‘বাংলাদেশি’ ভাষা বিতর্ক : রাজনীতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন

ত ২৪ জুলাই দক্ষিণ দিল্লির লোধী কলোনি থানার তদন্তকারী অফিসার অমিত দত্ত, চাণক্যপুরীর বঙ্গভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে একটি চিঠিতে জানান, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বেশ কয়েকটি ধারা-সহ বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রবলভাবে সন্দেহভাজন আটজন অবৈধ বাংলাদেশী নাগরিককে তাঁরা গ্রেফতার করেছেন। কিন্তু উক্ত চিঠির সেই একই অনুচ্ছেদের পরবর্তী অংশে তিনি যা লিখেছেন তাঁর সারমর্ম এই যে, তদন্ত চলাকালীন তাঁদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জাতীয় পরিচয়পত্র, বার্থ সার্টিফিকেট, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি ইত্যাদি ‘বাংলাদেশী ভাষা’-য় লেখা এবং তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি জাতীয় ভাষায় পারদর্শী একজন সরকারি অনুবাদক বা দোভাষীর প্রয়োজন। প্রশ্নটি হলো এই যে বাংলাদেশী ভাষা, এই বাংলাদেশী ভাষাটি আসলে ঠিক কোনটি? সারা পৃথিবীতে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে আদৌ কি কোনও ভাষার অস্তিত্ব আছে? না নেই। ভাষাটির নাম বাংলা, এবং সেই একই ভাষা যে ভাষায় আমরা আমাদের জাতীয় সংগীতখানি রোজ সকালে গেয়ে উঠি।

কাঁটাতার কি তাহলে এইবার ভাষার উপরেও টানা হলো না? তাহলে গতবছর যে বাংলা ভাষাটিকে ‘ক্ল্যাসিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর সরকারি তকমা দেওয়া হলো সেটি কি এ দেশের ভাষা নয়?

আসলে ‘হিন্দি’ দেশের রাষ্ট্রভাষা জাতীয় তকমাগুলির মতনই ‘বাংলাদেশি ভাষা’-টিও সোনার পাথরবাটি। কিন্তু সরকারি একটি চিঠিতে ভাষার এই চিহ্নিতকরণ আরও কিছু সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়। যিনি চিঠিটি লিখছেন তাঁর ইতিহাস চেতনায় ১৯৪৭-এ দেশের জমি ভাগের সঙ্গে সঙ্গে কি আমরা ভাষাটিকেও বিদেশি বলে বর্জন করেছিলাম? কাঁটাতার কি তাহলে এইবার ভাষার উপরেও টানা হলো না? তাহলে গতবছর যে বাংলা ভাষাটিকে ‘ক্ল্যাসিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর সরকারি তকমা দেওয়া হলো সেটি কি এ দেশের ভাষা নয়?

ভারতীয় নোটে যে ২২টি স্বীকৃত ভাষায় অঙ্ক লেখা থাকে, তার একটি তাহলে ‘বাংলাদেশি ভাষা’? জাতীয় পরিচয়পত্র, বার্থ সার্টিফিকেট বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি দিল্লি পুলিশ উক্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের থেকে যা-ই বাজেয়াপ্ত করুক না কেন, এবং তা যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হয়, তাতে যদি অশোক স্তম্ভের এমব্লেম না থাকে, তাহলে সেটুকুই তো তাদের অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করতে যথেষ্ট। তদুপরি তাতে যদি ‘বাংলা ভাষা’-তেই পরিচয় লেখা থাকে তাহলে তো সেটি প্রমিত বাংলা! এই প্রমিত বাংলাকে যারা বাংলা ভাষাটি জানেনই না তাঁরা কীভাবে বাংলাদেশি উপভাষা হিসেবে চিহ্নিত করলেন! কেনই বা আলাদা করে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ নামক উদ্ভট একটি শব্দবন্ধকে চিঠির সঙ্গে জুড়তে হলো এবং ঠিক কোন প্রয়োজনে? ঠিক কোন নথি থেকে এমন নতুন ভাষার জন্ম দিতে হলো দিল্লি পুলিশকে – এ বেশ সন্দেহের বিষয়।

অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, এ এক বিশেষ মানসিকতা। বাংলা ভাষাটির প্রতিনিধিত্ব বাংলাদেশে – এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা উত্তর ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দিভাষীদের মধ্যে এমনিতেই প্রচলিত। অবশ্য খালি খালি উত্তর ভারতকে দোষ দেওয়া কেন, যেখানে খোদ কলকাতা মেট্রোয় কয়েকমাস আগে এক হিন্দিভাষী মহিলা অপর এক সহযাত্রীকে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাংলাদেশে চলে যাওয়ার নিদান দিয়েছিলেন, এ ভিডিও তো সমাজ মাধ্যমে আমরা সকলেই প্রায় দেখে ফেলেছি! যাই হোক, উক্ত চিঠিটি আমরা পাচ্ছি গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক্স নামক একটি সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করা পোস্ট থেকে, যেখানে তিনি চিঠির পুরো বিষয়টিকে ‘সংবিধানবিরোধী, লজ্জাজনক, অপমানজনক এবং দেশবিরোধী’ বলে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার প্রত্যুত্তরে বিজেপির আইটি সেলের প্রধান শ্রী অমিত মালব্য কথাগুলিকে ‘ডেঞ্জারাসলি ইনফ্লামেটরি’ বা ‘চরম উস্কানিমূলক’ বলে চিহ্নিত করেছেন! কৌতূহলের বিষয়, অমিতবাবুর সেই পোস্টের পরবর্তী কথাগুলোয়, যেখানে তিনি দিল্লি পুলিশকে সমর্থন করে উল্লেখ করছেন যে, দিল্লি পুলিশ নাকি বাংলাদেশি ভাষা বলতে একটি নির্দিষ্ট উপভাষা, ব্যাকরণ এবং শব্দচয়নকে বোঝাতে চেয়েছে। তিনি উক্ত ডকুমেন্টসগুলির মধ্যে ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও খুঁজে পেয়েছেন যা দেখে সহজ মনে অমিত মালব্য-র এই বিশেষ প্রতিভা সম্বন্ধে যথেষ্ট সম্মানের উদ্রেক হয়! যিনি সরকারি নথিতে ব্যবহৃত ভাষার উচ্চারণ শুনতে পান, তিনি থাকতে আমাদের আর জেনারেটিভ এ আই-এর প্রয়োজন কি!

ঘটনার উত্তেজনায় তিনি ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড ও আসাম নামক রাজ্যগুলির কথা এবং তার বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের কথা ভুলে গেছেন! তিনি বাংলা বলে এমন কোনও ভাষার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন যা কোনও উপভাষাকে নিজের ভিতর ধারণ করতে পারে।

মাননীয় অমিত মালব্য এখানেই থামেননি, তিনি বাংলা বলতে জাতিগত পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েছেন, ভাষাগত নয়! ঘটনার উত্তেজনায় তিনি ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড ও আসাম নামক রাজ্যগুলির কথা এবং তার বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের কথা ভুলে গেছেন! তিনি বাংলা বলে এমন কোনও ভাষার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন যা কোনও উপভাষাকে নিজের ভিতর ধারণ করতে পারে। যাবতীয় ঠাট্টাকে সরিয়ে রেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি তিনি সর্বৈব ভুল এবং শুধু ভুল নন, এই মন্তব্যগুলির পিছনে তার উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও সন্দেহ জাগে। উত্তর ভারতে প্রচলিত ঠিক যে মানসিকতার কথা একটু আগে লিখেছিলাম, তাঁকে তার অন্যতম প্রচারক হিসেবে মেনে নিতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে করে তাঁকে শিখিয়ে দিতে ভারতবর্ষে স্বীকৃত ১২২টি প্রধান ভাষা আছে, যা সংখ্যায় তার চেয়েও বেশি নানান উপভাষা দ্বারা সমৃদ্ধ। উপভাষাই ভাষার বাস্তব পরিচিতি বহন করে। যে যুক্তি তিনি সাজাতে চাইছেন তা দিয়ে কাশীর হিন্দি আর মুম্বইয়ের হিন্দিকে তাহলে কীভাবে চিহ্নিত করবেন! এক্ষেত্রে তিনি কোন হিন্দিকে মান্যতা দেবেন? যে হিন্দুস্থানি ভাষাকে এতদিনের প্রচেষ্টায় হিন্দির রূপ দেওয়া দেওয়া গেল, তাকে কি লাহোরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন মাননীয় মালব্য মহাশয়!

তাড়াহুড়ো করে পোস্ট করতে গিয়ে তিনি হয়তো ভুলে গেছেন সংখ্যার বিচারে বাংলা ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা এবং ক্রমবর্ধমানতার বিচারে চতুর্থ! কালের বিচারে মাগধী প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক বাংলা এই ক্রনোলজিতে এ ভাষার ইতিহাস অন্তত চোদ্দশো বছরের কম নয়! প্রত্যেক ভাষার একটি পরিবার থাকে। থাকে ডায়ালেক্ট কন্টিনাম বা ডায়ালেক্ট চেইন বলে একটি বস্তু। রাঢ়ি, কাঁথি, শান্তিপুরি, শেরশাহবাদীয়া, বরেন্দ্রী বা কলকাতার নানান কলোনিতে ব্যবহৃত ডায়ালেক্টগুলির মধ্যে আপনি কেবল শুনতে পেলেন সিলেটি! তাহলে দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব প্রান্তের মানুষের উচ্চারণ, যা প্রধানত ওপার বাংলার যশোর জেলার নামে চিহ্নিত ডায়ালেক্ট-এর পরিবারের মধ্যে পড়ে, তাকেও কি আমরা অভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করব এমনটা সাজেস্ট করছেন আপনি? সেক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী আপনিও কি ভাষাগত সংঘাত উস্কে দেওয়ার অপরাধে অপরাধী হলেন না?

তিনি হয়তো ভুলে গেছেন সংখ্যার বিচারে বাংলা ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা এবং ক্রমবর্ধমানতার বিচারে চতুর্থ! কালের বিচারে মাগধী প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক বাংলা এই ক্রনোলজিতে এ ভাষার ইতিহাস অন্তত চোদ্দশো বছরের কম নয়!

পুরো ঘটনায় দুটি বিষয় বিশেষভাবে বাঙালিদের চোখে পড়বে এমনটাই ধারণা হয়। প্রথমত, দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন একটি সংস্থা। ফলে প্রতিনিধিস্বরূপ দিল্লি পুলিশের এই চিঠির যদি কোনও প্রতিক্রিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে না আসে তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দিল্লি পুলিশের কথাগুলিকে সমর্থন করেন এমন বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মনে জন্মাবে! দ্বিতীয়ত, অমিত মালব্য যে পদ অলঙ্কার করে বসে আছেন, তাতে তার এই পোস্ট বা বক্তব্যকে নিছক ব্যক্তিগত ধরে এড়িয়ে যাওয়া যায় না! তাঁকে মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়, মহাশয় আপনি উত্তরবঙ্গের যে ভোটারদের অনুকূল্যে বারো জন সাংসদকে পেয়েছেন, দিল্লি পুলিশের ভুলের জাস্টিফিকেশন দিতে গিয়ে তাঁদের ভাষাকেই অস্বীকার করে ফেললেন! ২০২৬-এ স্থানীয় বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে যে দলটা এমনিতেই বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী বলে চিহ্নিত, তাদের জন্য ঘটনাটি আরেকটু আত্মঘাতী হলো না কি!

_____________
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব

Written by