বেলঘরিয়ার ইতিহাসে যা লেখা নেই – ৬

দেশভাগের আগে ও পরে যেমন ছিল বেলঘরিয়ার কলোনিগুলি

১৯৪৭। দেশভাগ। লক্ষ-লক্ষ মানুষ পূর্ববঙ্গ থেকে এপারে চলে আসতে বাধ্য হল। হ্যাঁ, বাধ্যই। নিতান্ত প্রাণের ভয় না থাকলে, সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে কেই বা আসতে চায়! সহায়-সম্বলহীন, কোথায় মাথা গুঁজবে ঠিক নেই কোনো – এই অনিশ্চিতের দিকে যাত্রার কথা ভাবলে শিউরে উঠি আজও। আমরা, আজকের প্রজন্ম, ভরসা না-পেলে অধিকাংশ কাজের ক্ষেত্রেই দোনামনা করি। আর সেই মানুষগুলো – হয়তো আমাদেরই বাপ-ঠাকুরদা, আত্মীয়স্বজন কিংবা চেনা-পরিচিত কেউ – বেঁচে থাকতে এবং পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে কী দুঃসহ জীবনই না কাটিয়েছিলেন!

আমি বেলঘরিয়ার কলোনিগুলোতে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি। ওই যে বৃদ্ধা, আদুলপিঠে বসে আছেন সন্ধেবেলা, ঝিলের দিকে মুখ করে – তিনি কি ওপার বাংলার কোনো গ্রামের কথা ভাবছেন? বা যে প্রৌঢ় টিমটিমে মুদির দোকানে বসে আছেন মাথা নামিয়ে – তাঁর স্মৃতিতে কি আদৌ আছে বাসার পাশের নদীটি? আমার কান আর চোখ দুটোই সজাগ হয়ে ওঠে কলোনিতে গেলে। প্রতিটা দৃশ্যে, কথোপকথনে আর শব্দে সেই কঠিন সময়গুলোকে ছুঁতে চাই আমি। যে প্রজন্ম সরাসরি ওপার থেকে এপারে এসে বাসা বেঁধেছে, তাঁদের এবং পরবর্তী দু-এক প্রজন্মের বিবর্তন – এসবই আমার লক্ষের বিষয় হয়ে ওঠে। নিজেকেও কি মনে-মনে শামিল করে নিই সে-লড়াইয়ে?

আমাদের এই মফঃস্বলের চার প্রান্তে চারটে কলোনি। উত্তর-পূর্বে নন্দননগর, উত্তর-পশ্চিমে দেশপ্রিয়নগর, দক্ষিণে প্রফুল্লনগর আর দক্ষিণ-পূর্বে যতীনদাস নগর। বেলঘরিয়ার ইতিহাস নিয়ে খোঁজাখুঁজির সময়, আমার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৯৪৭ পর্যন্ত লেখা। কেননা তারপরেই আসে দেশভাগ এবং বেলঘরিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক চেহারা বদলাতে শুরু করে দ্রুত। সে-বিষয় নিয়ে লিখতে বসলে, খেই হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এড়িয়ে যেতে পারিনি। ‘কলোনি গঠনের ইতিহাস’ শিরোনামে সম্পূর্ণ একটা নতুন অধ্যায়ের শরণাপন্ন আমাকে হতেই হয়েছিল। নইলে এই জনপদের সঙ্গে অসততা করা হত। পাঠকের সঙ্গেও।

সে-অধ্যায়ে আলোচনা করেছিলাম ১৯৪৭-পূর্ববর্তী সময়ে এলাকাগুলি কেমন ছিল এবং তারপর উদ্বাস্তু-আগমনের ফলে কীভাবে চেহারা বদলাতে শুরু করে, কীভাবে ক্রমে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে স্থিতাবস্থায় আসে – এসবই। এবং, অসংখ্য অজানা তথ্য আমাকে বিস্মিত করেছিল। বাইরের সাদামাটা চেহারা দেখে কি বোঝা যায়, এত ঐতিহ্য এত সংগ্রাম পুষে রেখেছে কলোনিগুলো! এই ধারাবাহিকে, সীমিত শব্দে তার কতটুকুই বা ফুটিয়ে তুলতে পারব! বরং দু-এক কথায় ইতিহাস ফুটিয়ে তুলি। বিস্তৃত তো বইয়ে রইলই!

• নন্দননগরের কথা বলতে গেলে, আমার স্মৃতিতে প্রথমেই ভেসে ওঠে ঝিল। ওই বিশাল জলাভূমিই যেন নন্দননগরের প্রধান পরিচায়ক। আগেও তো তাই-ই ছিল! সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের জমি ব্রিটিশ সরকার চেয়ে নিয়েছিল রেললাইন পাতার জন্য। তা, রেললাইন তো পাতা হল। ১৮৬২ থেকে চালু হল ট্রেন চলাচলও। শোনা যায়, রেললাইন পাতার সময় ট্র্যাক উঁচু করার জন্য দরকার ছিল অনেক মাটি। নন্দননগর থেকে মাটি কেটে আনা হয়েছিল। আর তার ফলেই ঝিলগুলির সৃষ্টি। এ-কথার সত্য-মিথ্যা জানি না। আমার কেন জানি বিশ্বাস হয় না এই জনশ্রুতি। কেননা সোনাই নদী-সংক্রান্ত এক আকর্ষণীয় তথ্য আছে আমার কাছে, যার সঙ্গে নন্দননগরের ঝিলগুলির সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি অনায়াসে। পরে কখনও সুযোগ পেলে, সোনাই নদী সম্পর্কে লিখব।

যাইহোক, পরে ব্রিটিশ সরকারের থেকে ‘নন্দন’ পদবীধারী জমিদার, যিনি ভবানীপুরে বাস করতেন, লিজ নিয়েছিলেন জমিটি। পরবর্তীকালে, সেই জমিদারের নামানুসারেই ‘নন্দননগর’ নাম হয়। সে যা-হোক, লিজ নিয়েও যে এখান থেকে কী লাভ করতেন তাঁরা, জানি না। কারণ প্রায় দুর্গম অঞ্চল ছিল। হোগলাবন আর কচুরিপানার রাজত্ব। ঝিলে দেখা যেত কুমির, অজগর। এই পরিত্যক্ত ভূখণ্ড-কে কলোনি হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয় ১৯৫২ সালে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরের উদ্যোগে, ১৯৫২ সালে রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্প থেকে বাছাই করা ৩৬টি পরিবারকে স্পেশাল ট্রেনে বেলঘরিয়া নিয়ে আসা হয়, পুনর্বাসন দেওয়ার জন্য। এরপর আস্তে আস্তে অন্যান্য উদ্বাস্তু শিবির থেকেও লোকজন আসতে শুরু করে। জমি পরিষ্কার করে, বাসপোযোগী করে তোলা হয়। এরপর, জমি জরিপ করে জমি বিলি এবং জবরদখল – ইত্যাদির মিশ্রণেই একটা আদল পায় নন্দননগর।

• প্রফুল্লনগরের কলোনির জায়গাটি আগে ছিল রায়চৌধুরী ও বন্দ্যোপাধ্যায়দের অধীনে, প্রায় জঙ্গলাকীর্ণ। প্রায় জবরদখলের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে কলোনিটি। আরও দখলের সম্ভাবনা আঁচ করে, বন্দ্যোপাধ্যায়রা প্লট করে জমি বিক্রি করতে শুরু করেন ১৯৪৯-৫০ সালে। বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নামে কলোনির নাম রাখা হয় ‘প্রফুল্লনগর’। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে স্কুল, ক্লাব। ১৯৫১ সালে, প্রফুল্লনগর কেন্দ্রীয় মন্দির, যা সকলের কাছে ‘কালীমন্দির’ নামেই পরিচিত।

পরের পর্বে দেশপ্রিয়নগর আর যতীনদাস নগরে উঁকি দেব। দেব কি? না অন্য প্রসঙ্গে চলে যাব? জানি না। আসলে, সব কলোনির লড়াই-ই কমবেশি এক। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, মাথা গোঁজার ঠাঁই দখল। বাদবাকি যা ফারাক, তা আগেকার ইতিহাসের। এবং, কলোনি তৈরির সময় মানুষগুলির নামে। আজকের দিনে এসে, প্রত্যেককেই পরস্পরের বন্ধু মনে হয় আমার। হয়তো কেউই কাউকে চিনতেন না। কেউ সিলেট থেকে এসেছেন, কেউ খুলনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ। বরিশালের লোকও কি নেই? পাবনা? দেশভাগ ওঁদের সবাইকে ছিটকে ফেলেছিল বিপর্যয়ের আবর্তে। কলোনি আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছেন তাঁরা। জীবন শুরু করেছেন নতুন করে। আমরা তাঁদেরই সন্তান। তাঁদের ব্যথার। দুঃখের। সংগ্রামের। আর, মরে যাওয়ার।

সেটুকুও যদি না হতে পারি, উত্তরাধিকারের পতাকা বহন করার যোগ্যতা আমাদের কতটুকু?

(ক্রমশ…)

Developed by DXDasia