
প্রায় দেড়শো বছর আগের এই ঠাকুরদালান দেখলে বিস্ময় লাগবেই
তখন সম্ভবত নাইন-টেন। এক শনিবার, স্কুল ছুটির পর কানাঘুষো শোনা গেল– উমেশ মুখার্জি রোডের একটা পুরনো বাড়ির মধ্যে নাকি মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। মাথার খুলিও পাওয়া যাবে শীঘ্রই। আমাদের আর পায় কে! বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্ররা দলে-দলে ঢুকছে সে-বাড়িতে। নিজের চোখে দেখে আসছে ঝোপের এককোণে পড়ে-থাকা সেই হাড়। এমনকি, দু-তিনজন স্যারও উঁকি মেরে গেলেন। আমার পোশাক তখন সাদা শার্ট-সাদা প্যান্ট। বুকে স্কুলের ব্যাচ আঁটা, তাতে লেখা – ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্।’ জ্ঞানের লোভেই কিনা জানি না, বন্ধুদের সঙ্গে আমিও ভয়ে-ভয়ে ঢুকে পড়লাম সেখানে। হ্যাঁ, ওই তো– সবুজ ঝোপগুলোর আড়ালে দেখা যাচ্ছে সাদা হাড়। পায়ের। আচ্ছা, কত পুরনো এই বাড়ি? এখানে কি কেউ কাউকে খুন করে পুঁতে দিয়েছিল? সেই দেহের হাড়ই এতদিন পর উঠে এল মাটি ফুঁড়ে? ধুকপুকানির পাশাপাশি, আমার মনে এইসব প্রশ্নও ঘুরছে তখন।
হঠাৎ, নিতান্ত বেরসিকের মতো বিবেক চিৎকার করে উঠল – ‘আরে ধুর ধুর! এটা তো কুকুরের ঠ্যাং!’ এত বড় একটা রহস্যের কাছে এসে বেশ ফেলুদা-ফেলুদা মনে হচ্ছিল নিজেকে, মুহূর্তে চুপসে গেল। আরও দু-একজন বলে উঠল – ‘হ্যাঁ, তাই তো!’ ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছেন বাড়ির মালিক। আমাদের দূর-দূর করে তাড়িয়ে তালা লাগিয়ে দিলেন গেটে। আর আমরা, বোকার মতো হাঁটতে লাগলাম এলোমেলো। শনিবারের দুপুর। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। রহস্য এত সহজে ফুরিয়ে গেল– মানতেও চাইছি না যেন। হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম নীলকণ্ঠ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে। ডানহাতে বিশাল ‘গণেশবাড়ি’। পুরনো দিনের ইট বেরিয়ে এসেছে। আচ্ছা, এখানেও অমন হাড় তো পাওয়া যেতেই পারে, না? ঢুকে দেখব?
…সেই প্রথম বেলঘরিয়ার কোনো আদ্যিকালের বাড়ি মন দিয়ে দেখা। এরপরও কৌতূহল নিয়ে গণেশবাড়ির সামনে ঘুরঘুর করেছি অনেকবার। একদিন দেখলাম, ভেঙে ফেলা হচ্ছে সেই বাড়ি। আরও পরে, সেখানে উঠে গেল ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাট। নামটুকু শুধু এক। কলেজে ঢোকার আগেই, দেখে ফেলছি এসব বদল। খারাপলাগা তৈরি হচ্ছে মনে। এদের কি বাঁচিয়ে রাখা যায় না? অন্তত ইতিহাসের পাতায়?
আরও পড়ুন
বেলঘরিয়ার ইতিহাসে যা লেখা নেই – ৬
২০১৫-তে, দক্ষিণপাড়ায় (ফিডার রোডের উত্তরদিকের এলাকাকে আগেকার দিনে বলা হত ‘উত্তরপাড়া’, আর দক্ষিণদিকে ‘দক্ষিণপাড়া’) ভুবন বাড়ুজ্যের বাড়ি দেখেও ঠিক এমনটাই মনে হয়েছিল আমার। বিশাল কাঠামো তখন ধুঁকছে। অথচ এই বাড়ি যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই বিশাল রাস্তা সামনে। বাড়িটার চত্বরে ঢুকলে, এখনও দেখা যায় ছেঁড়া-ছেঁড়া পুরনো আদল। বিভিন্ন শরিকে বিভক্ত। অনেক শরিক তাঁদের অংশ প্রোমোটারকে দিয়ে দিয়েছেন। ফলে, হঠাৎ-হঠাৎ মাঝখান থেকে ভেঙে উঠে গেছে ফ্ল্যাট। আর, পুরনো যে অংশগুলো টিকে আছে এখনও, জরাজীর্ণ।
আসলে, ফ্ল্যাট-আতঙ্ক তখন আমায় এতটাই পেয়ে বসেছিল যে, প্রতিবার ভয় পেতাম– গিয়ে আস্ত দেখব তো? কারণ, সারা বেলঘরিয়ার মধ্যে একমাত্র এই বাড়িটা – বিশেষত এর পরিত্যক্ত ঠাকুরদালান– আমার কাছে ইতিহাসের যথার্থ প্রতিনিধি হয়ে ধরা দিয়েছিল। এমন নির্মাণশৈলী বেলঘরিয়ায় এখন আর দ্বিতীয়টি নেই। লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, যেহেতু ঠাকুরদালানটি দেবোত্তর সম্পত্তি, কোনো শরিক চাইলেও প্রোমোটারকে দিতে পারবে না। তাহলে, অন্তত যদ্দিন না পুরো ভেঙে পড়ছে, আমি নিশ্চিন্ত।
প্রথম যেদিন ঢুকেছিলাম সেই ঠাকুরদালানে, দিনদুপুরেও গা ছমছম করছিল। বটগাছের শিকড় চেপে ধরেছে পুরো কাঠামো। মাথার ওপর কড়িবড়্গায় পায়রার বকবকানি। কানের পাশ দিয়ে শাঁ-শাঁ উড়ে গেল পাঁচ-ছটা চামচিকে। টর্চ ফেলে মাপছি ভেতরের জমাট অন্ধকার। ইতস্তত পড়ে আছে ভাঙা কাচ, কাঠের প্যানেল। প্লাস্টারের মূর্তি। আরও অজস্র ভাঙাচোরা জিনিস। যে-কোনো মুহূর্তে ফণা তুলতে পারে সাপ। বোতল থেকে মেঝেয় জল ফেলে খানিকটা অংশ পরিষ্কার করে দেখলাম। আশ্চর্য! মার্বেলে বাঁধানো পুরো মেঝে। একেবারে ভেতরের দিকে, দু’পাশের দেওয়াল ঘেঁষে দুটো দরজা। পরে জেনেছিলাম, বাঁদিকের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে ভোগ আনা হত। আর ডানদিকের দরজা-লাগোয়া ছোট্ট ঘরে রাখা হত শালগ্রাম শিলা।
তবে, আমায় সবচেয়ে বেশি টেনেছিল ওই ঠাকুরদালানের অলংকরণ। হিন্দুরীতির সঙ্গে পাশ্চাত্য ছাপের মিল স্পষ্ট। ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। কলকাতায় সাহেবদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল ভালোই। এমনকি, বিভিন্ন সময় সাহেবরা এসেওছেন এই বাড়িতে। ভুবন বাড়ুজ্যের পাশ্চাত্য-মননই কি ঠাকুরদালানে প্রতিফলিত হয়েছে? আন্দাজ ১৮৭০ সালে নির্মিত এই ঠাকুরদালান দেখলে চমকে উঠতে হয়। প্লাস্টারের কোনো-কোনো অলংকরণ দেখলে মনে হয়, নির্ঘাত ইউরোপীয় শিল্পীর হাতে তৈরি। আমি যতদূর সম্ভব ছবি তুলে রাখার চেষ্টা করেছিলাম সেসব স্থাপত্যের। ভেতরে একে অন্ধকার, তার ওপর ভালো কোনো ক্যামেরা ছিলও না সঙ্গে। তবু, যতটুকু পারা যায়– ভেঙে পড়ার আগে, ছবিতে হলেও ধরে রাখা কর্তব্য আমার।
বাইরের অলংকরণের ক্ষেত্রে, গাছের মোটা-মোটা শিকড়ের চাপে ভেঙে গেছে অনেক প্লাস্টারের মূর্তি। ভেতরের কিছু-কিছু এখনও অক্ষত। মেঝেয় পড়ে টুকরো-টুকরো কিছু। পায়ের নিচে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সুন্দর কাঠের প্যানেল। ছাদ থেকে আধঝোলা হয়ে আছে আরও একটা। বছরতিনেক আগেকার এসব দৃশ্য পরবর্তীকালেও মিলিয়ে দেখেছি। একই। সিঁড়িতে আগাছার রাজত্ব। অথচ এই ঠাকুরদালান ব্যবহৃত হত ১৯৮০-তেও। মাত্র ৩৫ বছরে এমন জরাজীর্ণ হাল। হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত, এই ইতিহাসও মুছে যাবে একদিন। আমি দোষ দিই বাঙালিকে – যারা যত্ন করতে পারে না ঐতিহ্যের। দোষ দিই নিজেকেও। আরও কেন পারি না?
তখনই ঋণ বেড়ে যায় শব্দের কাছে। যদি লিখতেও না পারতাম? নাহ্। বাকিদের মতো, অন্ধ হয়ে থাকার সত্যিই প্রয়োজন ছিল আমার…
(ক্রমশ)
