির ভয়ে নিজেদের আচরণকে আবার খোপে এঁটে নেওয়ার চেষ্টা করি। এলজিবিটিকিউএ+ গোষ্ঠীর মানুষেরা তাকে ভাঙেন সোচ্চারে। আচরণ দিয়ে তো বটেই, সাজপোশাক, সঙ্গী নির্বাচন থেকে শুরু করে সমস্ত সত্তা দিয়ে। তাঁরা ভাঙেন নারী-পুরুষ দ্বিত্ব, ভাঙেন নারী-পুরুষের পারস্পরিক কামনার আবশ্যিক শর্ত। দ্বিত্ব ভেঙে গেলে শুধু তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম নয়, অসংখ্য লিঙ্গপরিচয় বা যৌন পছন্দের সম্ভাবনা তৈরি হয়। নিশ্চিন্দির বাইনারি খানখান হয়ে গেলে বহুত্বের মুখোমুখি হতে আমরা ভয় পাই। তাই কানে তুলো গুঁজি আর চোখে ঠুলি পরে নিই।

আর তখনই দরকার হয় চিৎকৃত প্রকাশের। প্রাইড মার্চ সেই সাতরঙা চিৎকার। সেই যে স্বয়ং নবারুণ ভট্টাচার্য একবার ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘এসব মার্কিনি আমদানি,’ তার কারণ বোধহয় এই যে ১৯৬৮ সালের ২৮ জুন ম্যানহাটনের উপকণ্ঠে ‘স্টোনওয়াল রায়ট’ প্রথম এলজিবিটিকিএ+ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভে স্ফুলিঙ্গ ছুড়ে দেয়। সেদিন পুলিশ উক্ত সমকামী-রূপান্তরকামীদের সরাইখানায় রেইড করতে এলে জনতা প্রত্যাঘাত করেছিল। সেই থেকে জুন মাস বিশ্বজুড়ে প্রাইড মাস। প্রাইড। অহংকার। অহম বা আমিত্বের সোচ্চার প্রকাশ—সে আমি যতই হই বিষমকাম-মৌলবাদীর চোখের বালি। মার্কিন দেশ থেকে আমদানিকৃত আন্দোলন যদি বিজাতীয় হয়, তাহলে সে যুক্তিতে রুশি আমদামি মার্ক্সিস্ট আন্দোলনকেও বিজাতীয় বলতে হয়। আসলে, নিজভূমিতে একই মানুষ, একই দুঃখ, একই লজ্জার খোঁজ পেলে কোনো আন্দোলনই বিজাতীয় নয়৷ তাকে নিজের জলহাওয়ায় সিঁচে নেওয়াই যায়। 

আমাদের দেশে প্রাইড মার্চের বয়স বছর পঁচিশ হতে চলল। এলজিবিটিকিউএ+ সম্প্রদায় যে ভারতের উল্লেখযোগ্য অংশ, তা বোঝা যায়, যখন দেখা যায় ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারপত্রে ট্রান্স মানুষদের কথা উল্লেখ করেছে, সুবিধার আশ্বাস দিয়ে ভোট চেয়েছে। অথচ ট্রান্সজেন্ডার (নিজের বায়োলজিকাল লিঙ্গ নিয়ে যে সন্তুষ্ট নয়) আর হিজড়ের (একটি পেশা মাত্র) তফাৎ কী, ট্রান্সজেন্ডার আর ট্রান্সসেক্সুয়াল (যাঁরা পছন্দের শরীর ও লিঙ্গ অপারেশনের মাধ্যমে পেতে চান, যা আবার সব ট্রান্স মানুষ চান না) কেন আলাদা, ট্রান্স মানেই যে ইন্টারসেক্স (যিনি জন্ম থেকেই শরীরে পুরুষ বা নারীর চেয়ে আলাদা লিঙ্গ, জনন অঙ্গ পেয়েছেন) নয়, এসব তাঁরা জানেন না। একবগগা সকলকেই তাঁরা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বলে ডাকেন। কেন তৃতীয়? তাহলে কি ধরেই নেওয়া হল না যে পুরুষই প্রথম আর নারী দ্বিতীয়? মার্কশিটে যারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় যথাক্রমে— তারা কি কখনও ‘সমান’ হতে পারে? এ তো গেল লিঙ্গপরিচয়ের কথা। যৌন পছন্দের দিক থেকে, সমকামী বিবাহের আর্জি সুপ্রিম কোর্টে নাকচ করা হয়েছে ২০২২ সালে। যদিও নানা নিম্ন আদালত এর পরেও বলেছেন যে বিয়ে না করেও তাঁরা একসঙ্গে পরিবারের মতো থাকতে পারেন। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট এদেশে সমকামকে অপরাধের আওতামুক্ত করেছিল। সমকামীদের উপভোক্তা ধরে নিয়ে ভারতীয় জলহাওয়ার উপযোগী বিজ্ঞাপন বানিয়েছে নানা বহুজাতিক বিপণন। পুঁজিবাদ স্বার্থ বিনা কাজ করে না সচরাচর। তাই আবারও ধরে নিতে হয়, ভারতে এঁদের সংখ্যা যথেষ্ট। ‘টিআরএ রিসার্চ’ নামের মুম্বাইয়ের এক গবেষণাকেন্দ্র জানিয়েছিল, ভারতের জনসংখ্যার অন্তত দশ শতাংশ এলজিবিটিকিউএ+ সম্প্রদায়ভুক্ত। তার উপর আছেন অ্যালাইরা, মানে যাঁরা এঁদের বন্ধু, সমমর্মী, সমর্থক। সে হারও জনসংখ্যার প্রায় ৩০%। এঁদের কথা ভেবেই বানানো হয় এসব বিজ্ঞাপন।  

‘টিআরএ রিসার্চ’ নামের মুম্বাইয়ের এক গবেষণাকেন্দ্র জানিয়েছিল, ভারতের জনসংখ্যার অন্তত দশ শতাংশ এলজিবিটিকিউএ+ সম্প্রদায়ভুক্ত। তার উপর আছেন অ্যালাইরা, মানে যাঁরা এঁদের বন্ধু, সমমর্মী, সমর্থক। সে হারও জনসংখ্যার প্রায় ৩০%।

ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক-দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম প্রাইড ওয়াক হয়েছিল কলকাতায়

১৯৯৯ সালে ভারতের প্রথম প্রাইড ওয়াকে হেঁটেছিলেন কলকাতার জনা কুড়ি গে যুবক। তখন কোনো প্রচার ছিল না, বিজ্ঞাপন ছিল না, স্পনসর ছিল না। সেদিন বিকেলে যখন তাঁরা প্রেস ক্লাবে জানিয়েছিলেন যে সকালবেলায় ভারতের প্রথম প্রাইড ওয়াকটি হয়ে গেছে ধর্মতলা-পার্কস্ট্রিট অঞ্চলে ‘ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক’ নামে, তখন সাংবাদিকরা ছবি চেয়েছিলেন খবর করার জন্য। সেসময় হাতে হাতে মোবাইল ক্যামেরা ছিল না বলে তাঁদের আবার হাঁটতে হয়েছিল সাংবাদিকদের অনুরোধে। সেই প্রাইড ওয়াকের, ভারতের প্রথম প্রাইড ওয়াকের, যে ছবি পাওয়া যায়, তা সেই পুনর্বার হাঁটার ছবি। অথচ এঁরা আমাদের আশেপাশেই ছিলেন চিরকাল! নাহলে কেন খাজুরাহেও থাকবে সমকামী ভাস্কর্য? কেন অর্ধনারীশ্বর কল্পনা করা হবে পুরাণে? কেন বৈষ্ণব বা সুফি দর্শনে পুরুষ ভক্ত আরাধ্যের প্রতি ‘নারীসুলভ’ আত্মসমর্পণের কথা বলবেন?

একবিংশ শতকে অবশ্য প্রাইড মার্চে বেড়েছে জমক। বেড়েছে কর্পোরেট বিনিয়োগ। প্রাইড যেহেতু উচ্চকিত, রঙচঙে, মূলগত ভাবেই ‘চোখে পড়ার জন্য’, তাই সেখানে বিজ্ঞাপিত হলে কর্পোরেটের লাভ। এলাহি নানা প্রাইড মার্চের জুৎসই পোশাক কেনার জন্য সারা বছর টাকা জমায় প্রান্তিক ট্রান্স মেয়েটি। সে পুঁজিবাদের ফাঁদ বোঝে না৷ জানে না, এইচ অ্যান্ড এম নামক আপাত-এলজবিটিকিউ+ বান্ধব পোশাক ব্র‍্যান্ডটির যাবতীয় কারখানা চীনে, যেখানে সমকামী-রূপান্তরকামীরা অসম্মানিত হন নিত্যদিন। আবার যে লেসবিয়ান মেয়েটি কবিতা লেখে, তার শোরগোলে ভাল্লাগে না, তবু প্রাইডে যায়। পরিচিতির মুখোশটা পরে নেয় কবিমুখে, আর ভাবে, সিস-হেট পুরুষ হলেই একমাত্র যখন-তখন একলা হতে পারা যেত! যে ছেলে খুব শ্লোগান দিয়েছে, মিছিল শেষে তার ভয় ফিরে আসে। ট্রাম্প নাকি ট্রান্স মেয়েদের ধরে ধরে পুরুষদের জেলখানায় পাঠাচ্ছে। আমেরিকা মুখ ফেরানোয় কর্পোরেট ফান্ড নাকি কমছে প্রাইডে। তা কমুক। কিন্তু সে পকেট হাতড়ে মান্থলি বের করে। ডেট দেখে নেয়। টিকিট না থাকলে দু-ঘণ্টাও যদি হাজতে থাকতে হয় অনেক পুরুষের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে….তার লুণ্ঠিত হওয়ার ভয় হয়। প্রাইড মার্চ শেষ হলে ভিড় বহুধা ভাগ হয়ে যায়। কেউ যায় প্রাইড পার্টিতে। কেউ লোকাল ট্রেন ধরে মফস্বলে ফেরে। 

‘ওরা’ সবাই তোমার চোখে ‘অন্যরকম’। আবার ‘ওরা’ একে অন্যের থেকে ‘আলাদাও’ বটে। ওরা স্বপ্ন দেখে, ‘প্রাইড’ যেহেতু বহুত্বের দ্যোতক, সাতরঙা, তাই ‘প্রাইড’ একদিন সকলের হবে। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের মেয়েরা এসে ট্রান্স মানুষের জন্য ধর্ষণ প্রতিকার আইন দাবি করবে। চাকরিহারা শিক্ষক বলবে, যে চাকরি ছিল তার ‘প্রাইড,’ তা সে ছাড়বে না। সুউচ্চ রামধনু বিলবোর্ড থেকে ব্যাংকিং কর্পোরেট মাটিতে নেমে এসে হাউসলোন দেবে সমকামী দম্পতিকে। দত্তক সংস্থা শিশুর নরম আঙুল ধরিয়ে দেবে যে কোনো ‘ক্যুইয়ার’ বা ‘অদ্ভুত’ দম্পতির হাতে। যা কিছু নরম, শিশু বা সংবেদন, তাকে সকলে ভালোবাসবে, দুমড়ে দেবে না। যা কিছু কঠিন, তা কষ্ট দেবে না, ঠাঁই দেবে, আগল দেবে।

Written by